আমি যদি খুনের অপরাধে অপরাধী হয়ে থাকি, তাহলে আমাকে হত্যা করে ফেলল। আক্রমণকারী লোকটি তরবারীটা জনতার সম্মুখে ছুঁড়ে ফেলে বললো।
আল্লাহর কসম! এই লোকটি খুনী হতে পারে না। যুবক ইমাম বললেন।
এ খুন বৈধ। জনতার মধ্য থেকে সমস্বরে রব ওঠে।
***
রাতের শেষ প্রহরে আমর দরবেশ ঘোড়া থামান। আশি ও কমান্ডোদের বললেন- কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নেই। ঘোড়াগুলোকেও বিশ্রামের সুযোগ দেয়ার প্রয়োজন ছিলো।
রাজধানীগামী গোয়েন্দা আধা রাত চলার পর বিশ্রামরে জন্য এক স্থানে থেমে যায়। তার জানা নেই। আমর দরবেশ আগে আগে যাচ্ছেন। গোয়েন্দা মাটিতে মাথাটা এলিয়ে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।
রাত পোহাবার পরপরই আমর দরবেশ প্রস্তুত হয়ে পুনরায় রওনা হন। তিনি সৈনিক। কষ্ট সহ্য করতে অভ্যস্ত। আশি প্রাসাদের মেয়ে। তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিলো বটে; কিন্তু তার সময় কাটছিলো বিলাসিতার মধ্যদিয়ে।
আশি!- আমর দরবেশ ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে বললেন- তোমার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তোমার রাত জাগার অভ্যাস নেই। আমাণ ঘোড়ায় পিঠে উঠে বসো।
আশি মুখ টিপে হাসে। কিন্তু চোখ দুটো তার বন্ধু। আমর দরবেশ তাকে পুনরায় বললেন- তোমার ঘোড়াটা ছেড়ে দাও।
আশি মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানায়। ঘোড়া ছুটে চলছে। আরো কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর এক কমান্ডো আমর দরবেশকে বললেন- মেয়েটি ঝিমুচ্ছে, ঘোড়া থেকে পড়ে যাবে।
আমর দরবেশ নিজের ঘোড়াটা আশির নিকটে নিয়ে তার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরেন। আশি জেগে যায়। আমর দরবেশ বললেন- নিজের ঘোড়াটা ছেড়ে দিয়ে আমার ঘোড়ায় চলে এসো।
সহায়তা নিতে চাই না- আশি বললো- আমি অন্যকে সহায়তা দিতে, চাই। আমাকে আমার প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে হবে। পিতা-মাতার খুন এবং নিজের সম্ভ্রমের প্রতিশোধ নিতে হবে। আমি জেগে থাকার চেষ্টা করছি।
ঘোড়া এগিয়ে চলে। অনেক পথ এগিয়ে যাওয়ার পরও আশির ঘুমের ভাব কাটছে না। আমর দরবেশ তার পাশে পাশেই ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন। তিনি দেখে না ফেললে আশি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়েই যেতো। তিনি ঘোড়া থামিয়ে কোন কিছু না বলে আশিকে নিজের ঘোড়ায় তুলে নেন এবং সম্মুখে বসিয়ে দেন। এক কমান্ডো আশির ঘোড়ার লাগাম নিজের জিনের সঙ্গে বেঁধে নেয়। সবগুলো ঘোড়া একসাথে ছুটে চলছে।
আশি নিজের মাথাটা আমর দরবেশের বুকের উপর ছেড়ে দিয়ে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মেয়েটির খোলা চুলগুলো আমার দরবেশের মুখের উপর উড়তে থাকে। এমন কোমল আর রেশম-সুন্দর চুলের পরশের সঙ্গে আমর দরবেশ পরিচিত নয়। কিন্তু মেয়েটির কোনকিছুই তার উপর সেই প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, একজন সুপুরুষ যুবকের উপর করার কথা। আশির পূর্বেকার বলা কথাগুলো তার মনে পড়তে শুরু করে।
