ঠিক এ সময়ই সুলতান আইউবীর নিকট আল-মালিকুস সালিহর উক্ত পয়গামটি এসে পৌঁছায়। সুলতান শর্ত সাপেক্ষে সন্ধি প্রস্তাব মেনে নেন। তাতে তিনি নিশ্চিত হন যে, তাঁর দুশমন অস্ত্র সমর্পণ করেছে। তিনি উদারতা প্রদর্শন করে বন্দি সেনাদেরকে সংক্ষিপ্ত উপদেশ দিয়ে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। কেননা, তাঁর মতে তাঁর মুসলিম ভাইয়েরা তার শত্রু নয়। আল-মালিকুস সালিহর সন্ধিপত্রে সীল-স্বাক্ষর করার সময়ও সুলতান আইউবী কঠিন কোনো শর্ত আরোপ করেননি। তিনি তার মুসলিম ভাইদেরকে বুঝাতে চাচ্ছিলেন, তোমাদের শত্রু আমি নই- খৃস্টানরা।
কিন্তু উক্ত বার্তাটি তাকে যে স্বস্তি দান করেছিলো, তা দু-তিন দিনের বেশী স্থায়ী হয়নি। আল-মালিকুস সালিহর অপর এক বার্তা তাকে পুনরায় পেরেশান করে তোলে। তাঁর নামে আসা পত্রখানি খুলে দেখতে পান, সেটি তাঁকে নয়- সাইফুদ্দীন গাজীকে লেখা। দূত ভুলবশত সেটি সুলতান আইউবীর নিকট নিয়ে আসে। পত্রটি প্রমাণ করে, সাইফুদ্দীন আল-মালিকুস সালিহকে লিখেছিলেন, আপনি আইউবীর সঙ্গে সন্ধি করে ভুল করেছেন এবং তা জোটের অংশীদার শক্তির সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তার জবাবে আল-মালিকুস সালিহ লিখেছেন, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে সন্ধির নামে ধোকা দিয়েছি, যাতে তিনি অপ্রস্তুত অবস্থায় পুনরায় আমাদের উপর আক্রমণ না করে বসেন। আমি জানি, সালাহুদ্দীন আইউবীর দৃষ্টি হাবের উপর। তার বাহিনীও এখনই আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। আমি কালক্ষেপণের জন্য সন্ধির ফাঁদ পেতেছি। আপনারা নিজ নিজ বাহিনীকে সংগঠিত করে ফেলুন। খৃস্টান উপদেষ্টাগণ আমার বাহিনীকে সংগঠিত ও প্রস্তুত করছে। আপনি আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, আমরা এখনই যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত নই।
আল-মালিকুস সালিহ নুরুদ্দীন জঙ্গীর পুত্র। তার বয়স মাত্র তের বছর। নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর পর প্রশাসন ও ফৌজের স্বার্থপর পদস্থ কর্মকর্তাগণ আল-মালিকুস সালিহকে নুরুদ্দীন জঙ্গীর স্থলাভিষিক্ত করে তাকে সুলতান অভিধায় ভূষিত করে। তারপর তাকে তাদের ক্রীড়নকে পরিণত করে। সালতানাতে ইসলামিয়া ভেঙ্গে খান খান হতে শুরু করে। সুলতান আইউবী মিশর থেকে দামেস্ক চলে গেছেন। আল-মালিকুস সালিহ ও তার সাঙ্গরা দামেস্ক শহরটিকে দারুস সালতানাত ঘোষণা করে। সাঙ্গপাঙ্গরা আল-মালিকুস। সালিহকে ব্যবহার করে চলে। তারা তাদের খৃস্টান উপদেষ্টাদের পরামর্শেই সুলতান আইউবীকে সন্ধির ধোঁকা দিয়েছিলো। কিন্তু বার্তাটি সাইফুদ্দীনের পরিবর্তে সুলতান আইউবীর হাতে এসে পড়ে। এটি সে যুগের ইতিহাসের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। কোনো কোনো ঐতিহাসিক লিখেছেন, দূত ভুলবশত বার্তাটি সুলতান আইউবীর নিকট নিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু মুসলিম ঐতিহাসিকগণ- সিরাজুদ্দীন যাদের অন্যতম- দৃঢ়তার সঙ্গে লিখেছেন, এই দূত সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা ছিলো।
