এগুলো সেই সুদানীদের লাশ, যারা নোম উপসাগরের তীরে অবস্থানরত সুলতান আইউবীর বাহিনীর উপর আক্রমণ করতে রওনা হয়েছিলো। সুলতান আইউবীর জানবাজ সৈনিকরা রাতের বেলা পেছন থেকে হামলা চালিয়ে এখানে-ই থামিয়ে দিয়েছে তাদের অগ্রযাত্রা, ব্যর্থ করে দিয়েছে তাদের অশুভ তৎপরতা। আরো সামনে মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে সুদানীদের অসংখ্য লাশ। আইউবী বাহিনীর হাতে পরাজিত হওয়ার পর নিহতদের লাশগুলো পর্যন্ত তুলে নেয়ার সুযোগ পায়নি তারা।
এগিয়ে চলছে কাফেলা।
নিহত সুদানীদের লাশের আশেপাশে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে তাদের অস্ত্র । তীর-কামান, বুর্শা-ঢাল ইত্যাদি। কাফেলার কয়েদীদের চোখে পড়ে সেগুলো। তারা পরস্পর কানাঘুষা করে। যে মেয়েটি রক্ষী কমাণ্ডারকে কজা করে রেখেছিলো, তার সঙ্গেও চোখের ইঙ্গিতে কথা বলে রবিন। লাশ ও অস্ত্র ছড়িয়ে আছে অনেক দূর পর্যন্ত।
ডান দিকে নিকটে-ই সবুজ-শ্যামল মনোরম একটি জায়গা। পানিও নজরে আসছে। এই সবুজের সমারোহ টিলাগুলোর চূড়া পর্যন্ত বিস্তৃত। মেয়েটি চোখ টিপে ইঙ্গিত করলো কমাণ্ডারকে। কমাণ্ডার চলে আসে মেয়েটির নিকটে। মেয়েটি বললো–জায়গাটি বেশ মনোরম, এখানেই তাঁবু ফেলল। রাতে বেশ মজা হবে।
কাফেলার মোড় ঘুরিয়ে দেয় কমাণ্ডার। সবুজ-শ্যামল টিলার নিকটে পানির ঝরনার কাছে গিয়ে থেমে যায় সে। ঘোষণা দেয়, এখানে-ই রাত কাটবে। উট-ঘোড়ার পিঠ থেকে নামে সকলে। পানির উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে পশুগুলো। রাত যাপনের জন্য উপযুক্ত জায়গার সন্ধান করে কমাণ্ডার। দুটি টিলার মাঝে প্রশস্থ একটি জায়গা, সবুজে ঘেরা। ছাউনি ফেলার নির্দেশ হয় এখানে।
গভীর রাত। চারদিক অন্ধকার। ঘুমিয়ে আছে সকলে। জেগে আছে শুধু দুজন। কমাণ্ডার আর মেয়েটি। কমাণ্ডারের ভাবনা এক, মেয়েটির মতলব আরেক। কমাণ্ডারের ইচ্ছা মেয়েটিকে ভোগ করে চলা আর মেয়েটির পরিকল্পনা কমাণ্ডারকে খুন করা।
নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে সবাই। কোন প্রহরা নেই। নিরাপত্তার কথা ভাববার-ই সময় নেই কমাণ্ডারের। শয়ন থেকে উঠে মেয়েটি। পা টিপে টিপে এগিয়ে যায় কমাণ্ডারের নিকট। মেয়েটিকে নিয়ে সকলের থেকে অনেক ব্যবধানে দূরে শুয়ে আছে কমাণ্ডার। মেয়েটি তাকে একটি টিলার আড়ালে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ কাটায় সেখানে। সে আরো একটু দূরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। মিসরী কমাণ্ডার তার ইচ্ছার গোলাম। এ যে এক ষড়যন্ত্র, কল্পনায়ও আসছে না তার। মনে তার বেশ আনন্দ। সে মেয়েটির সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে। আরো তিনটি টিলা পেরিয়ে মেয়েটি একস্থানে নিয়ে যায় তাকে। এবার সে থামে। কমাণ্ডারকে দু বাহুতে জড়িয়ে ধরে মন উজাড় করে প্রেম-নিবেদন করে। নিজেকে প্রেম-সাগরে নিজেকে হারিয়ে ফেলে কমাণ্ডার।
রবিন দেখলো, কমাণ্ডার নেই। অন্য রক্ষীরাও গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। শুয়ে শুয়ে-ই সে পাশের সঙ্গীকে জাগায়। পাশের জন জাগায় তার পরের জনকে। এভাবে জেগে উঠে তারা চারজন।
