আল-মালিকুস সালিহ যখন তার দলবলসহ দামেস্ক থেকে পলায়ন করেছিলেন, তখনও বিপুলসংখ্যক গোয়েন্দা ফৌজ ও পলায়নপর মাগরিকদের সঙ্গে চলে গিয়েছিলো। এভাবে সুলতান আইউবী অর্ধেক যুদ্ধ গোয়েন্দা ব্যবস্থার মাধ্যমেই জয় করে নিতেন। গুপ্তচরবৃত্তির জন্য যে লোকদের নির্বাচন করা হতো, তারা অস্বাভাবিক বিচক্ষণ, স্থির ও শান্ত মেজাজের অধিকারী হতো। তারা হতোউপস্থিত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গম ও আত্মবিশ্বাসী লড়াকু সৈনিক।
১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে যখন সুলতান আইউবী তাঁর মুসলমান শত্রুদের বাহিনীকে পরাস্ত করেন, তখন তাঁর ইন্টেলিজেন্স প্রধান হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ তাঁর সুপ্রশিক্ষিত গোয়েন্দাদেরকে দুশমনের ছত্রভঙ্গ বাহিনীতে লুকিয়ে দিয়ে হাল্ব, মসুল ও হারান গিয়ে দুশমনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা বিষয়ক তথ্যাদি সগ্রহ করার জন্য পাঠিয়ে দেন। তাদের কেউ ছিলো শত্রুসেনার পোশাকে, কেউ সাধারণ পল্লীবাসীর লেবাসে। তাদের এই যাওয়া ছিলো নেহায়েতই জরুরী। কেননা, দুশমন পুনঃ সংগঠিত হয়ে পাল্টা আক্রমণ করবে, এই আশংকা প্রতি মুহূর্তেই বিরাজমান। সুলতান আইউবী দুশমনের যে পরিমাণ ক্ষতিসাধন করেছিলেন, তাতে তাঁর ধারণা ছিলো, পুনর্গঠনে দুশমনের বেশ সময় লেগে যাবে।
দুশমনের বাহিনী তিনটি। প্রতি বাহিনীর আকাংখা ছিলো, সুলতান আইউবীকে পরাজিত করে সে সালতানাতে ইসলামিয়ার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ও রাজা হয়ে যাবে। তারা পরস্পর বৈরি ভাবাপন্নও ছিলো। কিন্তু এই মুহূর্তে তারা প্রত্যেকে সুলতান আইউবীকে সকলের শত্রু বিবেচনা করছে। সে কারণে তারা পুনর্গঠিত হয়ে তিনটি বাহিনীকে এক বাহিনীর রূপ দিয়ে পাল্টা আক্রমণ করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
সুলতান আইউবী জানতেন, বিলাস-পাগল মানুষ যুদ্ধের ময়দানে টিকতে পারে না। কিন্তু পাশাপাশি তাঁর এও জানা ছিলো যে, তার শত্রুরা ক্রুসেডারদের সাহায্য-সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় কাজ করছে এবং তাদের কাছে খৃস্টান উপদেষ্টাও রয়েছে। তাছাড়া মুসলিম সালারদের মধ্যে দু-তিনজন এমন ছিলেন, যারা নেতৃত্বের যোগ্যতা রাখতো। তন্মধ্যে মুজাফফর উদ্দিন ইবনে যাইনুদ্দীন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি সুলতান আইউবীর ফৌজের সালার ছিলেন। সেই সূত্রে সুলতান আইউবীর কলাকৌশল তার জানা ছিলো। খৃস্টান উপদেষ্টাবৃন্দ ও মুজাফফর উদ্দীনের ন্যায় সালারগণ সুলতান আইউবীকে অত্যন্ত চৌকান্না করে দিয়েছিলো।
সুলতান আইউবীর ফৌজের অবস্থা সন্তোষজনক হলেও এই মুহূর্তে পুনরায় যুদ্ধ করার অবস্থা তাদের নেই। তারা দুশমনকে পরাজিত করেছিলো বটে; কিন্তু তার জন্য অল্পবিস্তর মূল্যও তাদের পরিশোধ করতে হয়েছিলো। এসব কারণে সুলতান আইউবীর মনে খানিকটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। তার একটি সমস্যা এই ছিলো যে, এখন তার কার্যক্রম মূল ঠিকানা থেকে অনেক দূরে। সঙ্গে রসদ আছে ঠিক; কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সংকটও