আমার দেহে কোন জখম নেই- সিপাহী জবাব দেয় এবং নিজের বুকের উপর হাত রেখে বললো- তবে হৃদয়টা আমার ক্ষত-বিক্ষত।
আগন্তুক অশ্বারোহী সুলতান আইউবীর সেই গোয়েন্দাদের একজন, যাদেরকে দুশমনের পিছপা হওয়ার সুযোগে শক্ত এলাকায় প্রেরণ করা হয়েছিলো। লোকটার নাম দাউদ। প্রশিক্ষণ অনুযায়ী সে সৈনিককে গভীরভাবে নীরিক্ষা করতে শুরু করে। বিচক্ষণ গোয়েন্দা বুঝে ফেলে, এই সৈনিক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং এটা পরাজয়ভীতির প্রতিক্রিয়া। সে সিপাহীর সঙ্গে এমন সব কথা বলে যে, সিপাহী হৃদয়ের সব বাস্তব কথা খুলে বলতে শুরু করে।
সৈনিকগিরি আমার বংশের পেশা- সিপাহী বললো- আমার পিতা সৈনিক ছিলেন। দাদাও সৈনিক ছিলেন। এই পেশা আমার উপার্জনের মাধ্যম এবং আত্মার খোরাক। আমি আল্লাহর সৈনিক। আমি নিজ ধর্ম ও জাতির জন্য লড়াই করি। আমি জানতাম, খৃস্টানরা আমাদের ধর্মের ঘৃণ্যতম শত্রু। আমি এও জানি যে, আমাদের প্রথম কেবলা খৃস্টানদের কজায়। আমার পিতা আমাকে বন্ধুত্ব ও শত্রুতার ইতিহাস শুনিয়েছেন। আমি ইসলামী চেতনা নিয়ে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতে শুনতে শুরু করলাম, সুলতান আইউবী ইসলামের শত্রু, খৃস্টানদের বন্ধু এবং পাপিষ্টমানুষ। অথচ তার আগে আমরা শুনতাম, সুলতান সালাহুদ্দীন: আইউবী খৃস্টানদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, খৃস্টানরা তাকে ভয় করে এবং তিনি প্রথম কেবলা বাইতুল মোকাদ্দাসকে খৃস্টানদের কবল থেকে উদ্ধার করার জন্য যুদ্ধ করছেন।, আমি আমাদের রাজ্যের শাসক সাইফুদ্দীন গাজীকে সত্য ভেবে আসছিলাম। একদিন আমাদের ফৌজ অভিযানে রওনা হওয়ার নির্দেশ লাভ করে। আমরা এখানে আসলাম। যুদ্ধ হলো। যুদ্ধ চলাকালে জানতে পারলাম, আমরা মুসলমান ফৌজের বিরুদ্ধে লড়াই করছি এবং আমাদের প্রতিপক্ষ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ। সে ফৌজের সৈনিকরা আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়ে বলছিলো- তোমরা মুসলমান! তোমরা সত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করো না। তোমাদের শত্রু আমরা নই। শত্রু তোমাদের খৃস্টানরা। তোমরা পক্ষ ত্যাগ করে আমাদের সঙ্গে চলে আসো। প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করো। তোমরা বিলাসী শাসকগোষ্টির জন্য যুদ্ধ করো না।
আমি সেই ফৌজের সৈনিকদের হাতে কালেমা খচিত পতাকা দেখেছি। আমি সেই সৈনিকদের যেভাবে যুদ্ধ করতে দেখেছি, তাতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন- অগ্নিশিখা কোথা থেকে উত্থিত হচ্ছিলো, আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
