উহ!- সুদানী সালার চমকে উঠে বললেন- আমি তো গল্প শোনায় ব্যস্ত হয়ে তোমার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। আচ্ছা, আমি ব্যবস্থা করছি। তুমি ঐ কক্ষে চলে যাও।
নাহ- আশি বললো- একা একা মজা হবে না। আপনিও চলুন। এখানে কোনো সমস্যা নেই। দুদিকে সান্ত্রী দাঁড়িয়ে আছে। প্রয়োজন হলে পরে আবার আসবেন।
আশি এই বিদ্যায় ওস্তাদ। শৈশব থেকে অদ্যাবধি প্রশিক্ষণই পেয়ে আসছে। এবার সেই বিদ্যা নিজের বস ও গুরুদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। সুদানী সালার তার হাসির ফাঁদে আটকা পড়েছে। লোকটি সবকিছু ভুলে গিয়ে আশির সঙ্গে কক্ষপানে পা বাড়ায়। বাইরে বের হয়ে সে এক কর্মচারীকে মদ আনতে বলে নিজে আশির সঙ্গে কক্ষের দিকে চলে যায়। আশি তাকে তার বাহু বেষ্টনীতে নিয়ে নেয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই বৃদ্ধ সালারের উপর যুবতী মেয়েটির জাদু ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।
ইতিমধ্যে মদ এসে গেছে। আশি সালারকে পেয়ালার পর পেয়ালা গেলাতে শুরু করে।
***
নিয়ত স্বচ্ছ হলে আল্লাহও সাহায্য করেন- আমর দরবেশ ইসহাককে বললেন- আমার পরিকল্পনা পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে। বিস্তারিত কথা শহর থেকে বের হয়ে শোনাবো। দুজন কমান্ডো সঙ্গে এনেছি। দু সান্ত্রী এদিকে দাঁড়িয়ে আছে আর দুজন ওদিকে। আমরা যেদিক দিয়ে বের হবো, সেদিককার সান্ত্রীদের খতম করলেই চলবে। আমাদের চারটি ঘোড়া প্রস্তুত আছে। চারটি প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সান্ত্রীদের, যাতে আমরা পালিয়ে গেলে ধাওয়া করতে পারে। আমাদের ওখানে মিশর থেকে কিছু লোক এসেছেন। একজনকে খুবই বিচক্ষণ মনে হচ্ছে। তিনি নিজের নাম বলেননি। কায়রোতে ওখানকার খবরাখবর পৌঁছে গেছে। সালারকে মেয়েটি নিয়ে গেছে। আমি একটু বাইরের অবস্থাটা দেখে আসি। মেয়েটিকেও সঙ্গে নিতে হবে।
কেন?- ইসহাক জিজ্ঞেস করেন- এই বেশ্যাটার সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক
এখান থেকে বের হয়ে বলবো- আমর দরবেশ বললেন- মেয়েটি মুসলমান।
আমর দরবেশ কক্ষ থেকে বের হন। সান্ত্রীরা তাকে সুদানী সালারের সঙ্গে এ কক্ষে আসতে দেখেছিলো। সে কারণে তারা তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। তিনি তার কমান্ডোদের নিকট গিয়ে বললেন, সান্ত্রীদের সামলানোর সময় এসে গেছে। তারপর সালারের কক্ষের দরজাটা খানিক ফাঁক করে তাকান। সালার মদের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে মুদিত চোখে মাতাল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- কে? আশি বললো- আমি দেখছি। বলেই উঁকি দিয়ে মুখ ফিরিয়ে বললো- বাতাস। মেয়েটি সালারকে ঠেস দিয়ে পালংকের উপর শুইয়ে দেয়। সালার বাহু এগিয়ে দিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো- তুমিও আসো। নেশা আরো বাড়িয়ে দাও।
আশি কিছুই না বলে বিড়ালের ন্যায় পা টিপে টিপে শব্দ ছাড়া দরজা খুলে কক্ষ থেকে বের হয়ে বাইরে থেকে আলতোভাবে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। আমর দরবেশ ও আশি কমান্ডো দুজনকে সঙ্গে নিয়ে ইসহাকের কক্ষের দিকে যান।
ইতিমধ্যে সুদানী গোয়েন্দা শহরে ঢুকে পড়েছে। গন্তব্য তার গোয়েন্দা হেডকোয়ার্টার।