দেখা দিতে পারে। সুলতান পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো থেকে সেনাভর্তি শুরু করে দিয়েছিলেন। মানুষ। সোসাহে ভর্তি হচ্ছিলো। তাদের অধিকাংশ লোক তরবারী চালনী, তীরন্দাজী ও অশ্বারোহনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। কিন্তু নিয়মিত সেনা হিসেবে যুদ্ধ করানোর জন্য তাদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিলো।
প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। পাশাপাশি সুলতান আইউবী অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন, যাতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো দখলে চলে আসে। কিছু কিছু অঞ্চলে প্রতিরোধ ছাড়াই তার হস্তগত হয়। তিনি এমন একস্থানে পৌঁছে যান, যেখানে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত সবুজ-শ্যামলিমা আর পানির প্রাচুর্য বিরাজমান। তাঁর ফৌজ ও পশুপাল পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলো। এখন তার হালে পানি এসে গেছে।
সুলতান আইউবী সেখানেই তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ প্রদান করেন। পর্যবেক্ষক ইউনিটগুলো বিভিন্ন উপযুক্ত স্থানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। গোয়েন্দারা চলে গেছে আগেই। সুলতান আইউবীর নির্দেশ ছাড়াই সব কাজ সম্পাদিত হয়ে যায়। ব্যবস্থাপনা তার এততাই সুশৃংখল যে, মিশন তার মেশিনের ন্যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এই যে স্থানটিতে সুলতান আইউবী অবস্থান গ্রহণ করছেন, সেটি তুকমান নামে খ্যাত। পুরো নাম হুবাবুত তুর্কমান বা তুর্কমানের কূপ।
ভর্তি আরো জোরদার করো- সুলতান আইউবী তাঁর কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রথম কনফারেন্সে বললেন- সামগ্রিকভাবে যুদ্ধ করার প্রশিক্ষণের তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দাও। আল্লাহ তোমাদের উপর করুণা করেছেন যে, তোমাদেরকে তিনি অতিশয় বোকা শত্রুর মুখোমুখি করেছেন। তাদের যদি ন্যূনতম বুঝ-বুদ্ধিটুকুও থাকতো, তাহলে তারা পিছপা হয়ে এখানে সমবেত হতো। যুদ্ধের পশু ও সৈনিকদের জন্য এ স্থানটি জান্নাত অপেক্ষা কম নয়। এখানে তোমাদের পশুগুলো এতে ঘাস খেতে পারবে যে, দশদিন পর্যন্ত আর খাওয়া ছাড়া লড়াই করতে পারবে। আমার বন্ধুগণ! শত্রুকে তুচ্ছ মনে করো না। বাহিনীকে বিশ্রামের সুযোগ দাও। কিন্তু সর্বদা প্রস্তুত অবস্থায় রাখতে হবে। ডাক্তারদের বলে দাও, যেনো তারা রাতে না ঘুমায়। আহতদের খুব দ্রুত সুস্থ করে তুলতে হবে এবং রুগ্নদের দিন-রাত তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। আর স্মরণ রেখো, আমাদের উদ্দেশ্য আপন ভাইদের হত্যা কিংবা তাদের ধিক্কার সমালোচনা করা নয়। আমাদের গন্তব্য ফিলিস্তিন। আমরা যদি নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধে ব্যস্ত থাকি, তাহলে খৃষ্টানরা তাদের লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়ে যাবে। দৃষ্টি ফিলিস্তিনের উপর নিবদ্ধ রাখো এবং পথের প্রতিটি বাঁধা পদদলিত করে এগিয়ে যাও।
