আপনার পত্র পেয়েছি। আমি সালাহুদ্দীনের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছি বলে আপনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আপনি যা জেনেছেন, ঠিকই জেনেছেন। কারণ, তাছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিলো না। আমার ফৌজ তাঁর ফৌজের ঘেরাওয়ে পড়ে গিয়েছিলো। আমার সৈনিকরা ছিলো পরিশ্রান্ত, সন্ত্রস্ত ও আহত। এমতাবস্থায় আমার সালারগণ পরামর্শ দেয়, আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে প্রতারণামূলক সন্ধি করে ফেলুন এবং আপনার ফৌজকে এই বন-বাদার থেকে বের করে নিন। আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর এই শর্ত মেনে নিয়েছি যে, তার ফৌজ হা আগমন করলে আমার ফৌজ তাদের প্রতিরোধ করবে না। কিন্তু তিনি যখন আসবেন, তাঁকে অবশ্যই এমন প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে, যা তার কল্পনার অতীত। আপনি আপনার বাহিনীকে নতুনভাবে প্রস্তুত করে নিন। আমাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে এবং তার সকল শক্তি নিঃশেষ করে দিতে হবে।
পত্রে আরো অনেক কিছু লেখা ছিলো। ঐতিহাসিকগণ একমত যে, আল মালিকুস সালিহ সত্যিই সুলতান আইউবীকে ধোঁকা দিয়েছিলো এবং সে বিষয়ে সাইফুদ্দীনের পত্রের জবাবে যে বার্তা প্রেরণ করেছিলো, সেটি ভুলক্রমে সুলতান আইউবীর হাতে পৌঁছে ছিলো। দুজন ইতিহাসবিদ লিখেছেন, পত্ৰখানা খামে ভরে সীলমোহর করার পর ভুলে তার গায়ে সুলতান আইউবীর নাম লেখা হয়েছিলো। কয়েকজন মুসলিম ঐতিহাসিক যাদের মধ্যে সিরাজুদ্দীন অন্যতম। লিখছেন, সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা ব্যবস্থা এতোই শক্তিশালী ছিলো যে, আল-মালিকুস সালিহর দূত মূলত তাঁরই গোয়েন্দা ছিলো। ফলে সে আল-মালিকুস সালিহর এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি সুলতান আইউবীর হাতে পৌঁছিয়ে দেয়। কাজী বাহাউদ্দীন সাদ্দাদ তাঁর রোজনামচায় লিখেছেন- এই পত্রটি সুলতান আইউবীকে এতো বিচলিত করে তোলে যে, কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত তিনি কারো সঙ্গে কথা বলেননি। এসময় তিনি তাঁবুতে একাকী পড়ে ছিলেন। তাতে তিনি আনন্দিতও হয়েছেন যে, দুশমনের পরিকল্পনা তিনি জেনে ফেলেছেন। তিনি নির্দেশ দেন, আল-হামারা, দিয়ার ও বকর থেকে এক্ষুণি সেনাভর্তি শুরু করে দাও। সুলতান আইউবী তার মুসলিম ভাইদের বিরুদ্ধে আরেকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেন।
৫.৪ সত্য পথের পথিক
সত্য পথের পথিক
নুরুদ্দীন জঙ্গীর পুত্র আল-মালিকুস সালিহ, গোমস্তগীন ও সাইফুদ্দীন গাজী- এই তিন মুসলিম শাসক সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর মোকাবেলায় এসেছেন। ক্রুসেডাররা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। তারা তাদেরকে উট ঘোড়া, মটকা ভর্তি তরল দাহ্য পদার্থ ও অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছে। তারা সুলতান আইউবীকে যুদ্ধের ময়দানেই পরাজিত করা আবশ্যক মনে করে না। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য, যে কোন প্রকারে হোক আইউবীকে পরাভূত করা এবং আরব ভূখণ্ড কজা করে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা।
