এবার কমাণ্ডারকে আওয়াজ দেয় রক্ষীরা। কিন্তু কোন শব্দ-সাড়া নেই তার। তাদের ডাকাডাকিতে জেগে ওঠে মেয়েরা। জেগে ওঠে অপর রক্ষীরাও। চারটি লাশ দেখতে পায় মেয়েরা। লাশগুলো তাদের-ই চার সঙ্গীর। তারা আঁৎকে উঠে। দেহে একটি একটি করে তীর নিয়ে শুয়ে আছে লাশগুলো। অপলক নেত্রে নিঃশব্দে লাশগুলোর প্রতি তাকিয়ে থাকে মেয়েরা। কী করতে এসে সঙ্গীরা লাশ হলো, তা বুঝতে বাকী রইলো না তাদের। আজ রাতের পরিকল্পনা সম্পর্কে তারাও অবহিত।
মিসরী কমাণ্ডার ছাউনীতে নেই। নেই একটি মেয়েও।
কয়েদী গোয়েন্দাদের বুকে যখন তীর বিদ্ধ হলো, ঠিক তখন রক্ষীদের মিসরী কমাণ্ডারের পিঠেও বিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো একটি খঞ্জর। দুটি টিলার পরে তৃতীয় একটি টিলার নীচে পড়ে আছে তার লাশ। সে সংবাদ জানে না রক্ষীরা।
তাঁবু থেকে তুলে মেয়েটি বেশ দুরে তার পছন্দমত একটি স্থানে নিয়ে গিয়েছিলো কমাণ্ডারকে। রাতের আঁধারে মেয়েটিকে নিয়ে আমোদে মেতে উঠে কমাণ্ডার। একটি টিলার আড়ালে বসে আছে দুজন। সে টিলার-ই খানিক দূরে তাঁবু ফেলেছিলো বালিয়ান। মুবীর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বালিয়ানও এগিয়ে আসে টিলার দিকে। হাতে তার মদের বোতল। নীচে বিছানোর জন্য মুবী হাতে করে নিয়ে আসে একটি শতরঞ্জি। একস্থানে শতরঞ্জি বিছিয়ে বসে পড়ে মুবী। পাশে বসে মুবীকে জড়িয়ে ধরে বালিয়ান।
হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে কারো কথা বলার শব্দ ভেসে আসে তাদের কানে। কান খাড়া করে শব্দটা কোন্ দিক থেকে আসছে, আন্দাজ করার চেষ্টা করে বালিয়ান। কী বলছে, তাও বুঝবার চেষ্টা করে সে। বুঝা গেলো কণ্ঠটি একটি মেয়ের। বালিয়ান ও মুবী উঠে দাঁড়ায়। পা টিপে টিপে এগিয়ে যায় সেদিকে। কাছে গিয়ে টিলার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে তাকায় দুজনে। দুটি ছায়ামূর্তি বসে আছে দেখতে পায় তারা। আরো গভীর দৃষ্টিতে তাকায়। এবার পরিষ্কার বুঝতে পারে, ছায়ামূর্তি দুটির একটি নারী অপরটি পুরুষ। আরো নিকটে চলে যায় মুবী। সে গভীর মনে তাদের আলাপ বুঝতে চেষ্টা করে। মিসরী কমাণ্ডারের সঙ্গে মেয়েটি এমন স্পষ্ট ভাষায় কথা বলছিলো যে, মুবী নিশ্চিত হয়ে যায়, মেয়েটি তার-ই এক সহকর্মী। তারা আরো বুঝে ফেলে, কায়রো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মেয়েটিকে।
মিসরী কমাণ্ডারের আচরণ ও কথোপকথনে মুবী নিশ্চিত বুঝে ফেলে, লোকটি এ মেয়েটিকে তার অসহায়ত্বের সুযোগে ভোগের উপকরণে পরিণত করে রেখেছে। মনে মনে ফন্দি আঁটে মুবী। পিছনে সরে গিয়ে বালিয়ানকে কানে কানে বলে–লোকটি মিসরী। সঙ্গের মেয়েটি আমার-ই সহকর্মী। বেটা জোরপূর্বক ফুর্তি করছে মেয়েটিকে নিয়ে। তুমি তাকে রক্ষা করো। এই মিসরী লোকটি তোমার দুশমন আর মেয়েটি আমার আপন। বালিয়ানকে উত্তেজিত করার জন্য মুবী আরো বলে–মেয়েটি বেশ সুন্দরী। মিসরীর কবল থেকে ওকে উদ্ধার করে আনো, এই সফরে ওকে নিয়ে বেশ আমোদ করতে পারবে।
