সাইফুদ্দীন এতদ্বিষয়ে দীর্ঘ বার্তা দিয়ে কমান্ডারকে বললেন- তুমি রাত পাহাবার আগেই আলো-আঁধারীতে রওনা হয়ে যাবে। দিনের বেলা যেনো এ এলাকায় কেউ তোমাকে দেখতে না পায়।
কিছু সময় বিশ্রাম নেয়ার পর কমান্ডার রওনা হয়ে যায়।
ফাওজিয়া যা কিছু শুনলো, দাউদকে বলে দিলো। এসব তথ্যও কাজের। হারিছ ও তার পিতা ঘুমিয়ে পড়েছে। দাউদ কি এক কাজে ঘর থেকে বের হয়। ফাওজিয়াও পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসে। দাউদ তার ঘোড়ার নিকট গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ফাওজিয়াও সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়।
আমাকে এর চেয়ে আরো বড় কাজ করতে দিন- ফাওজিয়া বললো আপনার জন্য আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত আছি।
আমার জন্য নয়, নিজ জাতি ও ধর্মের জন্য জীবন দিতে হবে- দাউদ বললো- তুমি যে কাজটা করেছে, এটা অনেক বড় কাজ। আমরা যারা গোয়ে, আমরা এ কাজেই নিজেদের জীবন বিলিয়ে থাকি। তোমার দ্বারা যে কাজ করাচ্ছি, তা মূলত আমার কাজ। আমি তোমাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিলাম।
কেমন ঝুঁকি?
তুমি এতোটা চতুর নও- দাউদ বললো- সাইফুদ্দীন রাজা। এ কুঁড়েঘরেও রাজা।
তা রাজা আমাকে খেয়ে ফেলবে নাকি?- ফাউজিয়া বললো- আমি চালাক না হতে পারি, সোজাও নই।
রাজত্বের চমক দেখলে তোমার চোখ বুজে আসবে- দাউদ বললো এই মানুষগুলো সেই চমকেই অন্ধ হয়ে ঈমান বিক্রি করেছে এবং ইসলামের মূলোৎপাটন করছে। আমার ভয় হচ্ছে, পাছে তুমিও সেই ফাঁদে আটকা পড়ে যাও কিনা।
আপনার বাড়ি কোথায়?
আমার কোনো ঠিকানা নেই- দাউদ বললো- আমি গুপ্তচর ও গেরিলা। যেখানে দুশমনের হাতে পড়বো, সেখানেই মারা যাবো। আর যেখানে মারা যাবো, সেটাই হবে আমার মাতৃভূমি। শহীদের রক্ত যে ভূখণ্ডে পতিত হয়, সেই ভূখণ্ড সালতানাতে ইসলামিয়ার হয়ে যায়। সেই ভূখণ্ডকে কুফর থেকে পবিত্র করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয হয়ে যায়। আমাদের মা ও বোনেরা আমাদেরকে প্রতিপালন করে আল্লাহর হাতে তুলে দিয়েছেন। তারা নিজেদের অন্তরে পাথর বেঁধে রেখেছেন এবং আমরা পুনরায় তাদের কোলে ফিরে যাবো।
আপনার অন্তরে বাড়ি যাওয়ার, মাকে দেখার এবং ভাই-বোনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আকাঙ্খ জাগে নিশ্চয়ই। ফাওজিয়া আপুত কণ্ঠে বললো।
মানুষ যখন কামনার গোলাম হয়ে যায়, তখন কর্তব্য অসম্পাদিত থেকে যায়- দাউদ বললো- ইসলামের একজন সৈনিককে জীবন কুরবান করার আগে আবেগ কুরবান করতে হয়। এই কুরবানী তোমাকেও দিতে হবে।
ফাওজিয়া দাউদের আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে বললো- আপনি কি আমাকে আপনার সঙ্গে রাখবেন?
না। দাউদের সুস্পষ্ট জবাব।
দিন কয়েক আমার কাছে থাকতে পারবেন? ফাওজিয়া জিজ্ঞেস করে।
আমার কর্তব্য যদি প্রয়োজন মনে করে, তাহলে পিরবো- দাউদ জবাব দেয়- তা আমাকে কাছে রেখে কী করবে?
