উপস্থিত লোকগুলো তাদের দিকে ছুটে আসার চেষ্টা করে। মশালের আলোতে কতগুলো তরবারীর চমক দেখা গেলো।
থামো- আলী বিন সুফিয়ান মধ্যখানে এসে দাঁড়িয়ে বললেন আল্লাহর আইন নিজেদের হাতে তুলে নিও না। যথাযথ কর্তৃপক্ষ এদের শাস্তির ব্যবস্থা করবেন। এদেরকে হেফাজতে নিয়ে যাও। আর আপনারা আমার সঙ্গে আসুন।
জনতা আলী বিন সুফিয়ানের পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করে। তিনি তাদেরকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে রওনা হন, যেখানে তার লোকেরা এক ব্যক্তিকে খুন করেছে এবং দুজনকে রশি দ্বারা বেঁধে রেখেছে।
***
আমর দরবেশ, আশি ও দুকমান্ডো বহু পথ এগিয়ে গেছেন। তারা সুদানের রাজধানী অভিমুখে এগিয়ে চলেছেন।
বন্ধুগণ!- আমর দরবেশ চলন্ত ঘোড়র উপর থেকে বললেন আমদেরকে খুব দ্রুত পৌঁছতে হবে। আশি, তুমি যদি ক্লান্ত হয়ে পড়ো, তাহলে আমার পেছনে এসে বসবে। সফর খুব দীর্ঘ এবং সময় খুবই অল্প। আমার ভয় হচ্ছে, কোনো শত্রু গোয়েন্দা আমাদের আগে পৌঁছে যায় কিনা।
একজন সুদানী গোয়েন্দাও রাজধানীর উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছে। সেই গোয়েন্দা, যে আলী বিন সুফিয়ানের হেফাজত থেকে পালিয়ে গিয়েছিলো। পেছন থেকে ধাওয়া হতে পারে এই ভয়ে সে একটি উপত্যকার পথ ধরে ছুটছে। একসময় উপত্যকা থেকে বেরিয়ে বহু পথ ঘুরে রাজধানীর পথ ধরে। এদিকে আমর দরবেশও বহুদূর চলে গেছেন।
সুদানী গোয়েন্দা কেন্দ্রকে সংবাদ পৌঁছাবে, আমর দরবেশের ভেদ ফাস হয়ে গেছে। রিপোর্টে আমর দরবেশের উপর সন্দেহও ব্যক্ত করবে বলে তার সিদ্ধান্ত। তার উদ্দেশ্য আমর দরবেশকে পুনরায় কয়েদখানায় আবদ্ধ করানো।
অপরদিকে আমর দরবেশের পরিকল্পনা হচ্ছে, তার আগে পৌঁছে গিয়ে সুদানী সালারকে ধোঁকা দেয়া এবং ইসহাককে মুক্ত করে আনা। আশি এই পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত এবং সে সাক্ষী হিসেবে সঙ্গে যাচ্ছে।
প্রদীপের আলোতে জনতা পাহাড়ের উপর আরোহন করছে। আলী বিন সুফিয়ান সকলের সামনে হাঁটছেন। তার লোকেরা পাহাড়ের চূড়ায় দুজন গুপ্তচরকে বেঁধে রেখেছে। তারা দেখতে পাচ্ছে, কয়েকটি প্রদীপ এবং কতগুলো লোক পাহাড়ে আরোহন করছে। তারা বাতি উপরে তুলে ধরে দেখার চেষ্টা করে লোকগুলো কারা এবং তাদের গন্তব্য কোথায়।
আমাদের সঙ্গে চলো- হ্যান্ডকাপ পরিহিত এক ব্যক্তি বললো- যা চাইবে তাই দেবো, আমাদেরকে ছেড়ে দাও।
তোমরা কি সকল মুসলমানকে ঈমান-বিক্রেতা মনে করো?- আলী বিন সুফিয়ান এক কমান্ডোকে বললেন- দুনিয়ার সম্পদ আর জাহান্নামের আগুনের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। তোমরা স্বজাতিকে ধোকা দিয়েছিলে।
তিনি আসছেন- অপর কয়েদী বললো- তিনি আমাদেরকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলবেন। আমাদেরকে অতি নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে। বলো, কী দেবো। ছেড়ে দাও, আমরা পাহাড়ের অপরদিক দিয়ে পালিয়ে যাই। হিরা-জহরত দেবো, যতো চাও ততো দেবো।
