আমর অস্থির চিত্তে এদিক-ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন- আমি তোমাকে কিভাবে বিশ্বাস করবো?
আমার দাড়িতে হাত বুলাও- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- কৃত্রিম। ঈমান বিক্রি করে যে মূল্য আদায় করেছে, তার চেয়ে দ্বিগুণ দেবো। এই ভেল্কিবাজি বন্ধ করো। আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবো।
আমি ঘাতকদের দ্বারা অবরুদ্ধ। আমর দরবেশ বললেন।
আমাকে অমান্য করলেও খুন হয়ে যাবে- আলী বিন সুফিয়ান বললেন এখানে আমাদের বহু মানুষ আছে। তোমার সঙ্গে কজন আছে?
আমি জানি না- আমর দরবেশ বললেন- আপনার নাম কী?
বলা যাবে না- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- আমি যা যা জিজ্ঞেস করছি, জবাব দাও। তুরের জালওয়া কী? সত্য সত্য বলে। তোমার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার।
উঠবার সময় ডানে-বাঁয়ে দেখে নেবেন- আমর দরবেশ বললেন- উঁচু পাহাড়টির সামনে উঁচু একটি টিলা আছে। বিশাল একটি গাছ আছে। সন্ধ্যার সামান্য পরে ওখানে দু-চারজন লোক লুকিয়ে রাখুন। যেভাবে পানিতে আগুন লাগানোর রহস্য জেনেছেন, তেমনি তুরের জালওয়ার ভেদও জেনে যাবেন। আমাকে এই তামাশাটা দেখানোর সুযোগ দিন। আপনি সেখান থেকে শিখা উঠতে দেবেন না। আমার পলায়ন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনার। ইসহাককে কয়েদখানা থেকে মুক্ত করে আনতে হবে। উঠুন, ঘোষণা করে দিন, রাতে তুর পর্বতের জালওয়া দেখানো হবে।
আলী বিন সুফিয়ানের স্থলে অন্য কেউ হলে আমর দরবেশের এই অসম্পূর্ণ বক্তব্য বুঝতেন না। তিনি তো এই ময়দানের একজন দক্ষ খেলোয়াড়। ইশারায় অনেক কিছু বুঝবার যোগ্যতা তার আছে। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন- খোদার এই দূত আজ রাতে তূর পর্বতের জালওয়া দেখাবেন। আমি তার বুযুর্গীর প্রমাণ পেয়েছি। আপনারা এখন চলে যান। সন্ধ্যার পর আবার আসবেন।
আলী বিন সুফিয়ান উঠে চলে যান। জনতা তাকে ঘিরে ধরে। জিজ্ঞাসা করে, হযরতের সঙ্গে আপনার কী কথা হয়েছে? তিনি উচ্চস্বরে বললেন মহান মানুষটির বুকে একটি পয়গাম ও একটি ভেদ আছে। তার সঙ্গে কথা বলে আমি আমার সন্দেহ দূর করেছি। রাতে এসে আপনারা অবশ্যই তাঁর মোজেযা দেখবেন।
একজন আমর দরবেশের কাছে গিয়ে বসে এবং জিজ্ঞেস করে, লোকটার সঙ্গে আপনার কী কথা হয়েছে? আমর দরবেশ বললেন- আমি তাকে ভক্ত বানিয়ে ছেড়েছি।
কিন্তু লোকটা কে?- আমর দরবেশ মুচকি হেসে বললেন- আজ রাতই আমি তার অবশিষ্ট সব সন্দেহ দূর করে দেবো।
লোকটা যদি রাতে আবার আসে, তাকে খুন করে ফেলবো। অপর একজন বললো।
এখনই নয়- আমর দরবেশ বললেন- ফল উল্টোও হতে পারে। যদি রাতে সে আমার কাছে আসে, তাহলে তাঁবুতে এনে আমার নিকটে বসাবো আর তোমরা বেঁধে তাকে তুলে নিয়ে যাবে।
