সাইফুদ্দীন হারিছের বোনকে যা যা বলেছেন, মেয়েটি তার পিঞ্জ, ভাই হারিছ ও দাউদকে সব শোনায়।
মেয়েটির নাম ফাওজিয়া। গায়ের সরজ-সরল মেয়ে। আল্লাহ তাকে দিয়ানত ও জযবা দান করেছেন। দাউদ তাকে সাইফুদ্দীনের বক্ষ থেকে তথ্য বের করার দায়িত্ব অর্পন করেছিলো। কৌশলও বুঝিয়ে দিয়েছিলো মেয়েটিকে। বলেছিলো, লোকটা বিলাসী ও অসৎ। তাই তার ফাঁদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। ফাওজিয়া অত্যন্ত চমৎকারভাবে কর্তব্য পালন করে। সে সাইফুদ্দীনের হৃদয় থেকে যেসব তথ্য বের করে এনেছে, তাতে দাউদ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, সাইফুদ্দীনের পিছু নেয়া আবশ্যক।
মধ্যরাতের খানিক আগে বৃদ্ধের চোখ খুলে যায়। তিনি দরজায় করাঘাতের শব্দ ও ঘোড়ার হোধ্বনি শুনতে পান। শয্যা ত্যাগ করে উঠে দরজা খোলেন। বাইরে সাইফুদ্দীনের নায়েব সালার দাঁড়িয়ে। বৃদ্ধ তার ঘোড়াটা একদিকে সরিয়ে নিয়ে যান। নায়েব সালার ভেতরে চলে যায়। বৃদ্ধ ঘরে প্রবেশ করে নায়েব সালারের খাওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা জিজ্ঞেস করে। নায়েব সালার প্রযোজন নেই বলে জবাব দেয়। বৃদ্ধ তার সঙ্গে ভৃত্যের ন্যায় আচরণ করেন। সাইফুদ্দীন বললেন, ঠিক আছে, আপনি গিয়ে শুয়ে পড়ুন। বৃদ্ধ প্রজার ন্যায় আদবের সাথে বেরিয়ে যান। তিনি দাউদকে জাগিয়ে তোলেন এবং দুজনে দরজার সঙ্গে কান লাগিয়ে দাঁড়িয়ে যান।
গোমস্তগীন সম্পর্কে জানতে পেরেছি, তিনি হাবে আল-মালিকুস সালিহর সঙ্গে আছেন- নায়েব সালার বললো- মসুলে যে পরিস্থিতি দেখেছি, তা এতো খারাপ নয় যে, আমরা যুদ্ধ করতেই পারবো না। সালাহুদ্দীন আইউবী তুমানে থেমে গেছেন। খৃস্টান গোয়েন্দারা জানিয়েছে, আইউবী আল-জাযিরা, দিয়ার, বকর ও আশপাশের অঞ্চলগুলো থেকে লোকদেরকে ফৌজে ভর্তি করছেন। মনে হচ্ছে, তিনি এক্ষুণি সম্মুখে অগ্রসর হবেন না। তবে তিনি অগ্রসর হবেন অবশ্যই, যা হবে ঝড়ের ন্যায়। তার ফৌজের তাবু বলছে, তিনি সেই স্থানে অনেক দিন অবস্থান করবেন। সম্ভবত তিনি এই আত্ম-প্রবঞ্চনায় লিপ্ত যে, আমরা যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের যে ফৌজ মসুল গিয়ে পৌঁছেছে, তাদের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশের অনেক কম। অন্যরা মৃত্যুবরণ করেছে। অনেকে নিখোঁজ রয়েছে।
তাহলে কি এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারা সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর হামলা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে? সাইফুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন।
শুধু আমাদের ফৌজ হামলার জন্য যথেষ্ট নয়- নায়েব সালার জবাব দেয়- আল মালিকুস সালিহ ও গোমস্তগীনকে সঙ্গে নিতে হবে। আমাদের উপদেষ্টাগণ (খৃস্টানরা) এ পরামর্শই প্রদান করেছে।
