আজ তিন-চার দিন যাবত আমি দিগ্বিদিগ ঘুরে ফিরছি। রাতে ঘুমাতে পারি না। দিনে কোথাও শান্তি পাই না। বহু কষ্টে দুচোখের পাতা বন্ধ করলেই সুলতান আইউবীর সেই তিন সৈনিককে দেখতে পাই, যারা আমার তরবারীর আঘাতে নিহত হয়েছিলো। দিনের বেলা মনে হয় এই বিজন এলাকায় তারা। আমার চারপার্শ্বে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে অশ্বারোহী আমাকে টিলার অভ্যন্তরে লুকায়িত অবস্থায় দেখেছিলো, সে যদি আমাকে হত্যা করে ফেলতো, তাহলে ভালো হতো। লোকটা প্রাণভিক্ষা দিয়ে আমার উপর বড় জুলুম করেছে। সঙ্গে তরবারী থাকলে আমি নিজেই নিজেকে খুন করে ফেলতাম। আমি আমার রাসূলের তিনজন মুজাহিদকে হত্যা করেছি।
তুমি বেঁচে থাকবে- দাউদ বললো- আল্লাহর মর্জিতে তুমি মরবে না। যুদ্ধের ময়দান থেকে তুমি জীবিত বেরিয়ে এসেছে। তোমার সঙ্গে আত্মহত্যা করার কোন অস্ত্র নেই। এতেই প্রমাণিত হয় আল্লাহ তোমার দ্বারা ভালো কোন কাজ নেয়ার জন্য তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আল্লাহ তোমাকে পাপের কাফফারা আদায় করার সুযোগ দিয়েছেন।
তুমি বলো, সালাহুদ্দীন আইউবী সম্পর্কে আমাকে যেসব মন্দ কথা শোনানো হয়েছিলো, সেসব সত্য না মিথ্যা? সিপাহী জিজ্ঞাসা করলো।
সম্পূর্ণ মিথ্যা- দাউদ জবাব দেয়- সালাহুদ্দীন আইউবী খৃস্টানদের বিতাড়িত করে এই ভূখণ্ডে আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন আর সাইফুদ্দীন ও তার দোসররা নিজ নিজ রাজত্ব ধরে রাখার জন্য যুদ্ধ করছে। তারা খৃস্টানদের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে নিয়েছে এবং তাদের মদদে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে।
সালাহুদ্দীন আইউবী কেমন মানুষ এবং কী তার রক্ষ্য, দাউদ বিস্তারিতভাবে সিপাহীকে অবহিত করে। সে মসুলের শাসক সাইফুদ্দীন সম্পর্কে সিপাহীকে জানালো, লোকটা এতো বিলাসী যে, যুদ্ধের ময়দানে পর্যন্ত তিনি বিলাস সামগ্রী নিয়ে এসেছিলেন।
বলো, আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর সেই তিন মুজাহিদের রক্তের মূল্য কিভাবে পরিশোধ করবো?- সিপাহী দাউদকে জিজ্ঞেস করে- হৃদয় থেকে এই বোঝা সরাতে না পারলে আমি শান্তি পাবো না। আমি শান্তিতে মরতে পারবো না। তুমি সম্মতি দিলে আমি মসুলের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীনকে হত্যা করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত আদায় করবো।
এতো বড় ঝুঁকি নেয়ার প্রয়োজন নেই- দাউদ বললো- তুমি বললে আমি তোমার সঙ্গী হয়ে যাবো।
তুমি কে? সিপাহী জিজ্ঞেস করে- তোমার নাম কী? কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাচ্ছে, কিছুই তো জানা হয়নি।
আমার নাম হারিছ। আমার গন্তব্য মসুল- দাউদ অসত্য বললো সেখানেই আমার বাড়ি। যুদ্ধের কারণে অন্য পথে যাচ্ছি। তোমার বাড়িটা যদি পথে পড়ে, তাহলে সেখানে বেড়াবো।
আমার গ্রাম বেশী দূরে নয়- সিপাহী বললো- জোর করে হলেও আমি তোমাকে আমার বাড়ি নিয়ে যাবো। তুমি আমার বিক্ষত আত্মাকে শান্তি দিয়েছে। এমন ভালো কথা আমি কখনো শুনিনি। আমি বাড়িতেই চলে যাবো। আর কখনো মসুলের ফৌজে যোগ দেব না। আমি আশা করি, তুমি আমাকে মুক্তির পথ দেখাতে পারবে।
