আমি এই লাঞ্ছনার জীবন হতে মুক্ত হতে চাই- আশি বললো আমাকে তোমার সহযোগিতা ও আশ্রয় প্রয়োজন। পরে যা হবে, সময়মত দেখা যাবে। আমি তোমার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবো না।
আমি যদি বেঁচে থাকি, তোমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও আশ্রয় দেবো।
আচ্ছা, লোকটা গেলো কোথায়?- আমর দরবেশের এক গোয়েন্দার কণ্ঠ। আমর দরবেশের তাবু থেকে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে আলী বিন সুফিয়ান সম্পর্কে ভাবছে সে। হতে পারে, আমর দরবেশ তার হৃদয়টা কজা করার পরিবর্তে নিজের হৃদয়টাই তার কজায় তুলে দিয়েছে। এখন আমাকে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে। আমাকে তো আমর দরবেশের উপর ভরসা রাখতে নিষেধ করা হয়েছিলো।
লম্বা দাড়িওয়ালা লোকটা আগুনের ভেদ জেনে গেছে- অপর একজন বললো- এখন দেখতে হবে, আমর দরবেশ তার কাছে হার মেনেছে, নাকি সে আমরের কাছে হার মেনেছে।
যদি কোন ষড়যন্ত্র থাকে আর আশি তাতে জড়িত থাকে, তাহলে সিদ্ধান্ত স্পষ্ট, তাকে খুন করে ফেলতে হবে। একজন বললো।
এমন মূল্যবান সম্পদটাকে এভাবে নষ্ট করে ফেলবে?- অন্য একজন বললো- ওকে তুলে নিয়ে যেতে হবে এবং উচ্চমূল্যের বিনিময়ে কোনো বিত্তশালী লোকের কাছে বিক্রি করে ফেলতে হবে। ওখানে গিয়ে বলবো, আশিকে খুন করে দাফন করে রেখেছি।
তিন গোয়েন্দা পরস্পর এমনভাবে চোখাচোখি করে যেন এ প্রস্তাবে তারা সবাই একমত। একজন বললো- আজ রাতে আমাদেরকে তুর পর্বতের জালওয়া দেখাতে হবে। তখন দেখবো, আমর দরবেশ কিংবা ঐ লোকটির মতলব কী? রাতে আমাদের একজনকে আশির সঙ্গে সঙ্গে থাকতে হবে। মেয়েটি যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। আমর দরবেশ ও আশিকে রাতে কে কে পাহারা দেবে তারা ঠিক করে নেয়।
***
চারজনই যথেষ্ট- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- আমি আমর দরবেশের সঙ্গে থাকবে। যে তিন-চারজন লোক আমর দরবেশের পক্ষে কথা বলছিলো, তাদেরকে তো তোমরা চিনে রেখেছে। তারা তোমাদেরই এলাকার সেইসব মুসলমান, যারা সুদানীদের জন্য কাজ করছে। আমর দরবেশ তাদের সম্পর্কেই বলেছে যে, সে খুনী চক্রের বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ। তাদের প্রতি নজর রাখবে। প্রয়োজন হলে শেষ করে দেবে। তবে জীবিত ধরে ফেলতে পারলে ভালো হবে।
আলী বিন সুফিয়ান একটি মসজিদে উপবিষ্ট। যুবক ইমাম এ মসজিদেরই ইমাম। আলী বিন সুফিয়ানের মুখোশ খুলে রেখে দিলেন। তিনি নিজের লোকদেরকে রাত যাপনের জন্য মসজিদের বিভিন্ন কাজে জুড়ে দিয়ে বলছিলেন- আমার সন্দেহ ছিলো। কিন্তু লোকটা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। আমি আশা করি রাতের মিশনেও আমরা সফল হবো।