ফিলিস্তিন খৃস্টানদের দখলে। খৃস্টানরা মুসলমানদের তিনটি দুর্বলতা আঁচ করে নিয়েছে। তাহলো- ক্ষমতার মোহ, সম্পদের লোভ ও নারীর প্রতি আসক্তি। খৃস্টানরা ইউরোপ থেকে এই আশা নিয়ে এসেছিলো যে, তারা তাদের বিপুল সংখ্যক সৈন্য, অস্ত্র ও নৌ-শক্তির বিনিময়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে মুসলমানদের খতম করে প্রথম কেবলা বাইতুল মোকাদ্দাস ও খানায়ে কাবা দখল করে নিবে এবং পৃথিবীর বুক থেকে ইসলামের নাম-চিহ্ন মুছে ফেলবে।
ধর্ম এমন কোনো বৃক্ষ নয়, যাকে গোড়া থেকে কেটে দিলে তা শুকিয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে। ধর্ম একটি গ্রন্থ কিংবা কতগুলো গ্রন্থের স্থূপের নামও নয়, যাকে আগুনে ভষ্মিভূত করে দেয়া যায়। ধর্ম হলো বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির নাম, যা মানুষের মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে সংরক্ষিত থাকে এবং মানুষকে নিজের অনুগত করে রাখে। একজন মানুষকে খুন করে ফেললে বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির বিলুপ্তি ঘটে না। একটি ধর্মকে বিলুপ্ত করে দেয়ার উপায় হলো, মন-মস্তিষ্কে বিলাসিতা ও ক্ষমতার মোহ ঢুকিয়ে দেয়া। মানুষের চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির বাঁধন যতো ঢিল হয়, মানুষ তত স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। ইহুদী ও খৃস্টানরা মুসলমানদের জন্য এ জালই বিছিয়ে রেখেছে। আরব ভূখণ্ড ও মিশরে এই জাল বিছিয়ে দিয়ে মুসলিম শাসকদের তাতে আটকাতে শুরু করে। মিল্লাতে ইসলামিয়ার দুর্ভাগ্য যে, মুসলমানরা ক্ষমতা ও নারীর লোভে ঈমান বিসর্জন দিয়ে থাকে।
নুরুদ্দীন জঙ্গী ও সালাহুদ্দীন আইউবীর আমলে এই মধুমাখা বিষ মুসলিম, শাসক ও আমীরদের শিরায় ঢুকে পড়েছিলো এবং খৃস্টানরা ফিলিস্তিন দখল করে নিয়েছিলো। কয়েকটি মুসলিম প্রজাতন্ত্র এমন ছিলো যে, সেগুলোর উপর খৃস্টানদের দখল ছিলো না বটে; কিন্তু সেগুলোর শাসকদের হৃদয়ের উপর তাদের কজা ছিলো। খৃস্টান ও ইহুদীরা মুসলমানদের চরিত্র ধ্বংস করার কাজে এতো সাফল্য অর্জন করেছিলো যে, একজন মুসলিম সালার সম্পর্কেও নিশ্চিত করে বলা সম্ভব ছিলো না, ইনি সালতানাতে ইসলামিয়ার অফাদার। জঙ্গী ও আইউবীর জন্য এই গাদ্দাররা একটি মহা-সমস্যার রূপ ধারণ করেছিলো। ১১৭৪ ও ১৯৭৫ সালে সুলতান আইউবীও ফিলিস্তিনের মাঝে কালেমাগো ভাইয়েরাই অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। খৃস্টনরা দূরে বসে তামাশা দেখছিলো। সুলতান আইউবী প্রতিটি রণাঙ্গনে খৃস্টানদেরকে পরাজয়ের পর পরাজয় উপহার দিয়ে ফিরছিলেন। কিন্তু তারা মুসলিম আমীরদেরকেই আইউবীর মোকাবেলায় দাঁড় করিয়ে দেয়। তার সবচেয়ে দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক ঘটনা হলো স্বয়ং নুরুদ্দীন জঙ্গীর পুত্র আল-মালিকুস সালিহ তার ওফাতের পর সুলতান আইউবীর বিরোধী শিবিরে চলে যায়।
