আমি কিন্তু খুন ছাড়া আর কোন পরিকল্পনার কথা শুনতে প্রস্তুত নই। হারিছ বললো।
আপনারা যদি নিজেদের বিবেক ও আবেগের লাগাম আমার হাতে তুলে দেন, তাহলে আপনাদের হাতে আমি এমন কাজ করাব, যা আপনাদের আত্মাকে শান্তিতে ভরে দেবে। দাউদ গম্ভীর দৃষ্টিতে পিতা-পুত্রের প্রতি তাকায়। হারিছের স্ত্রী ও বোন খানিক দূরে বসে তাদের কথোপকথন শুনছিলো। দাউদ তাদের প্রতিও গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করে বললো- আমাকে একখানা কুরআন দিন।
হারিছের বোন উঠে গিয়ে একখানা কুরআন হাতে নিয়ে তাতে চোখ লাগিয়ে চুমো খেয়ে এনে দাউদের দিকে এগিয়ে দেয়। দাউদ কুরআনখানা হাতে নিয়ে তাতে চুম্বন করে। তারপর কুরআন খুলে একস্থানে আঙ্গুল রেখে পড়তে শুরু করে, যার মর্মার্থ হলো :
শয়তান তাদেরকে তাদের কজায় নিয়ে নিয়েছে এবং আল্লাহর স্মরণ তাদের মস্তিষ্ক থেকে উদাও হয়ে গেছে। ওরা শয়তানের দল। তোমরা শুনে, রাখো, শয়তানের দলের ক্ষতি অবধারিত। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তারা লাঞ্ছিত হবে।
কুরআন খোলামাত্র সূরা হাশরের এই আঠার ও ঊনিশতম আয়াত দুটি বেরিয়ে আসে। দাউদ বললো- এটি আল্লাহ পাকের বাণী। আমি নিজের মর্জিতে এই পাতাটা খুলিনি। এই আয়াতগুলো আপনা আপনি আমার সামনে : এসে পড়েছে। এটি আল্লাহ পাকের ঘোষণা ও তার সুসংবাদ। কুরআন আমাদেরকে বলে দিয়েছে, এরা শয়তানের সৈনিক। কুরআন ঘোষণা করেছে, যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তারা লাঞ্ছিত হবে। কিন্তু তারা ততোক্ষণ পর্যন্ত লাঞ্ছিত হবে না, যতক্ষণ না আমরা চেষ্টা চালিয়ে তাদের অপমানের পথ সৃষ্টি করবে। তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্ত করা আমাদের কর্তব্য।
দাউদ কুরআনখানা দুহাতের তালুতে রেখে সম্মুখে এগিয়ে ধরে বললো আপনারা প্রত্যেকে নিজ নিজ ডান হাতখানা এই কুরআনের উপর রেখে বলুন, আমরা আমাদের গোপনীয়তা ফাঁস করবে না এবং দুশমনকে পরাজিত করতে নিজের জীবন কুরবান করে দেবো।
সকলেই- যাদের মধ্যে দুজন মহিলাও রয়েছে- কুরআনের উপর হাত রেখে শপথ করে। কুরআন তাদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তা তাদের চেহারায় ভেসে ওঠে। কক্ষে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ ছাড়া আর কোন সাড়া নেই। দাউদ প্রতিক্রিয়াটা গভীরভাবে লক্ষ্য করে।
আপনারা কুরআনে হাত রেখে শপথ করেছেন- দাউদ বললো- আল্লাহ তাআলা কুরআনকে আপনাদের ভাষায় অবতীর্ণ করেছেন। এই পবিত্র গ্রন্থটির প্রতিটি শব্দ আপনারা বুঝেন। কৃত অঙ্গীকার থেকে যদি আপনারা সরে যান, তাহলে তার শাস্তিও কুরআনে লেখা আছে। তখন আপনারা সেই লাঞ্ছনা ও অপমানের শিকার হবেন, যা শয়তানের বাহিনীর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তুমি কে? বৃদ্ধ বিস্ময়মাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন- তোমাকে তো বড় আলেম বলে মনে হচ্ছে।
আমার মধ্যে কোন ইলম নেই- দাউদ বললো- আমার নিকট আছে আমল। আমি কুরআনের নির্দেশে জীবন হাতে নিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি। এই পাঠ আমাকে কোনো আলিম নয়, সালাহুদ্দীন আইউবী শিক্ষা দিয়েছেন। মসুলের নয়, আমি দামেস্কের বাসিন্দা। আমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রেরিত গোয়েন্দা। এই সেই গোপন তথ্য, যা ফাঁস করবেন না বলে আপনারা শপথ করেছেন। আমাকে আপনাদের প্রত্যেকের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাকে নিশ্চয়তা দিন, আমি যা বলবো, আপনারা বিনা বাক্য ব্যয়ে তা পালন করবেন।
আমরা শপথ করেছি-বৃদ্ধ কললেন- তুমি তোমার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা ব্যক্ত করো।
আল্লাহ আমার প্রতি মুখ তুলে তাকিয়েছেন- দাউদ বললো- যার পক্ষ থেকে তথ্য বের করে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট পৌঁছানোর কথা, তিনি এখন সেই ছাদের তলে শায়িত, যে ছাদের নীচে আমি বা আছি। মহান আল্লাহ ফেরেস্তাদের মাধ্যমে এখানে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। আমাকে জানতে হবে, সাইফুদ্দীন ও তার বন্ধুদের পরিকল্পনা কী? তা। যদি পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে সংকল্পবদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে প্রস্তুতি গ্রহণের আগেই কিংবা প্রস্তুতি গ্রহণ অবস্থায় ধ্বংস করে দিতে হবে। সময়ের আগেই তাদের পরিকল্পনা জানতে হবে। হতে পারে, সুলতান আইউবী প্রস্তুত থাকবেন না আর এরা হঠাৎ আক্রমণ করে বসবে আপনারা জানেন, এমনটি হলে পরিণতি কী হবে।– যারা প্রতারণার মাধ্যমে নিজেদের্ন বাহিনীকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আমি তাদেরকে হত্যা করার অনুমতি পেতে পারি কী? হারিছ জিজ্ঞেস করে।
শোন বন্ধু! দাউদ বললো- কোনো কোনো পরিস্থিতিতে হাতের কাছে পেয়েও শত্রুকে বধ না করা কল্যাণকর হয়ে থাকে। প্রতিটি কদম তোমাকে বুঝে-শুনে ঠাণ্ডা মাথায় ফেলতে হবে। সাইফুদ্দীনের প্রতি আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে এবং তাকে ধাওয়া করতে হবে। ইনি এখানে এসে যেভাবে আত্মগোপন করেছেন, তেমনি আমি ও হারিছ লুকিয়ে থাকবে এবং দেখবো লোকটা কী করে।
***
উক্ত গৃহের এক কক্ষে গভীর নিদ্রায় শুয়ে আছেন সাইফুদ্দীন। ভোর হলো। বৃদ্ধ উঁকি দিয়ে তাকান। সাইফুদ্দীন এখনো শুয়ে আছেন। সূর্যটা বেশ উপরে উঠে আসার পর তার চোখ খোলে। হারিছের বোন ও স্ত্রী তার সম্মুখে নাস্তা এনে হাজির করে। তিনি হারিছের বোনের প্রতি কিছুক্ষণ অপলক চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন- তোমরা আমাদের যে সেবা করেছে, আমরা তার এমন প্রতিদান দেবো, যা তোমরা কল্পনাও করোনি। আমরা তোমাদেরকে অট্টালিকায় রাখবো।
