সালাহুদ্দীন আইউবী নামের মুসলমান- সাইফুদ্দীন বললেন- তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা জায়েযই নয়, ফরযও বটে।
জনাব!- নায়েব সালার বললেন- বিষয়টা আপনি বুঝবেন না। আমরা ভালোভাবেই জানি কে মুসলমান, আর কে কাফের।
বৎস!- বৃদ্ধ বললেন- বয়সে আপনারা আমার পুত্রের সমান। অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। আমার বয়স পঁচাত্তর বছর। আমার পিতা নব্বই বছর বয়সে মারা গেছেন। দাদা পঞ্চাশ বছর বয়সে যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হয়েছেন। দাদাজান আমার পিতাকে তার আমলের কাহিনী, শোনাতেন। পিতার নিকট থেকে আমি সেসব শুনেছি। এই সূত্রে আমি দাবি করতে পারি, আমি যতোটুকু জানি, আপনারা ততোটুকু জানেন না। রাজত্বের মোহ যাকেই পেয়েছে, যে ভাইয়ের সঙ্গে ভাইকে যুদ্ধে লিপ্ত করিয়েছে, সে-ই একদিন না একদিন কোনো না কোনো গরীবের ঝুপড়িতে গিয়ে আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছে। আপনাদের আগে যারা অতীত হয়েছে, তাদেরও এই একই পরিণতি ঘটেছিলো। আপনাদের তিন তিনটি বাহিনীকে সালাহুদ্দীন আইউবীর একটি মাত্র বাহিনী পরাজিত করেছে। আর তাও এমন শোচনীয়ভাবে যে, আমি তা দুদিন যাবত অবলোকন করছি। আপনাদের যদি দশটি বাহিনীও থাকতো, তবুও এভাবেই আপনাদের পালাতে হতো। যারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তারাই জয়লাভ করে। কখনো পরাজিত হলে তারা লেজ তুলে পালায় না। তাদের লাশ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তুলে নেয়া হয়; তারা আত্মগোপন করে না।
তোমাকে সালাহুদ্দীন আইউবীর সমর্থক মনে হচ্ছে- সাইফুদ্দীন কিছুটা ক্ষোভ মেশানো কণ্ঠে বললেন- তোমার উপর তো আমাদের আস্থা রাখা চলে না।
আমি আপনার সমর্থক- বৃদ্ধ বললেন- আমি ইসলামের সহযোগী। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছি যে, আপনি আপন ভাইদের শত্রুকে বন্ধু ভেবে বসেছেন। আপনি বুঝতে পারছেন না, তারা আপনার ধর্মের শত্রু। আপনার পরাজয়ের কারণ এটাই। আপনি নিশ্চিন্তে আমার উপর আস্থা রাখুন সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ যদি আকস্মিকভাবে এখানে এসে পড়ে, আমি আপনাকে লুকিয়ে– রাখবো, ধোকা দেখো না।
ইত্যাবসরে একটি সুন্দরী যুবতী মেয়ে খাবার নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। তার পেছনে তদপেক্ষা খানিক বেশি বয়সের আরেক যুবতী সাইফুদ্দীনের দৃষ্টি প্রথম মেয়েটির উপর নিবদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা খাবার রেখে চলে গেলে তিনি বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করেন- এরা কারা?