তোমার কোলে আমার পিতা-মাতার কোলের আনন্দ অনুভূত হয়েছিলো- আশি কয়েকদিন আগে সেই মরু এলাকায় বসে বলেছিলো আমার তো এ কথাও স্মরণ নেই যে, আমারও বাবা-মা ছিলেন। আপনি আমার অতীতটা আমার চোখের সামনে এনে দিয়েছেন।
আমর দরবেশের মনে হতে লাগলো, যেনো আশি বাতাসের সঙ্গে ফিস ফিস করে কথাগুলো বলছে আর তিনি শুনছেন- আমাকে তোমার বক্ষ ও বাহুর আশ্রয়ে নিয়ে রাখো। আমি মুসলমানের কন্যা। আমাকে খৃস্টানদের হাতে তুলে দিও না। রক্ত… রক্ত…। আমি রক্ত দেখতে পাচ্ছি। এগুলো আমার পিতার রক্ত। এগুলো মায়ের। দুজনের রক্ত একত্রিত হয়ে বাইতুল মোকাদ্দাসের বালিতে শুকিয়ে যাচ্ছে…। আমর দরবেশ! আপনার শিরায় হাশেমের খুন প্রবাহিত হচ্ছে। আপনি সেই খুনের প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষান্ত হবেন না, যা বাইতুল মোকাদ্দাসের বালি চুষে নিয়েছে। ফিলিস্তিনের সম্ভ্রম আপনাকে ডাকছে। প্রথম কেবলাকে হৃদয় থেকে ফেলে দেবেন না হাশেমের পুত্র।
আমর দরবেশ ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দেন। কমান্ডোদেরও নিজ নিজ ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দিতে হলো। আশির এলোমেলো চুলগুলো আরো বিক্ষিপ্ত হয়ে বাতাসের তালে তালে আমর দরবেশের মুখের উপর উড়ছে।
আমর দরবেশ- এক কমান্ডো তার ঘোড়াটা আমর দরবেশের পাশে এনে বললো- সামনে কোনো চৌকি থেকে ঘোড়া বদল করে নেয়ার আশা নেই। ঘোড়াগুলোকে এভাবে মেরে ফেলো না। আরো ধীরে চলো।
আমর দরবেশ কমান্ডোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে মুচকি হাসেন। তিনি ঘোড়ার গতি কিছুটা হ্রাস করে বললেন- মহান আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। ঘোড়া ক্লান্ত হবে না ইনশাআল্লাহ।
আমর দরবেশের কথা বলার শব্দে আশির ঘুম ভেঙ্গে যায়। হঠাৎ চমকে উঠে খানিকটা ভয়জড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- আমি কতক্ষণ যাবত ঘুমিয়ে ছিলাম? আমার ঘোড়া কোথায়?
তুমি তো ঘোড়ার পিঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলে- আমর দরবেশ বললেন কিন্তু আমার ঘুমন্ত ঈমানের শিরা জেগে উঠেছিলো। ওঠো, নিজের ঘোড়ায় গিয়ে চড়ে বসো। সন্ধ্যা নাগাদ গন্তব্যে পৌঁছে যেতে হবে।
***
আলী বিন সুফিয়ান সেই গ্রামটিতে চলে যান, যাকে মুসলমানরা তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রভূমি বানিয়ে রেখেছিলো। তিনি তার কমান্ডোসেনা ও গুপ্তচরদের দায়িত্ব প্রদান করেন যে, তোমরা অঞ্চলময় ছড়িয়ে পড়ে আমর দরবেশের ভেল্কিবাজির রহস্য ফাঁস হওয়ার কথা প্রচার করে দাও। তিনি সেখানকার নেতৃবর্গকে বললেন, আপনারা লোকদের প্রস্তুত করুন।