একটু আগেই মদপান করেছিলো বালিয়ান। মাথাটা এখনো তার ঢুলুঢুলু করছে। এবার খুনের নেশা পেয়ে বসেছে তাকে। সে মুবীর দেখানো লোভ সামলাতে পারলো না। কোমরবন্ধ থেকে খঞ্জর বের করে হাতে নেয় বালিয়ান। বিলম্ব না করে দ্রুত এগিয়ে যায় মিসরীর প্রতি। খঞ্জরের আঘাত হানে তার পিঠে। পিঠ থেকে খঞ্জরটি টেনে বের করে মারে আরেক ঘা। লুটিয়ে পড়ে মিসরী।
মিসরীর কবল থেকে মুক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায় মেয়েটি। দৌড়ে আসে মুবী। সাংকেতিক শব্দে ডাক পাড়ে মেয়েটিকে। মেয়েটি হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে জড়িয়ে ধরে মুবীকে। অন্য মেয়েরা কোথায়, জিজ্ঞেস করে মুবী। সঙ্গী মেয়েরা কোথায় কিভাবে আছে, জানায় মেয়েটি। সে রবিন এবং তার সাথীদের কথাও জানায়।
পিছন দিকে দৌড়ে যায় বালিয়ান। ডেকে তুলে নিজের ছয় সঙ্গীকে। তাদের কাছে আছে ধনুক ও অন্যান্য হাতিয়ার।
ইত্যবসরে মুসলিম রক্ষীদের একজন কমাণ্ডারকে ডাকতে ডাকতে এগিয়ে আসে এদিকে। তীর ছুঁড়ে বালিয়ানের এক সঙ্গী; খতম করে দেয় রক্ষীকে। মেয়েটি তাদের নিয়ে হাঁটা দেয় ছাউনির দিকে।
সর্বশেষ টিলাটির পিছনে আলো দেখতে পায় বালিয়ান। টিলার আড়ালে গিয়ে উঁকি দিয়ে তাকায় সে। বড় বড় দুটি মশাল জ্বলছে। মশালের দণ্ডগুলো লম্বা হয়ে পড়ে আছে মাটিতে।
বালিয়ান ও তার সঙ্গীরা যেস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, জায়গাটা অন্ধকার। কিন্তু যে স্থানে মশাল জ্বলছে, সেখানে একধারে পাঁচটি মেয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পায় সে। রক্ষীরাও দাঁড়িয়ে। তাদের মধ্যখানে পড়ে আছে পাঁচটি লাশ। লাশগুলোর গায়ে তীরবিদ্ধ। মুবী ও অপর মেয়েটির কান্না এসে যায়। মুবীর উস্কানীতে এবার বালিয়ান রক্ষীদের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে তার সঙ্গীদের বলে, এরা তোমাদের শিকার, তীর ছুঁড়ে বেটাদের শেষ করে দাও। সংখ্যায় এখন তারা চৌদ্দ। দুর্ভাগ্যবশত মশালের আলোতে তাদেরকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে শিকারীরা।
ধনুকে তীর সংযোজন করে বালিয়ানের সঙ্গীরা। একই সময়ে শো করে ছুটে আসে ছয়টি তীর। এক সঙ্গে শেষ হয়ে যায় ছয়জন রক্ষী। বাকীরা কোত্থেকে কী হলো বুঝে উঠতে না উঠতে ছুটে আসে আরো ছয়টি তীর। মাটিতে পড়ে যায় আরো ছয় রক্ষী। এখনো বেঁচে আছে দুজন। অন্ধকারে গায়েব হয়ে যায় তাদের একজন। পালাবার চেষ্টা করে অপরজনও। কিন্তু একত্রে তিনটি তীর এসে বিদ্ধ হয় তার পিঠের তিন জায়গায়। শেষ হয়ে যায় সে-ও। রক্ষা পেয়ে গেছে তিন উষ্ট্ৰচালক। ঘটনার সময় এখানে ছিলো না তারা। পরে দূর থেকে টের পেয়ে তারা অন্ধকারে হাওয়া হয়ে গিয়েছিলো।
