এভাবে আমর দরবেশ, আলী বিন সুফিয়ান ও তাঁর কমান্ডো সেনারা শত্রুবাহিনী ও জনগণের দৃষ্টির আড়ালে থেকে একটি যুদ্ধ জয় করে ফেলে। এটি ছিলো ব্যক্তিগত লড়াই, যা ঈমান ও জাতীয় চেতনার শক্তিতে লড়া হয়েছিলো। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এই গোপন যুদ্ধ সম্পর্কে সব সময় সজাগ থাকতেন। তাঁর ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা অত্যন্ত দক্ষ ছিলো।
যে সময়টায় সুদানী মুসলমানগণ এই যুদ্ধে জয়লাভ করে, ঠিক তখন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী মুসলিম শাসক গোমস্তগীন, সাইফুদ্দীন ও আল-মালিকুস সালিহর সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে তাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও ছোট ছোট দুর্গ দখল করে নেন। তিনি হাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন, যেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ও আল-মালিকুস সালিহর বাহিনীর হেডকোয়ার্টার। সুলতান আইউবী এই শহরটিকে অবরুদ্ধ করার পর অবরোধ তুলে নিয়েছিলেন। সেখানকার মুসলিম অধিবাসীরা এতো কঠিন হাতে তার মোকাবেলা করে যে, সুলতান আইউবী হাঁফিয়ে ওঠেন।
তিন তিনটি মুসলিম বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে সুলতান আইউবী তাদেরকে এমনভাবে পিছু হটিয়ে দেন যে, তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। সুলতান তাদের পশ্চাদ্ধাবন অব্যাহত রাখেন। তাঁর অধিকতর দৃষ্টি হাবের বাহিনীর উপর নিবদ্ধ। কেননা, তারা বীর যোদ্ধা। তারা পিছপা হয়ে হাবের দিকে ফিরে যাচ্ছে। সুলতান আইউবী তাদেরকে পথেই ধ্বংস করে দিতে চাইলেন। কেননা, তাঁর সৈন্যদেরকে হাল্ব বাহিনীর পেছনে ধাওয়া করতে বলেননি, বরং তিনি তার বিদ্যুাতিসম্পন্ন বাহিনীটিকে অন্য পথে রওনা করিয়ে কিছু কমান্ডো সেনাকে শত্রু বাহিনীর দুপার্শ্বে পাঠিয়ে দেন।
হালবের বাহিনী ছিন্নভিন্নভাবে হাবের দিকে ছুটে চলেছে। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর তার কমান্ডাররা দেখতে পেলো, সুলতান আইউবীর সৈন্যরা হাবের পথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে। হাসানের বাহিনী থেকে গেলো। তার সৈন্যদের যুদ্ধ করার মতো মনোবল নেই। তাদের সরঞ্জামও এখন অনেক কম। রসদও অপর্যাপ্ত। এরা থেকে গেলে সুলতান আইউবীর কমান্ডোরা গেরিলা আক্রমণ চালাতে শুরু করে। আইউবীর কমান্ডাররা ঘোষণা দেয়- হাবের সৈন্যরা! তোমরা অস্ত্র ত্যাগ করো।
সুলতান আইউবী রণাঙ্গন থেকে অনেক পেছনে। তিনি সংবাদ পাচ্ছেন, হাবের সৈন্যরা অস্ত্র সমর্পণ করার পর্যায়ে এসে যাচ্ছে। তিনি বললেন–এই বাহিনীটি যদি খৃস্টানদের হতো, তাহলে আমি তার একজন সৈন্যকেও জীবিত ফিরে যেতে দিতাম না। কিন্তু এটা যে আমার ভাইদেরই বাহিনী। তারা অস্ত্র ত্যাগ করলে আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দেবো। কিন্তু তারপরও আমি আনন্দ পাবো না। মৃত্যুর পর আমার আত্মা এই ভেবে কষ্ট পাবে যে, আমার শাসনামলে মুসলমানদের তরবারী নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিলো। আমার এই ভাইয়েরা যদি এখনো বন্ধু-শত্রু চিনতে সক্ষম হয়, তাহলে এই লজ্জাজনক ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে।
আল্লাহ সুলতান আইউবীর দুআ কবুল করেন। পরদিন-ই তার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়। তিনি দেখতে পান, দুজন অশ্বারোহী তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। একজনের হাতে সাদা পতাকা। তাদের ডানে-বাঁয়ে সুলতান আইউবীর ফৌজের দুজন কমান্ডার। নিকটে এসে ঘোড়া দুটি থেমে যায়। এক কমান্ডার ঘোড়া থেকে নেমে এসে সালাম করে বললো হাবের শাসক আস-সালিহ সন্ধির প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। এই দূত দুজন যুদ্ধবিরতি ও সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এসেছে।
এক দূত বার্তাটি সুলতান আইউবীর হাতে দেয়। সুলতান বার্তাটি পাঠ করে বললেন- আস-সালিহকে বলবে, সালাহুদ্দীন আইউবী যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যখন পয়গাম পাঠিয়েছিলেন, তখন তুমি ফেরাউনের ন্যায় দূতকে অপমান করে আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলে। আজ আল্লাহ আমাকে বিজয় আর তোমাকে শোচনীয় পরাজয় দান করেছেন। এখন আমার এতোটুকু শক্তি আছে যে, আমি তোমার বাহিনীকে এমনভাবে পিষে মারতে পারি, যেমনি দুপাথরের মাঝে গম পেষণ করা হয়। কিন্তু তারপরও আমি মনে করি, আমার শত্রু তোমরা নও। তুমি সেই পিতার সন্তান, যিনি খৃস্টানদেরকে আজীবন তটস্থ রেখেছিলেন। অথচ তুমি কিনা খৃস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে পিতার ফৌজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে। শোন দূত! তাকে বলবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। দুআ করো, আল্লাহও যেন তোমাদের মাফ করে দেন।
সুলতান আইউবী কয়েকটি শর্তের ভিত্তিতে আস-সালিহর প্রস্তাব মঞ্জুর করে নেন। তিনি এই শর্তে আস-সালিহর ফৌজকে হাব ফিরিয়ে নেয়ার অনুমতি প্রদান করেন- যখন আমার ফৌজ হাব আসবে, তখন তোমার ফৌজ আমার ফৌজের মোকাবেলা করতে পারবে না।
এ সময় আরো একটি মজার ঘটনা ঘটে। আল-মালিকুস সলিহ তার বাহিনী নিয়ে বেরিয়ে যায়। সাইফুদ্দীনও পিছপা হয়ে মসুল চলে গিয়েছিলো। আর গোমস্তগীন নিজ দুর্গ হাররানের পরিবর্তে হাবের অভিমুখে রওনা হয়। সুলতান তার বাহিনীকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যান। তুকমান নামক স্থানে তিনি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করেন। একদিন হাবের এক দূত তার নিকট এসে আল-মালিকুস সালিহরর একটি পয়গাম তার হাতে দেন। সুলতান পত্রখানা খুলে পাঠ করে চমকে ওঠেন। কারণ, এ পয়গাম তার প্রতি নয়- সাইফুদ্দীনের প্রতি লেখা। আল মালিকুস সালিহ সাইফুদ্দীন লিখেছেন
