তাদের কথাবার্তা থেকে কি আপনি এই বুঝেছেন যে, মসুলের ফৌজকে একত্রিত করে তিনি এখনই পুনরায় যুদ্ধ করতে চান? দাউদ জিজ্ঞেস করে।
লোকটা এখানে এতোই সন্ত্রস্ত যে, আমাকে বলছিলেন, কেউ যেনে টের না পায়, আমি এখানে আছি- বৃদ্ধ জবাব দেন- আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে লড়াই করার ইচ্ছা তার অবশ্যই আছে। কমান্ডারকে তিনি মসুলের স্থলে অন্য একদিকে প্রেরণ করেছেন।
আমি তাকে খুন করে ফেলবো- হারিছ বললো- লোকটা মুসলমানকে মুসলমানের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত করেছে। তারই চক্রান্তে এক আল্লাহু আকবার ধ্বনি দানকারী অপর আল্লাহু আকবার ধ্বনি দানকারীর রক্ত ঝরিয়েছেন। লোকটা আমাকে পাগল বানিয়েছে।
হারিছ ক্ষোভে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। দেয়ালের সঙ্গে তার পিতার তরবারীটা ঝুলছিলো। ঝট করে সেটা হাতে নিয়ে নেয়।
পেছন থেকে বৃদ্ধ ছেলেকে ঝাঁপটে ধরে। দাউদ তার বাহু ধরে ফেলে। হারিছ আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বৃদ্ধ পিতা তাকে বললো- আগে আমার কথা শোেননা। তারপর যা খুশী করো। দাউদও তাকে থামিয়ে বললো, এ জাতীয় কাজ করার আগে ভেবে নিলে ভালো হয়। আমরা তাকে খুন করেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবো। কিন্তু তার আগে নিজেরা যুক্তি-পরামর্শ করে পরিকল্পনা ঠিক করে নিতে হবে।
পিতা ও বন্ধু দাউদের কথায় হারিছ আপাতত নিবৃত্ত হয়েছে বটে; কিন্তু তার তর্জন থামেনি। ক্ষোভের আতিশয্যে তার চোখ দুটো রক্তজবার ন্যায় লাল হয়ে ওঠেছে।
তাকে হত্যা করা কঠিন কাজ নয়- বৃদ্ধ তার ক্ষুব্ধ পুত্রকে বসিয়ে বললেন তিনি গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন। এখন আমার এই শক্তিহীন বাহুও তাকে হত্যা করতে পারবে। তার লাশটাও লুকিয়ে ফেলা সম্ভব। কিন্তু তার যে দুজন সঙ্গী চলে গেছে, তারা আমাদেরকে ছেড়ে দেবে না। তারা সন্দেহভাজন হিসেবে আমাদেরকে গ্রেফতার করবে। তোমার যুবতী স্ত্রী ও তরুণী বোনের সঙ্গে অসদাচরণ করবে। আমরা যদি বলি, তিনি মসুল চলে গেছেন, তারা। বিশ্বাস করবে না। কারণ, তিনি তাদেরকে এখানে আসতে বলেছেন।
মনে হচ্ছে, আপনি সাইফুদ্দীনকে সত্য বলে বিশ্বাস করছেন- হারিছ বললো আপনি মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানের লড়াইকে বৈধ মনে করছেন।