আপনাকে আমার ভালো লাগে- ফাওজিয়া বললো- আপনার মুখ থেকে এমন আবেগমাখা মূল্যবান কথা শুনেছি, যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। আমার মন চায় আপনার সঙ্গে থাকি আর…।
আমার পায়ে শিকল বেঁধো না ফাওজিয়া- দাউদ বললো- নিজেকেও আবেগের শিকল থেকে মুক্ত রাখো। আমাদের সামনে বড় কঠিন পথ। পরস্পর হাতে হাত ধরে একসঙ্গে চলতে হবে বটে, একজন অপরজনের বন্দী হবো না। দাউদ খানিক চিন্তা করে বললো- ফাওজিয়া! তুমি বেশী দূর আমার সঙ্গ দিতে পারবে না। আমার কাছে তোমার ইজ্জতটা বেশী মূল্যবান। পুরুষদের কাজ পুরুষরাই করবে। তার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না।
সহসা ফাওজিয়ার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। দাউদকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত এক নজর দেখে নিয়ে কোন কথা না বলে মোড় ঘুরিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়। দাউদ ফাওজিয়ার বাহুতে হাত রাখে এবং তাকে কাছে টেনে চোখে চোখ রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ফাওজিয়া তার গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে যায় এবং আবেগ-কম্পিত কণ্ঠে বলে- যে কাজ পুরুষদের, তা নারীরাও করতে পারে। আমার সম্ভ্রম তো কাঁচ নয় যে, সামান্য আঘাতে ভেঙ্গে যাবে। আমি তোমাকে আমার সম্ভ্রম পেশ করছি না। তোমাকে আমার ভালো লাগে। তোমার কথাগুলো ভালো লাগে। আমাকে তুমি যে পথ দেখিয়েছে, তাও আমার কাছে ভালো লেগেছে। আমি তোমার গা ঘেঁষে এ জন্য দাঁড়িয়েছি, যাতে আমার ছোঁয়ায় তুমি তোমার মা কিংবা বোনের ঘ্রাণ লাভ করতে পারো। তুমি বড্ড ক্লান্ত দাউদ ভাই। আমার ভাবী আমাকে অনেক জ্ঞান দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পুরুষরা যখন ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে, তখন নারী ছাড়া কেউ তাদের ক্লান্তি দূর করতে পারে না। নারী না থাকলে পুরুষের আত্মা নির্জীব হয়ে যায়। আমার ভয় হচ্ছে, আপনার আত্মা যদি নির্জীব হয়ে যায়, তাহলে…।
দাউদ হেসে ওঠে এবং ফাওজিয়ার গালে আলতো হাত বুলিয়ে বললো তোমার এই সরল-সহজ কথাগুলো আমার আত্মাটাকে সজীব করে তুলেছে।
আমার কোনো কথা আপনার অপছন্দ হয়নি তো- ফাওজিয়া বললো ভাইয়াকে বলবেন না কিন্তু।
না, বলবো না- দাউদ বললো- তোমার ভাইকে এ ব্যাপারে কিছুই বলবো না। আর তোমার কোনো কথায় আমি কষ্ট পাইনি।
আপনার-আমার গন্তব্য একই- ফাওজিয়া বললো- মনের কথা কিভাবে বলতে হয়, আমার জানা নেই।
তুমি তোমার মনের কথাই বলে দিয়েছো ফাওজিয়া- দাউদ বললো আর আমিও বুঝে ফেলেছি, তুমি ঠিকই বলেছো, আমাদের গন্তব্য এক। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, পথে রক্তের নদী আছে, যার উপর কোনো পুল নেই। তুমি যদি চিরদিনের জন্য আমাকে পেতে চাও, তাহলে আমাদের বিয়ে হবে রক্তাক্ত প্রান্তরে। তারপর যদি আমাদের লাশ দুটো একটি অপরটি থেকে দূরে থাকে, তবু আমরা একত্রিত হবো। সত্য পথের পথিকদের বিয়ে পৃথিবীতে নয়, আকাশে হয়ে থাকে। তাদের বরযাত্রী পথ অতিক্রম করে ছায়াপথে। তাদের বিয়ের উৎসবে সমস্ত আকাশকে তারকা দ্বারা সজ্জিত করা হয়ে থাকে।
