আচ্ছা, তা না করে আশিকে দিয়ে আরেকবার চেষ্টা করে দেখবো নাকি? সুদানী সালার জিজ্ঞেস করে।
না- আমর দরবেশ বললেন- আমি তার উপর আমার ভাষার জাদু প্রয়োগ করবো। এখনই যদি আপনি তাকে উক্ত কক্ষে পাঠিয়ে দেন, তাহলে আশা করি ভোর পর্যন্ত আমি তাকে জালে আটকে ফেলতে পারবো। আমার হাতে সময় বেশি নেই। উক্ত এলাকা থেকে আমার অনুপস্থিতি দীর্ঘ না হওয়া উচিত। আপনি তো জানেন, সেখানে মিশরী গোয়েন্দাও আছে। আমি যে জাদু প্রয়োগ করে এসেছি, আমার অনুপস্থিতিতে মিশরী গোয়েন্দারা তা ব্যর্থ করে দিতে পারে।
সুদানী সালার আমর দরবেশকে তার সঙ্গের কমান্ডো দুজন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আমর বললেন, এরা আমার রক্ষী ও ভক্ত। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে আমার সঙ্গে এসেছে।
***
ইসহাককে একটি মনোরম ও সুদক্ষ কক্ষে নিয়ে আসা হলো। তাকে নিয়ে আসার জন্য সালার নিজে কয়েদখানায় যায়। গিয়ে তাকে বললো- তোমার জাতীয় চেতনা ও ঈমানী শক্তিতে আমি মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। তোমার এক বন্ধু আমর দরবেশ তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছে। আমি চাই, একটি ভালো পরিবেশে তোমাদের সাক্ষাৎ পর্ব অনুষ্ঠিত হোক।
কয়েদখানা অপেক্ষা অধিক নোংরা ও কষ্টদায়ক কিংবা তোমার প্রাসাদ অপেক্ষা হৃদয়গ্রাহী ও মনোরম পরিবেশ কোনটিই আমাকে আমার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না- ইসহাক বললেন- আমাকে অন্ধকার পাতাল কক্ষে নিক্ষেপ করো কিংবা বালাখানায় নিয়ে যাও, কোন অবস্থাতেই আমি আমার ঈমান বিক্রি করবো না।
সুদানী সালার হেসে পড়ে এবং ইসহাককে সেই কক্ষে নিয়ে যায়, যেখানে আমর দরবেশ তার অপেক্ষায় বসে আছেন। সালার নিজেও কক্ষে অবস্থান নেয়।
তোমার চেহারা বলছে, তুমি এই কাফেরদের নিকট নিজের ঈমানটা বিক্রি করে ফেলেছে- ইসহাক আমর দরবেশকে উদ্দেশ্য করে বললেন তোমার চেহারার রওনক আর চোখের চমক বলছে, তুমি দীর্ঘদিন যাবত কয়েদখানার বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছে। আমার সঙ্গে সাক্ষাতে তোমার উদ্দেশ্য কি?