এখানে এসে ওঠার পর আমি তাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি, আমি তাকে সত্য বলে বিশ্বাস করি না- বৃদ্ধ বললেন- নিজের ঘরে তাকে হত্যা না করার এও একটি কারণ। তিনি আমাকে বলেছেন, তোমাকে সালাহুদ্দীন আইউবীর সমর্থক বলে মনে হচ্ছে। তিনি আমাকে এই প্রলোভনও দিয়েছেন যে, তোমার পুত্র যদি যুদ্ধে নিহত হয়, বিনিময়ে আমাকে প্রচুর অর্থ দান করবেন। আমি তাকে বলেছি, আমি পুত্রের শাহাদাত কামনা করি- অন্যায় পথে মৃত্যু কিংবা অর্থ নয়। সাইফুদ্দীন আমার মনোভাব বুঝে ফেলেছেন। এখন যদি আমরা তাকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলি, তবু তার নায়েব এসে নির্দ্বিধায় আমাকে ধরে ফেলবে এবং বলবে, তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর সমর্থক বলে মসুলের শাসনকর্তাকে হত্যা করেছে।
দাউদ ভাই!- হারিছ দাউদকে উদ্দেশ করে বললো- তুমিই বলে দাও, আমি কী করবো। তুমি আমার আবেগময় অবস্থাটা দেখেছো। তুমি বলেছিলে, আল্লাহ আমাকে আমার গুনাহের কাফফারা আদায় করার জন্য বাঁচিয়ে রেখেছেন। সেই শাসনকর্তাকে খুন করা, যিনি হাজার হাজার মুসলমানকে মুসলমানদের হাতে খুন করিয়েছেন। আমি তোমাকে বুদ্ধিমান লোক মনে করি। ভেবে-চিন্তে তুমি আমাকে সঠিক পরামর্শ দাও।
এই একজন মানুষকে হত্যা করলে কিছু অর্জিত হবে না- দাউদ বললো তার সাঙ্গপাঙ্গরা আছে, তারা হাবেও আছে, হাররানেও আছে। তাদের অনেক সালার আছে। আছে তাদের তিন-তিনটি ফৌজ। কাজেই সাইফুদ্দীন খুন হলেই তারা সালাহুদ্দীন আইউবীর সম্মুখে অস্ত্র সমর্পণ করবে না। অস্ত্র সমর্পণ করার জন্য পন্থাও আছে। তা হলো, এদেরকে যুদ্ধের ময়দানে এমনভাবে অসহায় করে ফেলতে হবে, যেননা তারা অস্ত্র সমর্পণ করতে এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর শর্ত সম্পূর্ণ মেনে নিতে বাধ্য হয়।
এ কাজটা সালাহুদ্দীন আইউবী ছাড়া আর কে করতে পারেন- হারিছ বললো- আমার হৃদয়ে যে আগুন জ্বলে উঠেছে, তা কিভাবে নিভবে ইসলামের তিনজন মুজাহিদের রক্তের প্রায়শ্চিত্ত্ব আমি কীভাবে আদায় করবো
মসুলের শাসনকর্তাকে এখানে পেয়ে গেছে বলে দাউদ বেজায় খুশি। হারিছ ও তার পিতাকে নিজের গোয়েন্দা পরিচয়টা দিতে ইতস্তত করছে সে। আবেগতাড়িত হয়ে গোয়েন্দারা নিজের পরিচয় ফাস করে না। কিন্তু এ মুহূর্তে পরিচয় গোপন রেখে তার কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। তার সিদ্ধান্ত, সাইফুদ্দীন যেখানে যাবে, সে তার পিছু নেবে এবং তার তৎপরতা ও গতিবি পর্যবেক্ষণ করবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত হারিছের ঘরে অবস্থান করাও সব মনে হচ্ছে না। তার পিতা-পুত্রের সাহায্যের প্রয়োজন। তাই পরিকল্পনা ঠিক করে সে মোতাবেক কথাবার্তা বলতে শুরু করে দাউদ।
আচ্ছা, আমি যদি আপনাকে এমন একটা পন্থা বলে দেই, যার ফ সাইফুদ্দীন ভবিষ্যতে উঠে দাঁড়াবার শক্তি হারিয়ে ফেলবে, তাহলে কি আপনি আমার সঙ্গ দেবেন? দাউদ হারিহের পিতাকে জিজ্ঞেস করে।
তুমি যদি আমার পুত্রের ন্যায় আবেগজড়িত হয়ে না ভাবো, তাহলে কি তোমার সঙ্গে আছি। হারিছের পিতা বললেন।
