১১৭৫ সালের এপ্রিল মাসের ঘটনা। আল-মালিকুস সালিহরই এক মিত্র সাইফুদ্দীন গাজী সুলতান আইউবীর হাতে পরাস্ত হয়ে জনৈক ব্যক্তির এক ঝুপড়িতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাঁর অপর এক মিত্র হলো গোমস্তগীন। সুলতান আইউবী এই তিন রাষ্ট্রনায়কের জোট বাহিনীকে এমন লজ্জাজনকভাবে পরাজিত করেন যে, তারা তাদের হেডকোয়ার্টারের সমুদয় মালামাল ফেলে পালিয়ে যায়। সুলতান আইউবীর সৈন্যরা তাদের যেসব সৈন্যকে বন্দী করেছিলো, মুসলমান মনে করে সুলতান তাদেরকে– ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এই উদারতার মাসুল সুলতানকে কড়ায়-গণ্ডায় শুনতে হয়েছে। এই বন্দীরা ফিরে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে পুনরায় সংগঠিত হয়ে যায়।
যুদ্ধের ময়দান থেকে আল-মালিকুস সালিহ, সাইফুদ্দীন গাজী ও মেস্তগীনের পলায়ন ছিলো একটি বিস্ময়কর ঘটনা। তাদের একজনের কাছে অপরজনের খবর ছিলো না। গোমস্তগীন ছিলো হাররানের দুর্গপতি, যা ছিলো বাগদাদের খেলাফতের অধীন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সে নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা দেয়। রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে সে হাররানের পরিবর্তে আল-মালিকুস সালিহর রাজধানী হাবে চলে গিয়েছিলো। সুলতান আইউবী ধাওয়া করে ধরে ফেলতে পারেন, এই ভয়ে সে নিজ এলাকা হাররান যাওয়ার সাহস পেলো না।
সাইফুদ্দীন অপর এক শহর মসুল ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের সম্রাট ছিলেন। শুধু ম্রাটই নন, তিনি একজন সেনা অধিনায়কও ছিলেন। রণাঙ্গনের কূটকৌশল সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন তিনি। ছিলেন লড়াকু সৈনিক। কিন্তু তিনি নিজের ঈমান বিক্রি করে ফেলেছিলেন, যা কিনা মুমিনের ঢাল-তরবারী। যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত তিনি হেরেমের বাছা বাছা মেয়ে ও নর্তকীদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। মদের মটকা ছাড়াও তার সঙ্গে থাকতো সুন্দর সুন্দর পাখি। এই সকল বিলাস সামগ্রী তিনি রণাঙ্গনে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে পলায়নকারীদের মধ্যে তার নায়েব সালার এবং একজন কমান্ডার ছিলো। যাবেন মসুল। কিন্তু সুলতান আইউবীর গেরিলারা দুশমনের পেছন থেকে ধাওয়া করছিলো। তারা দুশমনের ছত্রভঙ্গ সৈন্যের জন্য পিছু হটাও অসম্ভব করে তুলেছিলো।
সুলতান আইউবীর গেরিলারা সাইফুদ্দীন ও তার সঙ্গীদেরকে সম্ভবত দেখে ফেলেছিলো। তাদের থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই তারা মসুলের পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরেছিলো। অঞ্চলটা কোথাও বালুকাময়, কোথাও পার্বত্য, কোথাও সবুজ-শ্যামল। ফলে লুকাবার জায়গা বিস্তর।
