আমি যাবো না- আশি মুচকি হেসে বললো- এই হিংস্র ও জংলীদের ব্যাপারে আমার কোনো ভয় নেই।
তুমি কি পাগল হয়ে গেছে?
আমি পাগল ছিলাম- আশি বললো- এখন আমার মাথা ঠিক হয়েছে। আমি এখন সেখানেই যাবো যেখানে আমর দরবেশ যেতে বলে।
বাইরে আলী বিন সুফিয়ান ও যুবক ইমাম জনতাকে বলছেন- আসো, তোমাদেরকে সেই স্থানে নিয়ে যাবো, যেখান থেকে তূর পর্বতের জালওয়া দেখা যাওয়ার কথা ছিলো। গত রাতে তোমাদেরকে যে জালওয়া দেখানো হয়েছিলো, তার রহস্য দেখাবো।
আলী বিন সুফিয়ানের কমান্ডাররা তিন ব্যক্তিকে এমনভাবে ধরে ফেলে যে- কেউ টেরই পেলো না। পাজরে খঞ্জরের আগা ঠেকিয়ে তাদেরকে অন্ধকারে নিয়ে আটক করে রাখা হয়েছে। আমর দরবেশ এখনো ওখানেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে আছেন।
***
তাঁবুর ভেতর এক সুদানী গুপ্তচর আশিকে বাঁচানোর জন্য তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। লোকটি এই ভেবে বিস্মিত যে, মেয়েটি যেতে চাচ্ছে না কেন! সে বারংবার বলছে, মুসলমান জংলী ও পশু চরিত্রের মানুষ।
আশি বললো- তুমি মুসলমান, আমিও মুসলমান। আমি আমার স্বজাতিকে ছেড়ে যাবো না।
বাইরে হট্টগোল বেড়ে চলেছে। তাঁবুর ভেতরের লোকটি লম্বা একটি খঞ্জর বের করে আশিকে হত্যা করার হুমকি দিয়ে সঙ্গে যেতে চাপ সৃষ্টি করছে। আশিরও তরবারী আছে। অস্ত্রটা রাখা আছে এমন জায়গায়, যেখান থেকে ঝটপট নিয়ে নেয়া যায়। আমর দরবেশ তাকে প্রতি মুহূর্তে অস্ত্র প্রস্তুত রাখতে বলে রেখেছেন। আশি মুহূর্ত মধ্যে তরবারীটা হাতে নিয়ে বললো আমরা দুজনের একজনও তোমাদের সঙ্গে যাবো না।
একজন পুরুষের জন্য এ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ যে, একটি নারী তাকে হুমকি দিচ্ছে। সে বুঝে ফেলেছে, সমস্যা একটা আছে এবং এই মূল্যবান মেয়েটা তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় মেয়েটিকে হত্যা করা কিংবা তুলে নিয়ে যাওয়া আবশ্যক। আশি যে তরবারী চালাতে জানে, এ ধারণা সুদানী গুপ্তচরের ছিলো না। অগত্যা সে মেয়েটির উপর খঞ্জরের আঘাত হানে। আশি তরবারী দ্বারা তার আঘাত প্রতিহত করে। সুদানী গোয়েন্দার হাত থেকে খঞ্জরটা ছুটে পড়ে যায়। কিন্তু তাঁবুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে অস্ত্রটি তার নিকটেই এসে পড়ে। সে খঞ্জরটা তুলে নেয়। আশি তার উপর তরবারী দ্বারা আক্রমণ করে। গোয়েন্দা অভিজ্ঞ তরবারী চালক। আশির আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। আশি বললো- তুমি তরবারী চালনা যার কাছে শিখেছো, তিনি এ বিদ্যায় আমারও ওস্তাদ।
একদিকে সরে গিয়ে সে আশির আরো একটি আক্রমণ প্রতিহত করে এবং নিজেকে সামলে নিতে না নিতেই আশির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তার কব্জি চেপে ধরে বললো- আশি! আমি তোমাকে খুন করবো না। তুমি আত্মসংবরণ করো।
আশি ঝট করে তার নাকে একটা সঝোরে ঘুষি মারে। লোকটি পেছনে ছিটকে পড়লে তরবারীর আঘাতে হাতের খঞ্জরটা তাঁর পুনরায় পড়ে যায়। আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পেছন দিকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তাঁবু তাকে ঠেকিয়ে দেয়। এখন আশির তরবারীর আগা সুদানী গোয়েন্দার ধমনীর উপর।