রক্ষীরা ঘুমিয়ে আছে তাদের থেকে একটু দূরে। কোন পাহারাদার নেই। বুকে ভর দিয়ে ক্রোলিং করে সামনে এগিয়ে যায় রবিন। রক্ষীদের অতিক্রম করে। চলে যায় অনেক দূর। পিছনে পিছনে এগিয়ে যায় তার তিন সঙ্গী। তারা টিলার আড়ালে গিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। চলে যায় মাঠের লাশগুলোর কাছে। কুড়িয়ে নেয় অস্ত্র । তিনটি ধনুক, তূনীর ও একটি করে বর্শা হাতে তুলে নেয়। এবার অস্ত্র নিয়ে একত্রে ফিরে আসে তিনজন।
সঙ্গীদের নিয়ে ঘুমন্ত রক্ষীদের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় রবিন। হাতের বর্শাটা শক্ত করে ধরে। তুলে ধরে চীৎ হয়ে শুয়ে থাকা এক রক্ষীর বুক বরাবর। অপর চারজনও এক একজন রক্ষীর নিকট দাঁড়িয়ে যায় পজিশন নিয়ে। মুহূর্ত মধ্যে জীবনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে সুলতান আইউবীর চার রক্ষীর। এ চারজনকে খুন করে কেউ টের পাওয়ার আগে অপর এগারজনকেও শেষ করে ফেলা ব্যাপার নয়। চাল তাদের সফল। তারপর থাকে তিন উষ্ট্ৰচালক আর কমাণ্ডার। পনের রক্ষীর হত্যার পর তারা হবে সহজ শিকার।
রক্ষীর বুকে বিদ্ধ করার জন্য বর্শাটা আরো একটু উপরে তোলে রবিন। সে রক্ষীর বুকটা শেষবারের মত দেখে নেয়। আঘাতের জন্য হাতটা তার নীচে নেমে এলো বলে, হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দ ভেসে আসে রবিনের কানে। সঙ্গে সঙ্গে সম্মুখ দিক থেকে একটি তীর এসে বিদ্ধ হয় রবিনের বুকে। ছুটে আসে আরেকটি তীর। বিদ্ধ হয় রবিনের এক সঙ্গীর বুকে। একই সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। দুজন। অপর তিনজন দেখার চেষ্টা করছে, ঘটনাটা কী ঘটলো। ইত্যবসরে ধেয়ে আসে আরো দুটি তীর। আঘাত খেয়ে পড়ে যায় আরো দুজন। এখনো দাঁড়িয়ে আছে একজন। পালাবার জন্য পিছন দিকে মোড় ঘুরায় সে। অনি একটি তীর, এসে গেঁথে যায় তার এক পাজরে। তার দু চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসে; পড়ে যায় মাটিতে।
ঘটনাটা ঘটে গেলো নিতান্ত চুপচাপ । একে একে পাঁচটি প্রাণী ঢলে পড়লো মৃত্যুর কোলে; কিন্তু টের পেলো না কেউ। এখনো সবাই ঘুমুচ্ছে নাক ডেকে। যম এসে দাঁড়িয়েছিলো যাদের সামনে, টের পেলো না তারাও।
ঘটনাস্থলে এগিয়ে আসে তীরন্দাজরা। আলো জ্বালায় তারা। তারা সেই দুই রক্ষী, যারা কমাণ্ডারের আচরণে আপত্তি তুলে বলেছিলো, গড়িমসি না করে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছা দরকার । শুয়েছিলো তারা। চার কয়েদী যখন পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করছিলো, তখন চোখ খুলে যায় একজনের। সে সঙ্গীকে জাগিয়ে কয়েদীদের অনুসরণ করে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, কয়েদীরা যদি পালাবার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের তীর ছুঁড়ে খতম করে দেবে। তাই তাদের গতিবিধি অনুসরণ করে তারা অস্ত্র কুড়িয়ে নিয়ে কয়েদীদের ফিরে আসতে দেখে একটি টিলার আড়ালে বসে পড়ে চুপচাপ। এবার যেইমাত্র কয়েদীরা রক্ষীদের বুক লক্ষ্য করে বর্শা তাক করে, অমনি রক্ষীরা তাদের প্রতি তীর ছুঁড়ে দেয়। খতম করে দেয় চার কয়েদীর প্রত্যেককে।
