***
দাউদ ও হারিছ ঘরে অবস্থান করছে। সাইফুদ্দীন ও তার নায়েব সালার দেউড়ি সংলগ্ন কক্ষে লুকিয়ে আছে। দিনের বেলা ফাওজিয়া তিন-চারবার উক্ত কক্ষে যাওয়া-আসা করছে। মেয়েটি যেহেতু সাইফুদ্দীনের কাছে গেলেও দুহাত দূরে থাকছে, সে কারণে তার প্রতি সাইফুদ্দীনের আকর্ষণ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি ফাওজিয়াকে বললেন- তোমার ভাই আমার ফৌজের সৈনিক। আমি তাকে বাহিনীর কমান্ডার বানিয়ে দেবো।
তিনি জীবিত আছেন নাকি মারা গেছেন, আমরা তাও তো জানি না ফাওজিয়া বললো- যদি মারাই গিয়ে থাকেন, তাহলে আমরা আশ্রয়হীন হয়ে পড়বো।
তাই যদি হয়, তাহলে আমি তোমার পিতা এবং ভাবীকেও সঙ্গে নিয়ে যাবো সাইফুদ্দীন বললেন।
ফাওজিয়ার পিতাও সাইফুদ্দীনের নিকট আসা-যাওয়া করছেন। তিনি কাজে-আচরণে সাইফুদ্দীনকে নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি তার অফাদার।
রাতে পুনরায় দরজায় করাঘাত পড়ে। বৃদ্ধ দরজা খোলেন। বাইরে সাইফুদ্দীনের সেই কমান্ডার দাঁড়িয়ে, যাকে তিনি হাল্ব পাঠিয়েছিলেন। বৃদ্ধ তাকে সাইফুদ্দীনের কক্ষে পাঠিয়ে দেন। তার ঘোড়াও অন্য ঘোড়াগুলোর সঙ্গে বেঁধে রেখে ঘরে গিয়ে কমান্ডারের খাওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চান। কমান্ডার অনেক দ্রুত এসেছে। পথে কোথাও দাঁড়ায়নি। ফলে পথে খাওয়া সম্ভব হয়নি। বৃদ্ধ খাবার আনার জন্য ভেতরে গেলে ফাওজিয়া বললো আপনার যেতে হবে না, আমি নিয়ে যাচ্ছি। তার উদ্দেশ্য, এই সুযোগে কমান্ডারের নিয়ে আসা তথ্যও সে সগ্রহ করবে।
ফাওজিয়া খাবার নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। বক্তব্যরত কমান্ডার তাকে দেখেই থেমে যায়। সাইফুদ্দীন বললেন- অসুবিধা নেই, বলো, ও আমাদেরই মেয়ে। ফাওজিয়া কমান্ডারের সামনে খাবার রেখে সাইফুদ্দীনের পাশে বসে পড়ে। এই প্রথমবার মেয়েটি সাইফুদ্দীনের এত কাছে গিয়ে বসলো। সাইফুদ্দীন তার একটি হাত নিজের মুঠোয় নেয়। ফাওজিয়া হাত ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করেনি। অন্যথায় খৃস্টানদের এই বন্ধু তার হাতছাড়া হয়ে যেতো। এই লম্পট শাসককে মুঠোয় রাখার এ এক মোক্ষম অস্ত্র।
হালবের বাহিনীর জযবা প্রশংসার দাবীদার- কমান্ডার বলা শুরু করে। ফাওজিয়া সাইফুদ্দীনের আঙ্গুলে পরিহিত একটি আংটিতে হাত রেখে নাড়াচাড়া করছে এবং হিরার এই আংটিটার প্রতি শিশুসুলভ আকর্ষণ নিয়ে তাকিয়ে আছে। যেনো কমান্ডারের বক্তব্যের প্রতি তার কোনো আকর্ষণ নেই। কিন্তু কান দুটো তার সেদিকেই খাড়া আছে। কমান্ডার বললো- আল মালিকুস সালিহ সালাহুদ্দীন আইউবীকে সন্ধির প্রস্তাব প্রেরণ করেছেন।
সন্ধির প্রস্তাব? সাইফুদ্দীন চমকে ওঠে জিজ্ঞেস করেন।