আমি মুসলিম পিতার কন্যা- তরবারীর আগাটা ধমনীর উপর চাপ দিয়ে আশি বললো- বসে পড়ে। হাত পেছনে নিয়ে যাও। আমার শক্তি হলো আমার ঈমান। আমি এখন আর কারো ক্রীড়নক নই।
বাইরের চিত্র নিম্নরূপ–
আলী বিন সুফিয়ান একটি প্রদীপ হাতে তুলে নেন। অপরটি হাতে নেন যুবক ইমাম। চার-পাঁচজন কমান্ডোসেনা আমর দরবেশকে ঘিরে রেখেছে। আসামী হিসেবে বন্দী করা নয়- তাকে নিরাপত্তার জন্য আশ্রয়ে দিয়েছে। আশংকা হলো, যেসব সুদানী গুপ্তচর তাকে চোখে চোখে রেখেছিলো, তারা তাকে হত্যা করে ফেলতে পারে। তবে যতটুকু মনে হচ্ছে, তাদের একজনও মুক্ত নেই। কাজটা আলী বিন সুফিয়ানের পরিকল্পনা মোতাবেক সম্পাদিত হয়েছে।
আমর দরবেশ এক কমান্ডোকে বললেন- তাবুতে একটি মেয়ে আছে। তাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। মেয়েটি মুসলমান।
তাঁবুতে গিয়ে দেখা গেলো সেখানে অন্যরকম এক দৃশ্য বিরাজ করছে। আশি তরবারীর আগায় এক ব্যক্তিকে বসিয়ে রেখেছে। লোকটাকে গ্রেফতার করা হলো। আলী বিন সুফিয়ান আমর দরবেশকে বললেন- আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার লোকেরা ঐ পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে এবং তারাই সেখান থেকে আগুন জ্বালাবার চেষ্টা প্রতিহত করেছে। ভালো হবে, যদি জনতাকে এখনই সেখানে নিয়ে দেখানো হয় তূর পর্বতের জালওয়া কিভাবে সৃষ্টি করা হয়, তাহলে তারা স্পষ্ট বুঝতে পারবে, তাদেরকে যা দেখানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভেল্কিবাজি।
আরো একটি বিষয় আছে, সেদিকে এখনই দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক- আমর দরবেশ বললেন- ইসহাককে কয়েদখানা থেকে মুক্ত করতে হবে। এই অঞ্চলে সুদানীদের অনেক গুপ্তচর আছে। তাদের কেউ না কেউ এখানকার পরিস্থিতির আকস্মিক ও অনাকাঙ্খিত পরিবর্তন সম্পর্কে সরকার ও সেনাবাহিনীকে তথ্য দেবে। তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তারা ইসহাককে কয়েদখানার পাতাল কক্ষে নিক্ষেপ করে নিপীড়ন করে মেরে ফেলবে। আমি সুদানী সালারকে ধোঁকা দিয়ে এসেছি যে, আমি এখানকার মুসলমানদের চিন্তাধারা বদলে দেবো। কয়েদখানায় আমি ইসহাকের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাকে বলে এসেছি, আমি সুদানীদের প্রস্তাব মেনে নিয়ে নিজ এলাকায় গিয়ে দিনকয়েক তাদের মর্জিমাফিক কাজ করবো। আমার ইচ্ছা ছিলো, এখানে এসে আমি লোকদেরকে আমার আসল উদ্দেশ্যের কথা বলে দেবো এবং কায়রোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ইসহাককে মুক্ত করে আনার ব্যবস্থা করবো। কিন্তু এখানে এসে আমি বুঝতে পারি যে, বহু সুদানী গুপ্তচর- যারা আমারই অঞ্চলের মানুষ আমার চারদিকে ঘোরাফেরা করছে এবং আমি স্বাধীন নই। তবে ভাগ্য ভালো যে, শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হলো, আমার সঙ্গে দেয়া এই মেয়েটি মুসলমান।