তুমি কি তাদেরকে বলেছে, আমি কোথায় আছি? সাইফুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন।
না, আমি এ জায়গার কথা বলিনি- নায়েব সালার জবাব দেয়- আমি তাদেরকে বলেছি, আপনি তুর্কমানের উপকণ্ঠে ঘোরাফেরা করছেন এবং নিজ চোখে সালাহুদ্দীন আইউবীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করছেন। আমার পরামর্শ, তিন-চার দিন পর আপনাকে মসুল চলে যাওয়া উচিত।
তার আগে হাবের খবরাখবর জানতে হবে- সাইফুদ্দীন বললেন কমান্ডার কাল সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসবে। তুমি তো জানো, গোমস্তগীন শয়তান চরিত্রের মানুষ। তাকে তার দুর্গে (হাররানে) চলে যাওয়া উচিত ছিলো। লোকটা হাবে কী করছে? আমি মসুল যাওয়ার আগে হাব যাবো। গোমস্তগীন আমার জোট সদস্য বটে; কিন্তু আমি তাকে বন্ধু ভাবতে পারি না। আল-মালিকুস সালিহর সালারদেরকে মতে আনতে হবে, সালাহুদ্দীন আইউবীর এ গড়িমসিকে কাজে লাগাতে হবে এবং সময় নষ্ট না করে হামলা করতে হবে। এখন আমি এ পরামর্শও দেবো যে, তিনটি ফৌজ একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে পরিচালিত হওয়া উচিত এবং তার একজন প্রধান সেনাপতি থাকা আবশ্যক। আমরা শুধু এ জন্য পরাজয়বরণ করেছি যে, আমাদের বাহিনীগুলোর কমান্ড পৃথক পৃথক ছিলো। এক বাহিনীর অপর বাহিনীর পরিকল্পনা ও কৌশল জানা ছিলো না। অন্যথায় মুজাফফর উদ্দীন সালাহুদ্দীন আইউবীর পার্শ্বর উপর যে হামলা করেছিলো, তা ব্যর্থ হওয়ার কথা ছিলো না।
তখন কেন্দ্রীয় কমান্ড আপনার হাতে থাকতে হবে। নায়েব সালার বললো।
আর আমাদেরকে বন্ধুদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে- সাইফুদ্দীন বললেন এবং জিজ্ঞেস করলেন- আচ্ছা, খৃস্টানরা কি আমাদেরকে সাহায্য করবে?
তারা সৈন্য তো দেবে না- নায়েব সালার জবাব দেয়- উট-ঘোড়া ও অস্ত্র ইত্যাদি সরবরাহ করবে। আচ্ছা, এখানে আপনি কোনো সমস্যা অনুভব করছেন কি?
না- সাইফুদ্দীন বললেন- বৃদ্ধকে নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে। তার মেয়ে আমার ফাঁদে এসে গেছে। কিন্তু মেয়েটি আবেগপ্রবণ। বলছে, সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করে তার তরবারী নিয়ে নাও। তারপর তার ঘোড়ায় সাওয়ার হয়ে আসো। আমি তোমার সঙ্গে চলে যাবো।
নায়েব সালার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। হারিছ, তার পিতা ও দাউদ দরজার সঙ্গে কান লাগিয়ে তাদের কথোপকথন শুনছে। সাইফুদ্দীন ও তার নায়েব সালারের ফেরেস্তারাও জানে না, এ গৃহে একজন বৃদ্ধ ও দুটি মেয়ে ছাড়া দুজন যুবক মুজাহিদও আছে, যারা যে কোন উপযুক্ত সময়ে তাদেরকে হত্যা করে ফেলতে পারে। সাইফুদ্দীনের মনে সন্দেহের লেশমাত্র নেই যে, তিনি ফাওজিয়াকে ফাঁদে ফেলেননি, বরং তিনিই ফাওজিয়ার জালে আটকা পড়েছেন।