আমর দরবেশ দরজার বাইরে দাঁড়ানো সান্ত্রীদের বললেন- ভেতরে চলো, কয়েদীকে কয়েদখানায় নিয়ে যাও। সালার নির্দেশ দিয়েছেন, হাত বেঁধে নিতে হবে।
উভয় সান্ত্রী একসঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করে। সঙ্গে সঙ্গে কক্ষের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। দুকমান্ডো একসঙ্গে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে দুসান্ত্রীর ঘাড় দুকমান্ডোর বাহুতে আটকে যায়। কমান্ডোদের খঞ্জর পূর্ব থেকেই বের করা আছে। তারা সান্ত্রীদের হৃদপিণ্ডে আঘাত হানে। সান্ত্রীদ্বয় সাথে সাথেই নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
সুদানী গোয়েন্দা গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। সে এক নায়েব সালারকে রিপোর্ট দিচ্ছে।
আমর দরবেশ ইসহাককে বললেন- বেরিয়ে পড়ুন। বাইরে আটটি ঘোড়া দণ্ডায়মান। চারটি আমর দরবেশের, চারটি সুদানী সান্ত্রীদের। অপর দিকের সান্ত্রীরা টেরই পেলো না, ভেতরে কী ঘটছে। আমর দরবেশ ইসহাককে নিয়ে বেরিয়ে যান।
সুদানী সালারের ভবন ত্যাগ করে তারা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে। গোটা শহর গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। পলায়নকারীরা তৎক্ষণাৎ ঘোড়া হাঁকালো না। আশিও আছে তাদের সঙ্গে। সুদানী সালারের রিপোর্ট শুনে নায়েব সালার তাকে সালারের নিকট নিয়ে যায়। এদিকে আসতে পথে তারা পাঁচটি ঘোড়া যেতে দেখে। পরস্পর কাছাকাছি দিয়েই অতিক্রম করে। কিন্তু অন্ধকারে কেউ কাউকে চিনতে পারেনি।
নায়েব সালার সালারের বাসভবনের সেই বারান্দাটায় এসে এদিক-ওদিক তাকায়, যেখানে একটু আগে দুজন সান্ত্রী দাঁড়িয়ে ছিলো। কক্ষের দরজা খুলে সে উক্ত সান্ত্রীদের লাশ পড়ে থাকতে দেখে। ভেতরে গিয়ে পেছনের দরজাটাও খুলে। ওদিকে দুজন সান্ত্রী দাঁড়িয়ে আছে। দৌড়-ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। এক কক্ষে সালার মাতাল অবস্থায় পড়ে থেকে আশিকে ডাকছে। নায়েব সালার তাকে ডেকে তোলে। আশি তাকে পেটপুরে খাইয়ে গেছে। তাকে জানানো হলো, দুজন সান্ত্রী কক্ষে মৃত পড়ে আছে। এবার তার সম্বিৎ ফিরে পায়। তার কথা বলার ও কথা বুঝার মতো অবস্থা ফিরে আসে যখন, ততোক্ষণে আমর দরবেশ, ইসহাক, দুমিশরী কমান্ডো ও আশি চলে গেছে বহুদূর। ধাওয়া করা বৃথা।
পরদিন মধ্যরাত আমর দরবেশ কাফেলাসহ পার্বত্য অঞ্চলে গিয়ে। পৌঁছেন। আলী বিন সুফিয়ান তার অপেক্ষায় অস্থিরচিত্তে প্রহর গুণছিলেন। এ মুহূর্তে ইসহাক ও আমর দরবেশকে মিশর পাঠিয়ে দেয়া আবশ্যক। কিন্তু তার আগে এ-ও প্রয়োজন যে, তারা অত্র এলাকায় ঘুরেফিরে মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন, যাতে মানুষ সুদানীদের যে ভেল্কিবাজি দেখেছিলো, তার হাকীকত পুরোপুরি জানতে পারে। তবে তৎক্ষণাৎ কিছু লোককে নিযুক্ত করা হলো, যাতে সুদানীরা হামলা করলে যথাসময়ে সংবাদ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় প্রয়োজনটি হলো, মিশরী ফৌজের আরো কিছু কমান্ডো সেনাকে এই অঞ্চলে নিয়ে আসা, যাতে সুদানীরা আক্রমণ করলে তারা পেছন দিক থেকে গেরিলা হামলা চালাতে পারে এবং সুদানী ফৌজকে অত্র অঞ্চল থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে।