জ্বি হ্যাঁ, সন্ধির প্রস্তাব।- কমান্ডার বললো- কিন্তু আমি তথ্য পেয়েছি, তিনি আইউবীকে ধোঁকা দিয়েছেন। তার খৃস্টান বন্ধুরা তার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দিচ্ছে এবং তাকে উস্কানি দিচ্ছে, যেনো তিনি মসুল ও হাররানের বাহিনীকে একক কমান্ডে নিয়ে এসে অবিলম্বে সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর হামলা করেন। আইউবী যদি সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে যায় এবং নতুন ভর্তি দিয়ে সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করে, তাহলে তাকে প্রতিহত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। গুপ্তচর সংবাদ নিয়ে এসেছে, সালাহুদ্দীন আইউবী তুর্কমানের সবুজ-শ্যামল অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ের জন্য ছাউনী ফেলেছেন এবং সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি অতি দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করছেন। আল-মালিকুস সালিহর সালারেরও একই অভিমত যে, তুকমান এলাকায়ই সালাহুদ্দীনের উপর এখনই হামলা করা উচিত।
আমি হা্লবের বাহিনীর এক খৃস্টান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করে নিয়েছিলাম। আমি তাকে বললাম, আমরা এখনই সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর হামলা করাতে সক্ষম নই। তিনি বললেন, এটা তোমাদের বিরাট সামরিক ক্রটি বলে বিবেচিত হবে। সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর হামলা করার উদ্দেশ্য, তাকে এখনই পরাজিত করা নয়। উদ্দেশ্য হলো, তাকে সুযোগ দেয়া যাবে না। তাকে তুর্কমানের এলাকাতেই অস্থির করে রাখতে হবে এবং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত যুদ্ধ ধরে রাখতে হবে। এই যুদ্ধ পরিচালনা করতে হবে আইউবীরই ধারায় আঘাত করো, পালিয়ে যাও, গেরিলা হামলা করো ধরনের। চেষ্টা করতে হবে, তুকমানেরযেখানেই পানি আছে, আইউবীকে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে হবে, যাতে খানা-পানির অভাবে সে সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
বড় ভালো বুদ্ধি তো- সাইফুদ্দীন বললেন- এমন যুদ্ধ আমার, সিপাহসালার মুজাফফর উদ্দীন লড়তে পারে। দীর্ঘদিন যাবত সে সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে থেকে এসেছে। তিন ফৌজের একক কমান্ড যাতে আমার হাতে চলে আসে। আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে মরু শিয়ালের ন্যায় ধোকা দিয়ে মারবো।
ফাওজিয়া সাইফুদ্দীনের তরবারীটা কোষ থেকে বের করে হাতে নিয়ে দেখতে শুরু করে। মেয়েটা একেবারে অবুঝ শিশুর মতো বসে আছে।
আমি আল-মালিকুস সালিহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করেছি- কমান্ডার বললো- কিন্তু সালার ও কর্মকর্তারা তাকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছে যে, তা সম্ভব হলো না। এসব তথ্য আমি তার সালারদের থেকে সগ্রহ করেছি।
তোমাকে আজ পুনরায় হাল্ব যেতে হবে- সাইফুদ্দীন বললেন- আল মালিকুস সালিহকে বার্তা দিয়ে আসবে, তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে সন্ধি করে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছো। তুমি আইউবীর সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। তার হাত শক্ত করে দিয়েছে। সে আমাদের কাউকেই ক্ষমা করবে না। তুমি এখনো বালক। তুমি ভয় পেয়ে গেছে কিংবা তোমার সালারগণ যুদ্ধ এড়ানোর জন্য তোমাকে এই পরামর্শ দিয়েছে।