সাইফুদ্দীন এখন মসুল থেকে সামান্য দূরে। গভীর রাত। চাঁদের আলোতে তিনি কয়েকটি ঘর দেখতে পান। তিনি প্রথম গৃহটির সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে দরজায় করাঘাত করেন। সাদা শশ্রুমণ্ডিত এক বৃদ্ধ বেরিয়ে আসেন। তার সম্মুখে তিনজন অশ্বারোহী দাঁড়িয়ে। লোকগুলো হাঁপাচ্ছে। বৃদ্ধ বললেন সম্ভবত তোমরাও মসুলের ফৌজের সৈনিক এবং পালিয়ে এসেছে। দুদিন যাবত আমি সৈনিকদের এই পথে যেতে দেখছি। তারা এখানে এসে পানি পান করার জন্য দাঁড়ায়। তারপর মসুল চলে যায়।
মসুল এখান থেকে কত দূরে? সাইফুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন।
তোমাদের ঘোড়ার দেহে যদি দম থাকে, তাহলে রাতের শেষ প্রহর নাগাদ পৌঁছে যাবে-বৃদ্ধ বললেন-এ গ্রামটা মসুলেরই অংশ।
আমরা কি রাতটা আপনার এখানে কাটাতে পারি জায়গা হবে? সাইফুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন।
অন্তর প্রশস্ত হলে জায়গার অভাব হয় না- বৃদ্ধ বললেন- ঘোড়া থেকে নেমে এসো, ভেতরে চলো।
***
তিন আগন্তুক একটি কক্ষে গিয়ে বসে। কক্ষে বাতি জ্বলছে। বৃদ্ধ তাদের পোশাক নিরিক্ষা করে দেখেন।
আমাদেরকে চেনার চেষ্টা করছেন? সাইফুদ্দীন মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করেন।
আমি দেখতে পাচ্ছি, তোমরা সিপাহী নও- বৃদ্ধ বললেন- তোমাদের পদমর্যাদা সালারের নীচে হবে না।
ইনি মসুলের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীন গাজী- নায়েব সালার বললেন আপনি যেনতেন লোককে আশ্রয় দেননি। আপনি এর পুরস্কার পাবেন। আমি নায়েব সালার আর ইনি কমান্ডার।
আমরা হয়তো আপনার গৃহে অনেকদিন থাকবো- সাইফুদ্দীন বললেন আমরা দিনের বেলা বাইরে বের হবে না, যাতে কেউ জানতে না পারে আমরা এখানে আছি। যদি কেউ জেনে ফেলে, তার শাস্তি আপনাকে ভোগ করতে হবে। পক্ষান্তরে যদি আপনি গোপনীয়তা রক্ষা করেন, তাহলে পুরস্কার পাবেন- যা চাইবেন তা-ই দেবো।
মসুলের শাসনকর্তাকে আমি আমার আশ্রিত ভাবতে পারি না- বৃদ্ধ বললেন- আপনি বিপদে পড়ে, পথ ভুলে গরীবালয়ে এসে পৌঁছেছেন। যতোদিন ইচ্ছা থাকবেন, আমি আপনার সাধ্যমতো সেবা করবো। আমার এক পুত্র আপনার ফৌজের সৈনিক। আপনাকে আমি অবহেলা করতে পারি না।
আমরা তাকে পদোন্নতি দেবো। নায়েব সালার বললেন।
আপনি যদি তাকে বাহিনী থেকে অব্যাহতি দান করেন, তবে আমার জন্য তা-ই হবে বড় পুরস্কার। বৃদ্ধ বললেন।
ঠিক আছে- সাইফুদ্দীন বললেন- আমরা আপনার পুত্রকে অব্যাহতি দিয়ে দেবো। সব পিতাই কামনা করে তার পুত্র বেঁচে থাকুক।
না- বৃদ্ধ বললেন- তার শুধু বেঁচে থাকা আমার কাম্য নয়। ফৌজে ভর্তি করিয়ে আমি তাকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করেছিলাম। আমিও সৈনিক ছিলাম। আমি যখন ফৌজে ভর্তি হই, আপনার তখন জন্ম হয়নি। আল্লাহ আপনার পিতা কুতুবুদ্দীনকে জান্নাত দান করুন। আমি তাঁর আমলে সৈনিক ছিলাম। আমরা কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। কিন্তু আমার ছেলেটাকে আপনি ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছেন। আমি তার শাহাদাঁতের পিয়াসী ছিলাম- অপমৃত্যুর নয়।
