হারিছ যেহেতু তারই ফৌজের সৈনিক, তাই সে-ই সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। দাউদ চুপচাপ বসে থাকে। তার তো কিছুই জানা নেই।
তোমরা এতোদিন কোথায় ছিলে? সাইফুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন
আমাদের ফৌজ কিভাবে পিছপা হয়েছে, বলতে লজ্জা লাগছে- দাউদ মুখ খুলে আমাদের পিছপা হওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু একে সঙ্গে নিয়ে আমি একটি পাথর খণ্ডের পেছনে লুকিয়ে সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। আমরা লক্ষ্য রাখি, আইউবীর বাহিনী আমাদের ধাওয়া করতে আসছে, নাকি কোথাও ছাউনী ফেলছে। আমি গোয়েন্দাগিরি করতে শুরু করি। আপনার বোধ হয় স্মরণ আছে, খৃস্টান উপদেষ্টাদের দ্বারা আপনি গেরিলা বাহিনী গঠন করেছিলেন। আমিও এক বাহিনীতে ছিলাম। আমি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। যুদ্ধের সময় এই প্রশিক্ষণ বেশ কাজে আসে। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে আমি আমার এই যোগ্যতাকে কাজে লাগাই। ভাবলাম, পালাতেই যদি হয়, তাহলে আপন ফৌজের জন্য দুশমনের কিছু তথ্যও নিয়ে যাবো। ইতিমধ্যে হারিছ ভাইকে পেয়ে গেলাম। তাকে সঙ্গে রেখে দিলাম। সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ অগ্রসর হতে থাকে আর আমরা তাদেরকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। সে সময় যদি আমাদের সঙ্গে জনাদশেক সৈন্যও থাকতো, তাহলে কমান্ডো হামলা চালিয়ে আমরা তাদের অনেক ক্ষতি করতে পারতাম।
আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীকে তুকমান অঞ্চলে ছাউনী ফেলতে দেখেছি। তারা যেভাবে তাঁবু স্থাপন করেছে, তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে, সেখানে তারা দীর্ঘ সময় অবস্থান করবে। আমার আফসোস লাগছে যে, আমাদের বাহিনী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে এসেছে। আপনি একে জিজ্ঞেস করুন, আমরা শত্রু বাহিনীর যে লাশ দেখেছি, তার সংখ্যা কয়েক হাজার হবে। আর আহতদের তো কোনো হিসেবই নেই। আমরা রাতে তাদের ছাউনীর নিকটে গিয়ে দেখেছি। আল্লাহু আকবার! জখমীদের আর্তনাদ সহ্য করার মতো নয়। আমাদের মনে হলো, তাদের অর্ধেক সৈন্যই যেনো আহত।
আমীরে মোহতারাম! আল্লাহ আপনার মর্যাদা বুলন্দ করুন। এ মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী- আপনিই ভালো জানেন। আমরা আপনার দাসানুদাস যা আদেশ করবেন, তাই পালন করবো। আমার বিশ্বাস, সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনী এ মুহূর্তে পুনরায় যুদ্ধ করতে সক্ষম নয়। আপনি যদি এক্ষুণি আপনার বাহিনীকে একত্রিত করে হামলা করেন, তাহলে আইউবীকে দামেস্ক তাড়িয়ে নিতে সক্ষম হবেন।
সাইফুদ্দীন মনোযোগ সহকারে দাউদের রিপোর্ট শ্রবণ করেন। পরাজিত বিধায় তিনি এমন সব সান্ত্বনাদায়ক কথাবার্তা শুনতে উদগ্রীব ছিলেন যে, তিনি আসলে পরাজিত হননি কিংবা পলায়ন করেননি। দাউদ তার সেই চাহিদাটাই পূরণ করছে। সাইফুদ্দীনের দুর্বলতাই বলতে হবে যে, দাউদের বক্তব্যে তার হৃদয়ে স্বস্তি ও শান্তি ফিরে আসে।
আমরা মসুল যাচ্ছিলাম- দাউদ বললো- হারিছের গ্রামটা পথে বিধায়, ক্ষণিকের জন্য বাড়িতে ঢুকে সকলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যাবো। কিন্তু এখানে এসেই শুনতে পেলাম আপনি এখানে আছেন। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। বিষয়টা এতোই অবিশ্বাস্য যে, আপনাকে দেখার পর এখনও যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না, আপনি এখানে। রিপোর্ট আপনাকে অবহিত করা প্রয়োজন ছিলো। ভাগ্য ভালো যে, আপনাকে এখানেই পেয়ে গেলাম।
তোমাদের বক্তব্য শুনে আমি অত্যন্ত খুশী হয়েছি- সাইফুদ্দীন রাজকীয় ভঙ্গীতে বললেন- এই বীরত্বের জন্য তোমাদেরকে পুরস্কৃত করা হবে।
আমাদের জন্য এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে যে, আমরা আপনার পাশাপাশি বসে আপনার সঙ্গে কথা বলছি- হারিছ বললো আপনার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারলেই আমরা ধন্য হবো।
জানতে পারলাম, এখানে আপনার সঙ্গে আরো লোক আছে। দাউদ বললো।
তারা চলে গেছে- সাইফুদ্দীন জবাব দেন- আমিও চলে যাবো।
বেআদবী মাফ করলে জিজ্ঞেস করবো, আপনি এখানে কতদিন থাকবেন- হারিছ বললো- এবং কোথায় যাবেন? আমি লজ্জিত যে, আমার স্বজনরা আপনাকে এই ভাঙ্গা কক্ষে থাকতে দিয়েছেন এবং মেঝেতে বসিয়ে রেখেছেন।
এটাই আমার কামনা ছিলো- সাইফুদ্দীন বললেন- এখানে আমি আরো দিন কয়েক কাটাতে চাই। তোমরা কিন্তু কাউকে বলবে না, আমি এখানে আছি।
আপনি কোথায় যাবেন? দাউদ জিজ্ঞেস করে।
আমি হালব যাবো- সাইফুদ্দীন জবাব দেন- সেখান থেকে মসুল চলে যাবো।
কিন্তু আপনি যে একা- দাউদ বললো- আপনার তো দেহরক্ষী প্রয়োজন।
এই অঞ্চলে কোনো আশংকা নেই- সাইফুদ্দীন বললেন- একা একাই যেতে পারবো।
গোস্তাখী মাফ করবেন- দাউদ বললো- এই অঞ্চলকেও আপনি শত্রুমুক্ত ভাববেন না। আমি যা জানি, আপনি তা জানেন না। সালাহুদ্দীন আইউবীর কমান্ডোরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের কেউ যদি আপনাকে চিনে ফেলে, তাহলে আমাদের দুজনকে আজীবন আক্ষেপ করতে হবে, কেননা আমরা আপনার সঙ্গে গেলাম না। আমরা এখানে ঘটনাক্রমে এসে পড়েছি। আমাদের সঙ্গে ঘোড়া আছে, অস্ত্রও আছে। আপনি বললে আমরা আপনার সঙ্গ দিতে পারি। তাছাড়া একজন শাসকের একাকী সফর করা বেমানানও বটে।
সাইফুদ্দীনের দেহরক্ষীর প্রয়োজন আছে বটে। মুখে যাই বলুন, অন্তরটা তার ভয়ে কাঁপছে। দাউদ তাকে আরো ভীত করে তোলে। তিনি বললেন ঠিক আছে, তোমরা প্রস্তুত হয়ে নাও। আমরা আগামী রাতে রওনা হবো।