প্রদীপগুলো যতোটুকু উপরে উঠছে, কয়েদীদের অস্থিরতা ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছে। একজন বললো- তোমার সঙ্গে তো তরবারী আছে। তা দ্বারা এক আঘাতে আমাদের ঘাড় দ্বিখণ্ডিত করে দাও। আমাদেরকে ঐ লোকগুলো থেকে রক্ষা করো।
আল্লাহর নিকট গুনাহর মাফ চাও।
প্রদীপগুলো তাদের মাথার উপর এসে দাঁড়িয়ে যায়। আলী বিন সুফিয়ান, জনতাকে দূরে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। দুজন লোককে রশিতে বাধা দেখে লোকগুলো বিস্মিত হয়ে যায়।
এরাই হলো তূর পর্বতের জালওয়া প্রদর্শনকারী- বলে আলী বিন সুফিয়ান মাটিতে চোখ বুলান। একদিকে বাতিটা ইশারা করে বললেন- এই দেখো, এখানে দাহ্য পদার্থ পড়ে আছে। তার পার্শ্বেই পড়ে আছে একটি থালা। আলী বিন সুফিয়ান বললেন- এই থালায় সেই তেল ছিলো, যা দ্বারা কাপড়ে আগুন ধরানো হতো। এ তেল এখানে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমি চার ব্যক্তিকে সন্ধ্যায় এখানে লুকিয়ে রেখেছিলাম। আমর দরবেশের প্রদীপের সংকেতে এই বাতি থেকে তেলে আগুন ধরিয়ে দেয়ার কথা ছিলো। এটিই সেই ভূরের জালওয়া, যা তোমরা দেখতে পারেনি। কারণ, আমার লোকেরা আগুন জ্বালানোর আগেই এদেরকে পাকড়াও করে ফেলে।
এরা তিনজন ছিলো- এক ব্যক্তি বললো- তৃতীয়জন আমাদের মোকাবেলা করেছিলো। তার লাশ গাছের গোড়ায় পড়ে আছে।
আলী বিন সুফিয়ান প্রদীপের আগুন তেলের কাছে নিয়ে বললেন- এই দেখেন। অমনি তেলে আগুন জ্বলে ওঠে। আগুনের শিখা উপরে ওঠে পরক্ষণেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করে। আলী বললেন- এরপর কি সন্দেহের কোনো অবকাশ আছে যে, আপনাদেরকে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অগ্নিপূজারী বানানোর চেষ্টা চলছিলো?
আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন- বন্দীদের একজন বললো- আপনি ঠিকই বলেছেন।
তোমরা কি এই অঞ্চলের মুসলমান নও? আলী জিজ্ঞেস করেন।
হা। দুজনই মাথা নাড়ায়।
খৃস্টান ও সুদানী কাফেররা কি তোমাদেরকে এ কাজের প্রশিক্ষণ দেয়নি।
হ্যাঁ, তারাই দিয়েছে। আমরা কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত। আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন।
তোমরা কি স্বজাতিকে ধোকা দেয়া এবং নিজ ধর্মকে ধ্বংস করার জন্য পুরস্কার লাভ করতে না?
হা- একজন জবাব দেয়- এর বিনিময়ে আমরা বড় অংকের পুরস্কার পেতাম।
আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন- একজন বললো- আমরা আমাদের জাতি ও ধর্মের জন্য জীবন বিলিয়ে দেবো।
সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ পেছন থেকে এক তজোদীপ্ত মুসলমান তরবারী দ্বারা এতো তীব্রবেগে আঘাত হানে যে, একসঙ্গে দুজনের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