মৃত্যুর নয়- আল্লাহর ভয়ে আমি এমনভাবে আড়ষ্ট হয়ে গেলাম যে, আমার বাহুদ্বয় শক্তিহীন হয়ে পড়লো। আমি তরবারীর ওজনটাও বহন করতে পারছিলাম না। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেললাম। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কয়েকটি টিলা দেখতে পেলাম। আমি ঘোড়াসহ টিলাগুলোর অভ্যন্তরে ঢুকে লুকিয়ে গেলাম। আমি কাপুরুষ নই। কিন্তু তখন আমার সমস্ত শরীর কাঁপছিলো। বাইরে দুপক্ষের তরবারীর সংঘাত চলছিলো। ঘোড়ার ডাক- চিৎকার শোনা যাচ্ছিলো। আমি আহ্বান শুনতে পাচ্ছিলাম- রমযান মাসে নিজ ভাইদের বিরুদ্ধে লড়াই করো না। আমার মনে পড়ে গেলো, আমাদেরকে বলা হয়েছিলো, যুদ্ধের সময় রোযা রাখতে হয় না। আমরা রোযাদার ছিলাম না। আমি বুঝতে পারলাম, সালাহুদ্দীন আইউবীর সৈনিকরা রোযাদার। ততক্ষণে আমি তাদের তিনজন সৈনিককে হত্যা করে ফেলেছি। তাদের রক্ত আমার তরবারীতে জমাট হয়ে আছে। সৈনিকরা নিজ তরবারীতে রক্ত দেখে আনন্দিত হয়ে থাকে। কিন্তু আমি আমার তরবারীর প্রতি তাকাতে ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ, আমার তরবারীতে আমার ভাইয়ের খুন লেগে আছে।
আমার মধ্যে ওখান থেকে বের হওয়ার ও যুদ্ধ করার সাহস ছিলো না। আমি সেখানেই জড়সড় হয়ে লুকিয়ে থাকি। সালাহুদ্দীন আইউবীর এক অশ্বারোহী সৈনিক আমাকে দেখে ফেলে। সে আমাকে বেরিয়ে আসার জন্য হাঁক দেয়। সে আমার প্রতি বর্শা তাক করে। আমি রক্তমাখা তরবারীটা ঘোড়ার পায়ের উপর ফেলে দিয়ে বললাম- আমি তোমাদের মুসলমান ভাই। আমি যুদ্ধ করবো না। ঘোরতর যুদ্ধটা সেখান থেকে খানিক দূরে চলছিলো। এই আরোহী সম্ভবত কমান্ডোসেনা ছিলো এবং লুকিয়ে থাকা শত্রুসেনাদের সন্ধান করছিলো। সে এগিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো- সত্যিই কি তুমি বুঝতে পেরেছো, তুমি প্রকৃত মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াই করছো? আমি আমার অপরাধ স্বীকার করে বললাম- এই অপরাধ আমাকে দিয়ে করানো হয়েছে। সে আমার বর্শাটা নিয়ে নেয়। তরবারী আগেই ফেলে দিয়েছিলাম। সে একদিকে ইঙ্গিত করে বললো আল্লাহর নিকট সাপের ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং ওদিকে পালিয়ে যাও। পেছন দিকে তাকাবে না। আমি তোমাকে জীবন দান করলাম।
আমার বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় কান্না এসে পড়েছিলো। যুদ্ধের ময়দানে দুশমন জীবন দান করে না। আমি ঘোড়া হাঁকাই এবং তিনি যে পথ দেখিয়েছিলেন, সে পথে ছুটে চলি। পথটা নিরাপদ ছিলো। আমি রণাঙ্গন থেকে অনেক অনেক দূরে চলে আসি। রাতে এক স্থানে অবতরণ করে শুয়ে পড়ি। যে তিন সেনাকে হত্যা করেছিলাম, তাদের স্বপ্নে দেখি। তাদের শরীর থেকে রক্ত ঝরছিলো। তারা আমার চার পার্শ্বে ঘোরাফেরা করতে থাকে। তাদের সঙ্গে অস্ত্র ছিলো না। তারা আমার সঙ্গে কোনো কথা বলেনি। ভয়ে আমার গা ছমছম করে ওঠে। আমার জীবনটা বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আমি শিশুর ন্যায় চিৎকার করতে শুরু করলাম। তারপরই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। প্রচণ্ড শীতের রাতে আমার দেহ থেকে ঘাম ঝরতে শুরু করে। আমি ভয়ে মরে যাচ্ছিলাম। কম্পিত দেহে উঠে ওজু করে নামায পড়তে শুরু করলাম। আমার দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করে।