***
বৃদ্ধের কুঁড়ে ঘরের মেঝেতে গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছে মসুলের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীন। একটানা কয়েক রাত জাগ্রত থাকার পর তিনি এখন এতো গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছেন যে, গৃহের বাইরের দরজার করাঘাতেও তার চোখ খোলেনি। রাতের অর্ধেকটা কেটে গেছে। বৃদ্ধ গৃহকর্তার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। তার কন্যা এবং পুত্রবধূও জেগে ওঠেছে। বৃদ্ধ বিরক্ত কণ্ঠে বললেন- মনে হচ্ছে, সালাহুদ্দীন আইউবীর তাড়া খেয়ে মসুলের আরো কোনো কমান্ডার কিংবা সিপাহী এসেছে। রাস্তার পাশে বাড়ি না হওয়াই ভালো।
বৃদ্ধ দরজা খুললেন। বাইরে দুটি ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। আরোহীগণ আগেই নেমে গেছে। হারিছ সালাম দিয়ে এগিয়ে গেলে বৃদ্ধ তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন- বাবা! আমি এই জন্য আনন্দিত যে, তুমি হারাম মৃত্যু থেকে বেঁচে এসেছো। অন্যথায় আমাকে জীবনভর শুনতে হতো, তোমার পুত্র ইসলামী ফৌজের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলো। বৃদ্ধ পুত্রের সঙ্গী দাউদের সঙ্গে মুসাফাহা করে কুশল জিজ্ঞাসা করেন।
দাউদ কথা বলতে উদ্যত হলে বৃদ্ধ ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে তাকে থামিয়ে দেন। পরে তার কানের কাছে গিয়ে বললেন- তোমাদের রাজা ও প্রধান সেনাপতি সাইফুদ্দীন ঘরে ঘুমিয়ে আছেন। তোমরা ঘোড়াগুলোকে একদিকে নিয়ে বেঁধে রেখে ভেতরে চলে এসো। কোনো শব্দ হয় না যেন।
সাইফুদ্দীন?- হারিছ বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে তিনি এখানে কীভাবে আসলেন?
পরাজয়বরণ করে- বৃদ্ধ ফিসফিস করে বললেন- তোমরা ভেতরে চলো।
ঘোড়াগুলোকে এদিকে সরিয়ে নিয়ে আড়ালে বেঁধে রাখা হলো। বৃদ্ধ দাউদ ও হারিছকে ভেতরে নিয়ে যান। হারিছ-ই তার সেই পুত্র, যার কথা তিনি সাইফুদ্দীনকে বলেছিলেন। হারিছ পিতার নিকট দাউদকে পরিচয় করিয়ে দেয়- এর নাম দাউদ। এমন অন্তরঙ্গ বন্ধু দ্বিতীয়জন হতে পারে না।
তোমরাও কি পালিয়ে এসেছো? বৃদ্ধ দাউদকে জিজ্ঞেস করেন।
আমি সৈনিক নই- দাউদ জবাব দেয়- আমি মসুল যাচ্ছি। যুদ্ধ আমাকে আমার পথ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। পথে হারিছকে পেয়ে তার সঙ্গ নিলাম।
বলুন, মসুলের শাসনকর্তা আমাদের ঘরে কীভাবে আসলেন? হারিছ পিতাকে জিজ্ঞেস করে।
আজ রাতে এসেছে- বৃদ্ধ জবাব দেয়। তার সঙ্গে এক নায়েবু সালার ও একজন কমান্ডার ছিলো। তাদেরকে কোথায় যেন পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমার কানে যে শব্দগুলো এসেছে, তাহলো, বাহিনীকে একত্রিত করো, তারপর আমাকে জানাও, আমি মসুল আসবো নাকি কিছুদিন লুকিয়ে থাকবো। আমি সেসময় কক্ষের দরজার পার্শ্বে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
