আমরা যদি আপনাকে এই ঝুপড়িতেই রেখে দেই, তাহলে কি আপনি খুশি হবেন না? মেয়েটি হেসে জিজ্ঞেস করে।
আমরা বনে-জঙ্গলেও থাকতে পারি- সাইফুদ্দীন বললেন- কিন্তু তোমরা তো ফুল দ্বারা সাজিয়ে রাখার মতো বস্তু।
আপনি কি নিশ্চিত যে, আপনার কপালে পুনরায় মহলে যাওয়া লেখা আছে? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
এমনটা বলছো কেন? সাইফুদ্দীন জিজ্ঞেস করে।
আপনার অবস্থা দেখে মেয়েটি বললো- রাজার ঝুপড়িতে আত্মগোপন করা প্রমাণ করে তার রাজত্ব ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তার বাহিনী তাকে ত্যাগ করেছে।
ফৌজ আমার সঙ্গ ত্যাগ করেনি- সাইফুদ্দীন বললেন- আমি একটুখানি বিশ্রাম নেয়ার জন্য এখানে যাত্রাবিরতি দিয়েছি। মহল শুধু আমার নসীবেই নয়, তোমাদেরও ভাগ্যে লেখা আছে। যাবে না আমার সঙ্গে?
হারিছের স্ত্রী কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। বোন সাইফুদ্দীনের কাছে বসে কথা বলতে শুরু করে। আপনার স্থলে যদি আমি হতাম, তাহলে সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত না করে মহলের নামও উচ্চারণ করতাম না। আপনি যদি আমাকে পছন্দ করেই থাকেন, তাহলে আমি আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি, আপনার এই পলায়ন ও আত্মগোপন করা আমার মোটেই পছন্দ নয়। যুদ্ধকুশলী রাজার ন্যায় বেরিয়ে পড়ুন। বাহিনীকে একত্রিত করুন এবং সুলতান আইউবীর উপর হামলা করুন।
মেয়েটি সরল প্রকৃতির মানুষ। তবে তার সরলতায় সৌন্দর্য আছে। সাইফুদ্দীন বিমোহিত নয়নে তার প্রতি তাকিয়ে আছে। ঠোঁটে তার মুচকি হাসি। সেই হাসিতে যেমন আছে ভালোবাসা, তেমনি কু-পরিকল্পনাও।
আমি রাজকন্যা নই- মেয়েটি বললো- এই পার্বত্য এলাকায় জন্ম এবং এখানেই বড় হওয়া। আমি সৈনিকের কন্যা, সৈনিকের বোন। আপনার সঙ্গে আমি প্রাসাদে নয়, যুদ্ধের ময়দানে যাবো। আপনি কি আমার সঙ্গে তরবারী চালনার প্রতিযোগিতা করবেন? পাহাড়ের নীচ থেকে উপরে, উপর থেকে নীচে আমার সঙ্গে ঘোড়া দৌড়াবেন?
তুমি শুধু রূপসীই নও, যোদ্ধাও- সাইফুদ্দীন মেয়েটির মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন- এমন মায়াবী চুল আমি এই প্রথম দেখলাম।
মেয়েটি সাইফুদ্দীনের বেয়াড়া হাতটা সযত্নে সরিয়ে দিয়ে বললো- চুল নয়, বাহু। এই মুহূর্তে আপনাকে চুলের নয়, আমার বাহুর প্রয়োজন। আমাকে বলুন, আপনার ইচ্ছে কী?