সূর্য অস্ত্র যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত। আমর দরবেশ আলী বিন সুফিয়ানকে যে পাহাড়টি দেখিয়েছিলেন, এক ব্যক্তি তার উপর আরোহণ করছে। এমন সতর্কতার সাথে আরোহন করছে, যেনো কেউ দেখতে না পায়। তার ঠিক বিপরীত দিক দিয়ে নুয়ে নুয়ে তারই ন্যায় সন্তর্পনে চড়ছে অপর দুব্যক্তি। আরেক দিক থেকে উঠছে অন্য একজন। প্রথম ব্যক্তি চূড়ায় উঠে হামাগুড়ি দিয়ে বড় একটি গাছের নিকট পৌঁছে যায় এবং এদিক-ওদিক তাকিয়ে গাছটিতে চড়তে শুরু করে। দুজন বৃহৎ একটি পাথরের পেছনে বসে পড়ে। এই জায়গাটা বৃক্ষ থেকে বেশি দূরে নয়। চতুর্থ ব্যক্তিও উপরে উঠে যায় এবং উপযুক্ত এক স্থানে লুকিয়ে যায়। প্রথম ব্যক্তি গাছে চড়ে মোটা একটি ডালের উপর যুৎসইভাবে বসে থাকে। গাছের ডাল ও পাতা এতো ঘন যে, নীচ থেকে লোকটাকে দেখা যাচ্ছে না। খানিক পর সে অনুচ্চ কণ্ঠে পাখির
সূর্যটা পাহাড়ের আড়ালে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে। আরো তিনজন একসঙ্গে পাহাড়ে আরোহন করছে। তাদের সঙ্গে আগুন জ্বালাবার উপকরণ ও একটি মাটির পাত্রে দাহ্য পদার্থ। প্রত্যেকের সঙ্গে লম্বা খঞ্জর।
সাঝের আলো-আঁধারি গাঢ় হতে চলেছে। এই তিন ব্যক্তির ভাবভঙ্গী এমন যেনো কোনো দিক থেকে তাদের কোনো শংকা নেই। তারা কথা বলতে বলতে যাচ্ছে। তাদের কথাবার্তা আগে থেকে লুকিয়ে থাকা চার ব্যক্তি শুনতে পাচ্ছে। তারা সম্পূর্ণরূপে লুকিয়ে আছে। সেখান থেকে বেশ দূরে নীচে আমর দরবেশের আস্তানা। সাঝের আঁধারে আস্তানাটি দেখা যাচ্ছে না। শুধু তাঁবুর বাইরে পুঁতে রাখা দুটি প্রদীপের আলো দেখা যাচ্ছে।
খোদার দূত প্রস্তুত হয়ে গেছেন- এ তিন ব্যক্তির একজন হেসে বললো মাল-মসলা বের করে প্রস্তুত রাখো।
আজ আমার কেনো যেনো ভয় লাগছে– অন্য একজন বললো- কোনো অঘটন ঘটে যায় কিনা বলা যাচ্ছে না।
যে লোকটি চোখে সবুজ পট্টি বেঁধে এসেছিলো, তার জন্য আমার কেমন কেমন লাগছে- তৃতীয়জন বললো- কিন্তু যাক গে, ভয় পেয়ে লাত নেই। আমরা তুর পর্বতের জালওয়া দেখিয়ে সকলের সংশয়-সন্দেহ মুছে ফেলবো। সবাই মেনে নিলে একজনের বিরোধিতায় কিছু আসে-যায় না। তোমরা যার যার দায়িত্ব পালন করো। সময় বেশী নেই। অন্ধকার গাছ হয়ে আসছে।
একজন পাত্রের মুখ খুলে তেলের ন্যায় একটা তরল পদার্থ মাটিতে ঢেলে দেয়। জায়গাটা পাথুরে বিধায় এ পদার্থটা চুষে খায়নি। সেখান থেকে সামান্য দূরে সরে গিয়ে একজন ছোট একটি বাতি জ্বালিয়ে বড় বড় পাথরের মাঝে রেখে দেয়, যাতে দূর থেকে সেটি দেখা না যায়। তার আলোতে এই তিনজনকেও দেখা যাচ্ছে।
এবার ওদিকে প্রদীপের প্রতি দৃষ্টি রাখো- এক ব্যক্তি বললো- যখনই প্রদীপটি উপর-নীচ নড়তে শুরু করবে, তখন বাতিটি তেলের উপর ছুঁড়ে মারবে। জনতা তূর পর্বতের জালওয়া দেখতে পাবে।
