আমর দরবেশ আশির অতীত ইতিবৃত্ত শুনিয়ে বললেন- আমার আশা ছিলো না যে, আমি লক্ষ্য অর্জনে সফল হবো। আমি বেজায় অস্থির হয়ে পড়ি। আমাদের মুসলমান ভাইয়েরা এততাই সরলমনা ও আবেগপ্রবণ যে, তারা আমার বক্তব্য ও ভেল্কিবাজিতে প্রভাবিত হতে শুরু করে। আমি কী করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমি প্রতিটি মুহূর্ত সুদানী গুপ্তচরদের চোখে চোখে অতিবাহিত করেছি। আল্লাহ আমার নিয়তের কদর করেছেন। আপনাকে প্রেরণ করে তিনি ধ্বংসের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করেছেন। বাকি কথা পরে হবে। আমি ইসহাককে মুক্ত করতে চাই। আপনি আমাকে দুজন সাহসী ও বিচক্ষণ কমান্ডোসেনা দিন।
আমর দরবেশ আলী বিন সুফিয়ানকে তার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করেন। আলী বিন সুফিয়ান ভেবে-চিন্তে পরিকল্পনায় কিছু রদবদল করে তাকে বললেন- তুমি দুজন কমান্ডো ও আশিকে নিয়ে এখনই রওনা হয়ে যাও এবং ইসহাককে মুক্ত করে আনো। আমি তোকগুলোকে পাহাড়ে নিয়ে দেখিয়ে আনি, তূর পর্বতের জালওয়ার হাকীকত কী ছিলো।
আমর দরবেশ দুজন কমান্ডো ও আশিকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে রওনা হয়ে যান।
***
তারা তাঁবুর পেছন দিকে দিয়ে চুপিসারে বেরিয়ে যায়। আলী বিন সুফিয়ান তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে আসেন। জনতা চরম বিস্ময় ও হতাশার মধ্যে দলবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কানাঘুষা করছে। আলী বিন সুফিয়ান উচ্চকণ্ঠে বললেন- আপনারা যদি তূর পর্বতের জালওয়ার হাকীকত দেখতে চান, তাহলে আমার সঙ্গে আসুন। আপনারা জানেন, রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর পর নবুওতের ধারা শেষ হয়ে গেছে। তার পরে আল্লাহ না কাউকে কখনো জালওয়া কিংবা মোজেযা দেখিয়েছেন, না দেখাবেন। ঐ লোকটিকে আপনাদের আকীদা নষ্ট করার জন্য প্রেরণ করা হয়েছিলো। আপনারা ভেবে দেখেননি, লোকটি কেবল একটি কথাই বলতো যে, তোমরা সুদানের ফৌজকে সবসময় এই এলাকা থেকে দূরে রেখেছে। তারা এবার আপনাদের হৃদয় জয় করার জন্য এই অস্ত্রটা ব্যবহার করেছে।
আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মুসলমানগণ! দুশমন যখন এ জাতীয় হীন অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, তখন বুঝতে হবে, তারা ময়দানে আপনাদের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। আপনারা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই ভূখণ্ড আপনাদের। এখানে ইসলামের শাসন চলছে। কাফেররা আপনাদের অন্তর থেকে জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনা নিঃশেষ করার লক্ষ্যে মাঠে নেমেছে। আজ আপনাদেরকে তুর পর্বতের জালওয়া দেখানো হচ্ছে। কাল খৃস্টান মেয়েদের রূপ দেখিয়ে আপনাদের মাঝে নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতার জন্ম দেবে। আপনাদেরকে মানুষ থেকে পশুতে পরিণত করবে। তারপর টেরও পাবেন না, আপনারা ইজ্জত, আত্মমর্যাদাবোধ ও জাতীয় চেতনা থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয়ে গেছেন। আপনারা কাফিরদের গোলামে পরিণত হয়ে যাবেন। সুদানের রাজা মুসলমান নন- তিনি ইসলামের শত্রু ও খৃস্টানদের বন্ধু। আচ্ছা, আপনাদের মেয়েরা খৃস্টান পুরষদের সঙ্গে মদপান করুক, অপকর্মে লিপ্ত হোক, তা কি আপনারা মেনে নেবেন? আপনারা কি মেনে নেবেন যে, আপনাদের মসজিদগুলো বিরান হয়ে যাক এবং কুরআনের অবমাননা করা হোক?
কাবার প্রভুর শপথ! আমরা এমনটা চাই না- এক ব্যক্তি বললো- ঐ : লোকটাকে আমাদের সামনে নিয়ে আসুন, যে নিজেকে খোদার দূত বলে দাবি করছে। বেটা গেল কোথায়?
না, সে নির্দোষ- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- সে আপনাদেরই একজন। এখন সে তার আসল রূপে আপনাদের সম্মুখে আসবে এবং আপনাদের অবহিত করবে, কাফেররা কিভাবে আপনাদের শিকড় কাটছে। এখন আপনারা আমার কথা শুনুন। আপনারা মুসলমান। আল্লাহ আপনাদেরকে সুউচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। আর কাফেররা আপনাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়।
আপনি কে?- এক ব্যক্তি উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করে- আপনার বক্তব্যে পাণ্ডিত্য আছে। আপনি কি বলতে পারেন, আমাদেরকে যা কিছু দেখানো হয়েছিলো, সেগুলো আসলে কি?
সেই রহস্য দেখাচ্ছি- বলেই আলী বিন সুফিয়ান তাঁবুর ভেতর থেকে একটি থালা নিয়ে আসেন, যার মধ্যে তেলের ন্যায় তরল দাহ্য পদার্থ আছে। তিনি তেলগুলো একটি কাপড়ের উপর ঢেলে কাপড়টা মাটিতে রেখে দেন। পরে তাতে পানি ঢেলে দিয়ে প্রদীপটা কাপড়ের সঙ্গে লাগান। সঙ্গে সঙ্গে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। তিনি সকলকে অবহিত করেন, আমর দরবেশ যে কাপড়টিতে পানি ঢেলে আগুন ধরাতো, সেটিতে এই তেল মাখানো থাকতো।
এবার আপনারা সেই লোকগুলোকে দেখুন, যারা তার সঙ্গী ছিলো আলী বিন সুফিয়ান বললেন। তিনি কাউকে আওয়াজ দিয়ে বললেন ওদেরকে জনতার সামনে নিয়ে আসো।
আমর দরবেশের দলের লোকগুলোকে ধরে জনতার ভিড় থেকে কিছু দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিলো। আলী বিন সুফিয়ানের কমান্ডোরা তাদেরকে ঘিরে রেখেছে। হঠাৎ হৈ চৈ শুরু হয়ে যায়। ঘোড়ার দৌড়ের আওয়াজ পাওয়া গেলো। এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলে উঠলো- একজন পালিয়ে গেছে।
এক গোয়েন্দা পালিয়ে গেছে। অন্যদেরকে জনতার আদালতে হাজির করা হলো। প্রদীপ উঁচু করে সকলকে তাদের চেহারা দেখানো হলো।
এরা মুসলমান- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- এই অঞ্চলের বাসিন্দা। এরা ঈমান বিক্রেতা।
আলী বিন সুফিয়ান এদের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করে বক্তব্য রাখেন।
এদেরকে মেরে ফেলা হোক- জনতার মধ্য থেকে কয়েকজন সমস্বরে বলে উঠলো- পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হোক।