তোমার পিতা একজন ভয়ংকর মানুষ- সাইফুদ্দীন বললেন- তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর সমর্থক এবং সম্ভবত আমাকে পছন্দ করেন না। আমার আশংকা, তিনি আমাকে ধোঁকা দেবেন।
আব্বাজান বৃদ্ধ মানুষ- মেয়েটি মুখে হাসি টেনে বললো- আপনার সঙ্গে তিনি কী কথা বলেছেন, তা অবশ্য আমার জানা নেই। আমাদের সামনে তো আপনার ভূয়সী প্রশংসাই করলেন। তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর নামটাই শুনেছেন। তার সম্পর্কে আর কিছু জানেন না। আপনার তাকে ভয় করার কোনো কারণ নেই। একজন দুর্বল বৃদ্ধ মানুষ আপনার কিইবা ক্ষতি করতে পারবে। আপনি আমাকে পরীক্ষা করে দেখুন।
সাইফুদ্দীন মেয়েটির প্রতি হাত বাড়ায়। মেয়েটি পেছনে সরে গিয়ে বলতে শুরু করে আপনাকে আমি আমার দেহ থেকে বঞ্চিত করবো না। নিজেকে আপনার হাতে তুলে দেবো। কিন্তু তখন দেবো, যখন আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করে ফিরে আসবেন। এ মুহূর্তে আপনি বিপদগ্রস্ত। আপাতত আমার থেকে দূরে থাকুন। বলুন, আপনার পরিকল্পনা কী?
সাইফুদ্দীন বিলাসী ও নারীপূজারী পুরুষ। রূপসী নারী তার জন্য অভিনব কিছু নয়। কিন্তু এই মেয়েটির মধ্যে বিস্ময়কর যে বিষয়টি প্রত্যক্ষ করলেন, তাহলে মেয়েটি তার সম্মুখে অবনত হচ্ছে না। এর আগে তো যে কোনো মেয়ে প্রশিক্ষিত জন্তুর ন্যায় তার আঙ্গুলের ইশারায় নেচে বেড়াতো। কিন্তু এই মেয়েটি তার উপর এমনভাবে আঘাত হানলো যে, তার আত্মমর্যাদা জেগে ওঠেছে।
শোন রূপসী- সাইফুদ্দীন বললো- তুমি আমার পৌরুষের পরীক্ষা নিতে চেয়েছে। শপথ নিলাম, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার গায়ে হাত দেবো না, যতক্ষণ না সালাহুদ্দীন আইউবীর তরবারী আমার হাতে চলে আসবে এবং আমি তার ঘোড়ায় সওয়ার হবো। আমাকে ওয়াদা দাও, তুমি আমার কাছে চলে আসবে।
আমাকে আপনার সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে চলুন। মেয়েটি বললো।
না–সাইফুদ্দীন বললেন- আমাকে এখনো বাহিনী প্রস্তুত করতে হবে। আমি এক ব্যক্তিকে মসুল পাঠিয়ে দিয়েছি। তাকে বলে পাঠিয়েছি, তোমরা ফৌজকে একত্রিত করো এবং অবিলম্বে সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর আক্রমণ করো, যাতে তিনি আমাদের শহর অবরোধ করতে আসতে না পারেন। আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার প্রেরিত উভয় ব্যক্তি ফিরে আসার কথা। তখন জানা যাবে, হাল্ব ও হাররানের ফৌজ কী অবস্থায় আছে। আমরা পরাজয় মেনে নেবো, না। পাল্টা আক্রমণ করবো এবং অবিলম্বে করবো।
সাইফুদ্দীন এখন ব্যক্তিত্বহারা মানুষ। নারীপূজা ও ঈমান বিক্রি তার চরিত্রকে এমনই ফোকলা করে দিয়েছে যে, সহজ-সরল একটি মেয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের গোপন তথ্য ফাঁস করতে শুরু করেছে। মেয়েটি তার হাতে চুমো খেয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
***
সাইফুদ্দীনের সঙ্গে যে লোকটি এসেছিলো, তাদের একজনকে তিনি মসুল পাঠিয়ে দিয়েছেন, অপ্রজনকে হাব- হারিসের বোন পিতা, ভাই ও দাউদকে বললো- তার পরিকল্পনা হচ্ছে, তিনটি বাহিনীকে একত্রিত করে অবিলম্বে সুলতান আইউবীর উপর আক্রমণ করা, যাতে তিনি অগ্রসর হয়ে শহর অবরোধ করতে না পারেন। যে দুব্যক্তিকে তিনি প্রেরণ করেছেন, তারা এসে জানাবে, ফৌজ যুদ্ধ করার অবস্থায় আছে কিনা।