বার্তাটি সুলতান আইউবীকে পেরেশান করে তোলে। কিন্তু আবেগতাড়িত হয়ে তিনি তৎক্ষণাৎ রওনা ও হামলা করার নির্দেশ দেননি। দুশমনের ন্যায় তাঁকে তাঁর ফৌজকে সুসংগঠিত করার প্রয়োজন ছিলো। তার দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুতপূর্ণ বিষয় হলো, শত্রুবাহিনীর অবস্থান তাদের মূল ঠিকানার কাছে। আর তিনি তার ঠিকানা থেকে অনেক দূরে। তাঁর রসদ সরবরাহের পথ অনেক দীর্ঘ ও অনিরাপদ। তাছাড়া তিনি এলোপাতাড়ি অগ্রযাত্রার পক্ষপাতী নন। গোয়েন্দাদের নির্ভরযোগ্য রিপোর্ট ছাড়া তিনি সম্মুখে অগ্রসর হন না। তদস্থলে তিনি দুশমনকে সম্মুখে এগিয়ে আসবার সুযোগ দিয়ে থাকেন। তাই তিনি হাসান ইবনে আব্দুল্লাহকে বললেন, তুমি আরো কিছু গোয়েন্দা দুমশনের এলাকায় পাঠিয়ে দাও। তারা অতি দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে আসুক। এসব ছাড়াও তিনি আরো কিছু আবশ্যকীয় ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। তিনি তার কেন্দ্রীয় কমান্ডকে জানিয়ে দিলেন, তিনি হামলা করবেন না। বরং তিনি দুশমনের আক্রমণ করার সুযোগ দেবেন, যাতে তারা তাদের আস্তানা থেকে বেরিয়ে দূরে চলে আসে। এসব নির্দেশনার পর তিনি নীরিক্ষা করতে শুরু করেন, দুশমনকে কোন্ স্থানে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা যায়।
***
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে মসুলের দিকে যাচ্ছিলো সৈনিকটি। সে সাইফুদ্দীন গাজীর ফৌজের সৈনিক। এই বাহিনীর অধিকাংশ সৈনিক একত্রে পিছপা হয়েছিলো। ক্ষুদ্র দলের সৈনিকরা বিক্ষিপ্ত হয়ে একা একা পলায়ন করছিলো। এই সৈনিকও একাকী পলায়নকারীদের একজন। লোকটি অতিশয় পেরেশান। সে একস্থানে ঘোড়া থামিয়ে নামায পড়ে। তারপর দুআ করতে করতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। শেষ পর্যন্ত দুই হাঁটুর মাঝে মাথা গুজিয়ে বসে থাকে। এভাবে কিছু সময় কেটে যায়। হঠাৎ এক অশ্বারোহী তার সন্নিকটে এসে দাঁড়িয়ে যায়। সৈনিক কল্পনার জগতে এভোই বিভোর যে, একটি ধাবমান ঘোড়ার ক্ষুরধ্বনি তাকে সজাগ করতে পারেনি। আরোহী ঘোড়া থেকে অবতরণ করে ধীর পায়ে আরো এগিয়ে এসে সিপাহীর মাথায় হাত রাখে। এবার সৈনিক চকিত হয়ে মাথা তুলে উপর দিকে তাকায়।
আমি জানি, তুমি রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে এসেছে- আরোহী তার পাশে বসতে বসতে বললো- কিন্তু তুমি এভাবে বসে আছো কেন? আহত হলে বলল, আমি তোমাকে সাহায্য করবো।
