যাই বলি না কেননা, এলাকাটা সুদানের, যেখানে মুসলমানদের স্বাধীনতা বলতে কিছুই নেই। সুদানী ফৌজ প্রয়োজন বোধ করলে হামলা করার অধিকার রাখে। কিন্তু তারপরও মুসলমানরা এলাকায় তাদের বিধি বিধান চালু রেখেছে। তারা যে কজন শত্ৰু গোয়েন্দাকে গ্রেফতার করেছিলো,তাদেরকে নিজেদের তৈরি কয়েদখানায় ফেলে রেখেছে। তাদের শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু এই শাস্তি বিধান সুদানী আইনে অপরাধ। এই আসামীরা যা কিছু করেছে, সবই সুদানের স্বার্থে করেছে। কিন্তু আলী বিন সুফিয়ান ঝুঁকি মাথায় তুলে নেন। তিনি তার কমান্ডোদের ভাগ করে দুটি দল গঠন করে নেন।
কয়েদখানায় ইসহাককে উন্নত একটি কক্ষে রাখা হয়েছে। তাকে অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে উন্নত খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। তিনি ভালোভাবেই বুঝেন, তার সঙ্গে এই সদাচারণ কেননা করা হচ্ছে। আমর দরবেশ তাকে তার পরিকল্পনা পুরোপুরি বলে গিয়েছিলো। ইসহাক একাকী বসে সে নিয়েই ভাবছেন। দুটি আশংকা তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রথমত, আমর দরবেশ কয়েদখানার নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে সুদানীদের হাতে খেলতে শুরু করলো কিনা। দ্বিতীয়ত, নাকি নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলেন।
ইসহাক নিজের পলায়ন সম্পর্কেও ভাবছেন। কিন্তু কোনো পন্থা তার চোখে পড়ছে না। সুদানীদের জন্য তিনি একজন মূল্যবান কয়েদী, যার ফলে তার জন্য অতিরিক্ত পাহারার ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। আমর দরবেশের চলে যাওয়ার পর থেকে কেউ তাকে বলেনি, তোমার সম্প্রদায়কে সুদানের অফাদার বানিয়ে দাও। যে সুদানী সালার তার পেছনে ছায়ার মতো লাগা ছিলো, সেও এ যাবত একবারের জন্যও তার সামনে আসেনি।
সূর্য ডুবে গেছে। চারটি ঘোড়া সুদানের রাজধানীতে প্রবেশ করে সোজা সেনা হেডকোয়ার্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আমর দরবেশের জানা আছে, তাকে কোথায় যেতে হবে এবং কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। চিন্তা চেতনা বিধ্বংসী তৎপরতার প্রশিক্ষণ তিনি এখান থেকেই গ্রহণ করেছিলেন। তিনি রক্ষী বাহিনীর কমান্ডারকে সেই সুদানী সালারের নাম বললেন, যে তাকে এ কাজের জন্য প্রস্তুত করেছিলো। সঙ্গে সঙ্গে তাকে সালারের বাসভবনে পৌঁছিয়ে দেয়া হলো।
ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে নাকি ভালো কোনো সংবাদ নিয়ে এসেছে। আমর দরবেশকে দেখেই সুদানী সালার জিজ্ঞেস করে।
ভালো সংবাদ ওর নিকট থেকে শুনুন- আমর দরবেশ আশির প্রতি ইশারা করে বললেন- আমার বক্তব্যে আপনার বিশ্বাস নাও হতে পারে।
আশি ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত বদনে পালংকের উপর ধপাস করে বসে পড়ে। তার দুঠোঁটের ফাঁকে মিষ্টি হাসি। সে আমর দরবেশকে উদ্দেশ করে বলে বিস্তারিত ঘটনা আপনিই বিবৃত করুন এবং তাড়াতাড়ি করুন। হাতে সময় বেশী নেই।
আমাদের মিশন এতো দ্রুত সফল হয়ে গেলো যে, আমি তার কল্পনাও করিনি। আমর দরবেশ বলেন। তিনি কিভাবে পানিতে আগুন লাগালেন এবং কিভাবে দূর পর্বতের জালওয়া দেখালেন, তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
আর তার কথা বলার ভঙ্গী এতো আকর্ষণীয় ছিলো যে, আমি বিস্মিত হয়ে পড়ি- আমর দরবেশ সম্পর্কে আশি বললো- মানুষ তার ভেল্কিবাজিতে তেমনি প্রভাবিত হয়ে গেছে, যেমনটি হয় তার ভাষায়।
আচ্ছা, আমাদের ওখানকার সাফল্যের সংবাদ নিয়ে কি এখনো কেউ আসেনি? আমর দরবেশ জিজ্ঞেস করেন।
না, কেউ আসেনি- সালার বললো- আমি তো তোমাদের চিন্তায় অস্থির ছিলাম।
শুনে আমর দরবেশ নিশ্চিত হন যে, এখনো কোনো গুপ্তচর এসে পৌঁছেনি। যে সুদানী গোয়েন্দা মুসলমানদের বন্দীদশা থেকে পালিয়ে এসেছিলো, এখনো সে এসে পৌঁছেনি। তার গতি আমর দরবেশের গতি অপেক্ষা শ্লথ। তার এসে পৌঁছতে রাত পার হয়ে যাবে। আমর দরবেশের যা করার উক্ত গোয়েন্দা পৌঁছানোর আগেই শেষ করতে হবে। সে এসে পৌঁছলেই ঘটনা ফাঁস হয়ে যাবে। আমর দরবেশ তাড়াতাড়ি কার্যসিদ্ধি করে বের হতে না পারলে তাকে আবারও ভয়ংকর পরিণতি বরণ করতে হবে।
এবার কাজের কথা বলি- আমর দরবেশ বললেন- আমাদের ইসহাককে প্রয়োজন। আমি অর্ধেকেরও বেশী মুসলমানের চিন্তা-চেতনাকে ধোলাই করে ফেলেছি। তাদেরকে আমি সুদানের অফাদার হতে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছি। তাদের অন্তরে আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দিয়েছি। আমি প্রমাণ করে দিয়েছি, সালাহুদ্দীন আইউবী ফেরাউনদের উত্তরসূরী। এখন যদি তাদেরকে তাদের কোনো নেতা বলে দেন যে, তোমাদেরকে সুদানের আনুগত্য করতে হবে, তাহলে উক্ত অঞ্চলের সব মানুষই আপনাদের হয়ে যাবে। আমি তথ্য পেয়েছি এবং আগে থেকে নিজেও জানি, এই জননেতা ইসহাক ছাড়া আর কেউ নয়। সেখানকার মুসলমানরা তাকে পীর-পয়গম্বর বলে মান্য করে।
কিন্তু ইসহাককে রাজি করাবে কে- সুদানী সালার বললেন- আমি তাকে এই ভূখণ্ডের ক্ষমতার লোভ দেখিয়েছি। এমন এমন নিপীড়ন করেছি, যা একটি ঘোড়াও সহ্য করতে পারে না। আশি পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
এবার আমাকে চেষ্টা করে দেখার সুযোগ করে দিন- আমর দরবেশ বললেন- কয়েদখানা থেকে বের করে তাকে সেই কক্ষে পাঠিয়ে দিন, যেখানে তাকে একবার রেখেছিলেন এবং আমাকেও রেখেছিলেন। আপনি তার দুশমন, আমি বন্ধু- সহকর্মী। আমার কথা তাকে ভাবিয়ে তুলবে পারে।