আমি তোমার চেহারায়ও এই রওনক আর চোখে সেই চমক দেখতে চাই, যা তুমি আমার চেহারা ও চোখে দেখতে পাচ্ছো- আমর দরবেশ বললেন আমাকে একটু সময় দাও। ক্ষণিকের জন্য তোমার হৃদয় ও মস্তিষ্কটা আমাকে দিয়ে দাও। ধৈর্যের সাথে ও শান্তমনে আমার কথা শোনো।
সুদানী সালার পার্শ্বে দণ্ডায়মান। সে ঝুঁকি মাথায় নিতে চাচ্ছে না। ইসহাক তার অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কয়েদী। আমর দরবেশও তার কয়েদী ছিলো। এটা আমর দরবেশের প্রতারণাও হতে পারে। এই দুজন লোককে সে এমন একটি কক্ষে একাকী ছেড়ে যেতে চাচ্ছে না, যেটি কয়েদখানার নিরাপদ কক্ষ নয়। পাহারার জন্য সে চারজন প্রহরী নিযুক্ত করে দিয়েছে। দুজন কক্ষের সামনে আর দুজন পেছনের দরজায়। বর্শা ও তরবারী ছাড়া তাদের কাছে তীর-ধনুকও আছে, যাতে কেউ পালাবার চেষ্টা করলেও সফল হতে না পারে। আমর দরবেশ চাচ্ছেন, সালার এখান থেকে চলে যাক। কিন্তু লোকটা এক পা-ও নড়ছে না। তার উপস্থিতিতে আমর দরবেশ ইসহাককে বলতে পারেন না তার পরিকল্পনা কী।
সুদানী সালার আশিকে খাওয়া-দাওয়ার জন্য এ ভবনেরই অন্য এক কক্ষে পাঠিয়ে দিয়েছে। সালারকে এই কক্ষ থেকে সরিয়ে নেয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিলো। কিন্তু আপাতত তার এদিকে আসবার সম্ভাবনা নেই।
যে সুদানী গুপ্তচর পরিস্থিতি জানানোর জন্য ছুটে আসছে, এখন আর সে শহর থেকে বেশী দূরে নয়। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমর দরবেশের দুকমান্ডো সঙ্গী এই ভবনেরই বারান্দায় তার সংকেতের অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ পর আশি বেরিয়ে আসে। পোশাক পরিবর্তন করে এসেছে আশি। রূপ যেনো ঠিকরে পড়ছে তার। সফরের ক্লান্তিও মুখ থেকে ধুয়ে-মুছে পরিস্কার হয়ে গেছে। সে কমান্ডোদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে যায়।
সালার চলে গেছেন? আশি কমান্ডোদের জিজ্ঞেস করে।
না- এক কমান্ডো জবাব দেয়- তিনি ভেতরে আছেন।
তার চলে যাওয়া দরকার। বলেই আশি কক্ষের দিকে এগিয়ে যায়।
আশিকে কক্ষে প্রবেশ করতে দেখে আমর দরবশের মনে আশার সঞ্চার হয়। সুদানী সালার তার প্রতি তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দেয়। সেই হাসি, যে হাসি আশির মতো মেয়েদের প্রতি চোখ পড়লে তার মতো পুরুষদের ওষ্ঠাধর গলে বেরিয়ে আসে।
আশি দুলতে দুলতে বিশেষ এক ভঙ্গিমায় সালারের পেছনে চলে যায়। আমর দরবেশের প্রতি গভীর দৃষ্টিতে তাকায় সে। আমর দরবেশ সুযোগ পেয়ে যান। তিনি আশিকে ইশারা করলেন, সালারকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলে।
ইসহাক ভাই!- আমর দরবেশ জিজ্ঞেস করে আমরা কি সুদানের সন্তান নই?
আমরা সর্বাগ্রে ইসলামের সৈনিক- ইসহাক জবাব দেন- আর আমি এখনও মিশরী কমান্ডার ও সুলতান আইউবীর অফাদার। মিশরের ভূখণ্ড যদি আমার মা হয়ে থাকে, তাহলে আমি আমার জননীকে ইসলামের শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারি না। আমর দরবেশ! আমি তোমার ন্যায় ইসলামের মর্যাদা ও নিজের ঈমান বিক্রি করতে পারবো না।
আশি পেছন থেকে সুদানী সালারের কাঁধে নিজের উভয় বাহু রেখে মুখটা তার কানের সঙ্গে লাগিয়ে বললো- দিন কয়েকের মধ্যেই আপনার হৃদয়টা মরে গেছে।
সুদানী সালার মোড় ঘুরিয়ে তাকালে আশির গাল ও বিক্ষিপ্ত চুলগুলো তার গণ্ডদেশ ছুঁয়ে যায়। আশির মুখে মুচকি হাসি। বললো- আমি এতো ঝুঁকিপূর্ণ ও ভয়ংকর মিশন থেকে ফিরে আসলাম, আগামীকাল আবার পাহাড়-জঙ্গলে চলে যেতে হবে, যেখানে পানি ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না। মদের ঘ্রাণটাও কি আমি ভুলে যাবো?