ছোটটা আমার কন্যা- বৃদ্ধ জবাব দেন- আর বড়টা পুত্রবধূ- আমার সেই ছেলের স্ত্রী, যে আপনার ফৌজে কাজ করছে। আমার মনে হচ্ছে, বউটা আমার বিধবা হয়ে গেছে।
আপনার পুত্র যদি মারা যায়, তাহলে আমি আপনাদের বিপুল অর্থ দান করবো- সাইফুদ্দীন বললেন- আর মেয়ের ব্যাপারে কোন চিন্তা করবেন না। এই মেয়ে কোনো সৈনিকের স্ত্রী হয়ে কোনো ঝুঁপড়িতে যাবে না। আমি তাঁকে আমার স্ত্রী হিসেবে পছন্দ করে ফেলেছি।
আমি না আমার পুত্রকে বিক্রি করেছি, না কন্যাকে বিক্রি করবো-বৃদ্ধ বললেন- কুঁড়েঘরে লালিত একটি মেয়েকে একজন সৈনিকের কুঁড়ে ঘরেই ভালো মানায়। আমি আপনাকে অনুরোধ করবো, আমাকে প্রলোভন দেখাবেন না। আপনি আমার মেহমান। আমাকে আতিথেয়তার দায়িত্ব পালন করতে দিন।
আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। আপনার উপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। আমি এই জন্য আনন্দিত যে, আমার রাজ্যে আপনার ন্যায় স্পষ্টবাদী ও নীতিবান লোক আছে। সাইফুদ্দীন বললেন।
বৃদ্ধ চলে যান। সাইফুদ্দীন তার সঙ্গীদের বললেন- এ ধরনের মানুষ ধোঁকা দেয় না। আচ্ছা, তোমরা কেউ মেয়েটাকে অলোভাবে দেখেছিলে?
চমৎকার এক মুক্তা। নায়েব সালার বললেন।
পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হোক, এই মুক্তা আমার হেরেমে যাবে। সাইফুদ্দীন ক্রুর হাসি হেসে বললেন। তারপর প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে নায়েব সালারকে উদ্দেশ করে বললেন- তোমরা মসুলের সংবাদ নাও। বাহিনীকে একাট্টা করো। সালাহুদ্দীন আইউবীর তৎপরতা ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করো এবং আমাকে তাড়াতাড়ি জানাও, আমি এখনই মসুল চলে আসবো, নাকি আরো অপেক্ষা করার প্রয়োজন আছে। তারপর কমান্ডারকে উদ্দেশ করে বললেন- আমি কোথায় আছি, হালববাসীকে জানিয়ে দাও। নিজে যাও কিংবা কাউকে পাঠাও।
নায়েব সালার ও কমান্ডার রওনা হয়ে যায়। সাইফুদ্দীন- যিনি মদমত্ত হয়ে রূপসী নারী নিয়ে প্রাসাদে ঘুমাতে অভ্যস্ত- বৃদ্ধের কুঁড়েঘরের এক কক্ষের মেঝেতে শুয়ে পড়েন।
***
তার একদিন আগের ঘটনা। এক সৈনিক রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে মসুল যাচ্ছিলো। লোকটি কখনো দ্রুতবেগে ঘোড়া হাঁকাচ্ছে, কখনো ধীরে ধীরে চলছে, আবার কখনো বা দাঁড়িয়ে থাকছে। মাঝে-মধ্যে ঘোড়া থামিয়ে সন্ত্রস্ত মনে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। সাধারণ রাস্তা ত্যাগ করে অন্য পথে চলছে সে। স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে, লোকটি ভীত-সন্ত্রস্ত এবং নিজের উপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই। এক স্থানে ঘোড়া থামিয়ে নেমে কেবলামুখী হয়ে লোকটি নামায পড়তে শুরু করে। নামায শেষে দুআর জন্য হাত তুলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। দুআ শেষে সেখান থেকে না ওঠে মাথানত করে বসে থাকে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর হাতে পরাজয়বরণ করে বাহিনীগুলো যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে পিছু হটে যায়, তখন সুলতান আইউবীর কয়েকজন গুপ্তচর তাদের সঙ্গে মিশে যায়। সুলতান আইউবীর ইন্টেলিজেন্স বিভাগের নিয়মই ছিলো, দুশমন যখন পিছপা হতো, তখন কিছু গুপ্তচর পলায়নপর সৈনিক কিংবা যুদ্ধকবলিত গ্রামগুলোর মুহাজিরদের বেশ ধারণ করে দুশমনের অঞ্চলে চলে যেতো এবং শত্রুপক্ষের পুনর্বিন্যাস, সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এসে তথ্য সরবরাহ করতো।
