দাউদের সঙ্গে কথোপকথনের শেষে ফাওজিয়া যখন ফিরে যেতে উদ্যত হয়, তখন তার ঠোঁটে হাসির ঝলক দেখা যায়, যে হাসিতে আনন্দের তুলনায় প্রত্যয়ের প্রতিক্রিয়া অধিক বেশী পরিস্ফুট।
***
আল-মালিকুস সালিহর নামে সাইফুদ্দীনের বার্তা নিয়ে যাওয়া কমান্ডার দুদিন পর ফিরে আসে। আল-মালিকুস সালিহর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়নি। ফলে বার্তা পৌঁছিয়ে তার লিখিত জবাব পাঠিয়ে দিতে বলে আসে সে। সাইফুদ্দীন কোথায় আছেন এবং যে গৃহে অবস্থান করছেন, সেখানে কিভাবে আসতে হবে, বলে এসেছে কমান্ডার। সাইফুদ্দীন তার পত্রের জবাবের অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন। কিন্তু জবাব আসছে না। তার অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে লাগলো। চারদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিনি অত্যন্ত পেরেশেন হয়ে পড়েন।
নাকি আমি নিজেই হাব যাবো- সাইফুদ্দীন তার নায়েব সালারকে বললেন- হাবের বাহিনী যদি সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে সমঝোতা করেই ফেলে, তাহলে নিজেদের ব্যাপারে ভাবতে হবে। গোমস্তগীনের উপর কোন ভরসা রাখা যায় না। আমরা একা তে লড়াই করতে পারবো না। তখন খৃস্টানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অন্য কোনো পরিকল্পনা করতে হবে।
আচ্ছা, আল-মালিকুস সালিহ সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে যে সন্ধি করেছেন, তা থেকে কি তিনি ফিরে আসতে পারবেন? নায়েব সালার জিজ্ঞেস করেন।
তা পারবেন- কমান্ডার বললো- আমি তাদের যে কজন সালার ও কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা বলেছে, আল মালিকুস সালিহ সালাহুদ্দীন আইউবীকে ধোঁকা দিয়েছেন। যদি ধোকা নাও দিয়ে থাকেন, তবু অধিকাংশ সালার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এই সন্ধিকে সমর্থন করে না। খৃস্টান উপদেষ্টারা তো এক্ষুণি আক্রমণ করার পক্ষপাতী।
আপনাকে হালব চলে যাওয়া উচিত- নায়েব সালার বললেন- আমি মসুল চলে যাই।
তুমি পুনরায় হাল্ব চলে যাও- সাইফুদ্দীন কমান্ডারকে বললেন- গিয়ে আল-মালিকুস সালিহকে বলো, আমি আসছি। তুমি আজই রওনা হয়ে যাও। কাল রাতে আমিও রওনা হবো। তিনি হয়তো আমাকে সাক্ষাৎ দিতে রাজি হবেন না। নগরীর বাইরে আল-মাবারিক নামক স্থানে যে কূপটি আছে, আমি সেখানে অবস্থান করবো। আল-মালিকুস সালিহকে বলবে, তিনি যেনো আমার সঙ্গে সেখানে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন। যদি তিনি সাক্ষাৎ করতে সম্মত না হন, তাহলে সেখানে এসে তুমি আমাকে অবহিত করবে।
আপনার একা যাওয়া কি ঠিক হবে? নায়েব সালার জিজ্ঞেস করেন।
এসব এলাকায় কোনো ভয় নেই- সাইফুদ্দীন বললেন- আমি রাতে রওনা হবো। কেউ জানবে না যে, মসুলের শাসনকর্তা যাচ্ছেন।
সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা ও গেরিলাদের ফাঁদে পড়ার আশংকা আছে- নায়েব সালার বললেন- আমাদের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও তাদের থেকে নিরাপদ নয়।
আমাকে যেতেই হবে- সাইফুদ্দীন বললেন- ঝুঁকি নিতেই হবে। তুমি আজই মসুল রওনা হয়ে যাও। আমি আগামী রাতে হাবের উদ্দেশ্যে রওনা হবো।
যে সময় সাইফুদ্দীন ও তার সঙ্গীদের মাঝে এসব কথোপকথন চলছিলো, তখন দাউদ ও হারিছের কান দরজার সঙ্গে লাগা ছিলো। এবার তারা সেখান থেকে সরে নিজ কক্ষে চলে আসে। দাউদ চিন্তায় পড়ে যায়। তাকে সাইফুদ্দীনের পিছু নিতে হবে। কিন্তু কিভাবে? দীর্ঘ ভাবনার পর তার মাথায় একটা বুদ্ধি আসে।
আমরা সাইফুদ্দীনের দেহরক্ষী সেজে তার সঙ্গে হাল্ব চলে যাবো- দাউদ হারিছকে বললো- আমরা আকস্মিকভাবে তার সামনে গিয়ে হাজির হবো এবং বলবো, আমরা আপনার ফৌজের সিপাহী।
তিনি যদি বলে ফেলেন, তোমরা মসুল চলে যাও, তাহলে কি করবো? হারিছ জিজ্ঞেস করে।
আমি আমার জাদু চালানোর চেষ্টা করবো। দাউদ জবাব দেয়।
এই কৌশলও যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে? হারিছ প্রশ্ন করে।
তারপরও আমরা হাল যাবো না- দাউদ বললো- আল-মালিকুস সালিহ যদি সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে সন্ধি করেই থাকে, তাহলে সাইফুদ্দীন সেই সন্ধিকে বাতিল করানোর জন্য হাল্ব যেতে পারবে না। দাউদ হারিছকে বুঝিয়ে দেয় তাকে কী করতে হবে।
সেই রাত। সাইফুদ্দীন রুদ্ধ কক্ষে তার নায়েব সালার ও কমান্ডারের নিকট বসে তাদেরকে শেষবারের মতো নির্দেশনা প্রদান করছেন। রাতের প্রথম প্রহর। সর্বপ্রথম কমান্ডার সেখান থেকে বের হয়। হারিছের পিতা তার ঘোড়ার বাঁধন খুলে দেয়। কিছুক্ষণ পর নায়েব সালারও বেরিয়ে যায়। সাইফুদ্দীন এখন একা। তিনি শুয়ে পড়েন। হঠাৎ কক্ষের দরজাটা প্রবলবেগে খুলে যায়। তিনি ভয় পেয়ে উঠে বসেন। বিস্ফারিত নয়নে তাকান। ফাওজিয়া আপাদমস্তক উল্লসিত হয়ে ঢুকেই সাইফুদ্দীনের পাশে বসে এবং তার হস্তদ্বয় ঝাঁপটে ধরে।
ভাইয়া এসে পড়েছেন- ফাওজিয়া আনন্দে পাগলপারা হয়ে বললো সঙ্গে তার এক বন্ধু এসেছেন।
তুমি কি তাদেরকে বলেছো, আমি এখানে আছিঃ সাইফুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন।
হ্যাঁ- ফাওজিয়া বললো- আমি বলে দিয়েছি। শুনে তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছেন। তারা আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।
নিয়ে আসো। সাইফুদ্দীন বললেন।
***
দাউদ ও হারিছ সাইফুদ্দীনের কক্ষে প্রবেশ করে তাকে সামরিক কায়দায় সালাম জানায়। সাইফুদ্দীন ইঙ্গিতে তাদেরকে তার পাশে বসতে বলেন। তারা বসে পড়ে দাউদ ও হারিছ পোশাক ও মুখমণ্ডলে ধূলি মেখে এসেছে। তারা এমনভাবে শ্বাস ফেলছে, যেনো দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার দরুন ক্লান্ত। সাইফুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন- তোমরা কোন্ ইউনিটের সদস্য ছিলে?
