দাউদ ও হারিছ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। সাইফুদ্দীন ফাওজিয়ার অপেক্ষায় বসে আছেন। কিন্তু আজ আর ফাওজিয়া তার কক্ষে এলো না। দিনে দাউদ ও হারিছ তাকে খাবার খাওয়ায়। দিন শেষে রাত আসে।
***
আল-মালিকুস সালিহ, সাইফুদ্দীন ও গোমস্তগীন যে স্থানে বসে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, সেখান থেকে খানিক দূরে খৃস্টান কমান্ডার ও সম্রাটদের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো। তারা আল-মালিকুস সালিহ, সাইফুদ্দীন ও গোমস্তগীনের সম্মিলিত বাহিনীর পরাজয় নিয়ে পর্যালোচনা করছে। এদের প্রায় সকলেই সুলতান আইউবীর মোকাবেলায় পরাজিত সৈনিক।
এই তিনটি মুসলিম ফৌজের পরাজয় মূলত আমাদেরই পরাজয় রেমন্ড বললেন- আমি যতটুকু জানি, সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীতে সৈন্য বেশী ছিলো না।
আপনার মতের সঙ্গে আমি একমত নই- ফরাসী সম্রাট রেজিনাল্ট বললেন- আমাদের উদ্দেশ্য কখনো এটা নয় যে, মুসলমানরা যখন পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হবে, তখন তাদের কোনো পক্ষ জয়ী কিংবা পরাজিত হবে। বরং আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমান পরস্পর লড়তে থাকবে এবং তাদের একটি পক্ষ আমাদের হাতে খেলতে থাকবে। আমাদের ঘৃণ্য ও ভয়ংকর শত্রু হলেন সালাহুদ্দীন আইউবী। আমরা চাই তার মুসলমান ভাইয়েরা তার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে থাকুক এবং তার শক্তি বিনষ্ট করতে থাকুক। তার মুসলমান প্রতিপক্ষের শক্তিও যদি নষ্ট হয়, হতে থাকুক। এমনও হতে পারে, সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাস্ত করে তার প্রতিপক্ষ মুসলমানরা আমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাবে।
আমি আপনাদের মুসলিম অঞ্চলসমূহ ও শাসকদের পূর্ণ বিবরণ শোনাতে চাই, যা আমাদের উপদেষ্টাগণ প্রেরণ করেছেন- এক কমান্ডার বললো- সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রতিপক্ষ তিনটি বাহিনীর অবস্থা হলো, সৈন্যদের মাঝে যুদ্ধ করার স্পৃহা আশংকাজনকভাবে কমে গেছে। তাদের ব্যাপক দৈহিক ক্ষতি হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও মালপত্র খোয়া গেছে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে পুনরায় যুদ্ধ করতে সক্ষম ছিলো না। আমরা তাদেরকে যে উপদেষ্টা দিয়ে রেখেছি, তারা বড় কষ্টে মুসলিম শাসকদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর হামলা করার জন্য প্রস্তুত করে তুলেছেন। সালাহুদ্দীন আইউবী হুবাবুত তুর্কমানের একটি মনোরম জায়গায় ছাউনী ফেলে সেখানে অবস্থান করছেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অগ্রযাত্রা স্থগিত রেখেছেন। আমাদের খৃস্টান উপদেষ্টা প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, হাল্ব, হররান ও মসুলের বাহিনী যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, কাল বিলম্ব না করে পুনরায় আক্রমণ করুক। আমি আশাবাদী, তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীকে অসতর্ক অবস্থায় ঘায়েল করে ফেলতে সক্ষম হবেন। আইউবীকে হত্যা করার এ মুহূর্তে এটাই উপযুক্ত পন্থা।
আর এই পন্থা সম্ভবত সফল হবে না- ফিলিপ অগাস্টাস বললেন কেননা, আইউবী কখনো বেখবর বসে থাকে না। তার গোয়েন্দা বিভাগ সর্বক্ষণ সজাগ ও তৎপর থাকে। যে ঘটনা বা যে হামলা দুদিন পরে সংঘটিত হবে, তার সংবাদ তিনি দুদিন আগেই পেয়ে থাকেন। আমাদের যেসব উপদেষ্টা মুসলমানদের সঙ্গে আছেন, তাদেরকে জোরালোভাবে বলে দেয়া প্রয়োজন, যেনো তারা তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা তীব্রতর করে। গোয়েন্দাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। তাদেরকে দায়িত্ব অর্পণ করুন, যেনো তারা সমগ্র অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় এবং আইউবীর গোয়েন্দাদের ধরে ফেলে। মুসলমান সৈন্যরা যখন হামলার জন্য যাত্রা করবে, তখন যেন আমাদের গুপ্তচর ও গেরিলা সৈন্যরা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে যেনো ধরে ফেলে। পথচারীদেরকে ধরে ফেলতে হবে। উদ্দেশ্য থাকবে, আইউবী যেনো হামলার সংবাদ তখন পায়, যখন তার মুসলমান ভাইয়ের ঘোড়া তার ছাউনী এলাকায় ঢুকে তার সৈন্যদের যমের হাতে তুলে দিতে শুরু করবে।
এ সংবাদও এসেছে যে, সালাহুদ্দীন আইউবী তার অধিকৃত এলাকাগুলো থেকে সেনাভর্তি নিচ্ছেন। মানুষ দলে দলে তার বাহিনীতে ভর্তি হচ্ছে- অপর এক কমান্ডার বললো- এই ধারা প্রতিহত করতে হবে। তার একটি পন্থা হলো, যা আমরা পূর্ব থেকেই প্রয়োগ করে আসছি যে, কালবিলম্ব না করে তার উপর হামলা চালাতে হবে, যাতে তিনি প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ না পান। দ্বিতীয় পন্থা হলো, ঐসব এলাকায় চরিত্র বিধ্বংসী সেই অভিযান পরিচালনা করতে হবে, যা আমরা মিশরে পরিচালনা করেছিলাম। এটা সত্য যে, এ ধরনের অভিযানে আমাদের বহু পুরুষ ও কয়েকটি মূল্যবান মেয়ে ধরা পড়েছিলো এবং মারা গিয়েছিলো। কিন্তু এই কুরবানী তো দিতেই হবে। আমরাও তো মারা যাচ্ছি। ক্রুশের খাতিরে প্রয়োজন হলে আমাদেরকে জীবন দিতে হবে এবং আমাদের সন্তানদেরও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামাতে হবে। যে কোনো ত্যাগের বিনিময়ে হোক, মুসলমানদের চেতনার উপর আঘাত হানতেই হবে। আমি স্বীকার করছি, আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীকে এই ভূখণ্ড থেকে বেদখল করতে পারবো না। লোকটা মিশরেও বেঁকে বসেছে এবং এই ভূখণ্ডেও এসে পৌঁছেছে। তার সাফল্যের এক কারণ তো এই যে, তিনি রণাঙ্গনের শাহসাওয়ার। দ্বিতীয় কারণ, তিনি বিচক্ষণ ও দক্ষ সেনানায়ক। তৃতীয় মৌলিক কারণটি হলো, তিনি তার সৈনিকদের মাঝে জাতীয় চেতনা ও ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে রেখেছেন। আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে তারা পবিত্র ধর্মীয় কাজ মনে করে। সে কারণেই তার কমান্ডো সেনারা আমাদের বাহিনীর উপর সিংহের ন্যায় আঁপিয়ে পড়ে। তাদের এই বিশ্বাস ও উন্মাদনাকে ধ্বংস করতে হবে।