আমরা তার পিছু নিচ্ছি- তৃতীয় একজন বললো- একে নজরে রাখতে হবে।
দুব্যক্তি উঠে বিদায়ী জনতার সঙ্গে গিয়ে মিশে যায়। তারা আলী বিন সুফিয়ানকে খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু তিনি জনতার মাঝে নেই। অনেককে জিজ্ঞেস করেও তারা সন্ধান পেলো না, লম্বা দাড়িওয়ালা চোখে পট্টিবাধা লোকটি কোথায়।
আলী বিন সুফিয়ান ঘোড়ায় চড়ে অতক্ষণে বহু দূরে চলে গেছেন।
***
তাঁবুতে এখন আমর দরবেশের সঙ্গে আশি ছাড়া আর কেউ নেই। আশি জিজ্ঞেস করে- লোকটি আসলে কে ছিলো? তোমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বললো, যেনো সে তোমার এবং তোমার ছদ্মরূপ সম্পর্কে অবগত।
শোনো আশি!- আমর দরবেশ বললেন- আজ রাতে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। আমি বলতে পারছি না, কী ঘটবে? লোকটাকে আমি চিনতে পারিনি। সে নিজের পরিচয় দেয়নি। কিন্তু সে অসাধারণ কোনো মানুষ নয়। আজ রাতে পালাবার সুযোগও পেয়ে যেতে পারি, আবার খুনও হতে পারি। আজ ধাতেই তোমাকে প্রমাণ করতে হবে, তোমার শিরায় মুসলিম পিতার খুন বিদ্যমান। তুমি যদি ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করো, তাহলে আমার হাতেই তোমার জীবনের অবসান ঘটবে।
তুমি যদি আমাকে আরো খুলে বলো, কী ঘটবে এবং আমাকে কী করতে হবে, তাহলে আমি ভালভাবে তোমার সাহায্য করতে পারবো- আশি বললো- তোমার জন্য খুন হতেও আমি প্রস্তুত আছি। কিন্তু তাতে যদি তোমার লক্ষ্য অর্জিত না হয়, তাহলে আমার জীবনটাও বৃথা যাবে।
আচ্ছা, শোনো- আমর দরবেশ বললেন- আমাদের লোকদের কোনো কথা তুমি শুনবে না। তারা কখন কী পদক্ষেপ নিচ্ছে জেনে আমাকে অবহিত করার চেষ্টা করবে। রাতটায় কী যে ঘটবে, আমি ঠিক বলতে পারছি না। তুমি প্রস্তুত থাকবে।
তুমি একাধিকবার বলেছে, আমাকে তুমি বিশ্বাস করো না- আশি বললো- কিন্তু আমি এ কথা একবারও বলিনি। যাই হোক, তুমি যদি এখান থেকে মুক্তিলাভ করো, তাহলে আমাকে সঙ্গে করে নেবে কী?
যাবে তুমি?
না- আশি ব্যথিত অথচ প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে বললো- আমি মরে যাবো।
— তুমি রাজকন্যা আশি- আমর দরবেশ বললেন- আমার সঙ্গে গেলে তোমার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা তো আমি ভেবেই দেখিনি। নিশ্চয় বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোকে পছন্দ করবে না। আমি তোমাকে কায়রো নিয়ে যাবো। তোমাকে নিয়ে ভাববার মতো ওখানে ভালো ভালো মাথা আছে।
কেন আমাকে সঙ্গে রাখবে না? হঠাৎ চমকে উঠে আশি জিজ্ঞেস করে আমাকে তোমার বউ বানাবে না?
তোমার এই শর্ত আমি কবুল করবো না- আমর দরবেশ বললেন মানুষ বলবে, আমি যা করেছি, তোমাকে হাসিল করার জন্য করেছি। আমার গৃহ- যেখানে আমার স্ত্রী থাকে- তোমার যোগ্য নয় আশি। আমি সৈনিক। আমার ঘর হলো যুদ্ধের ময়দান। স্ত্রীর চেহারা দেখেছি তিন বছর হয়ে গেছে। যদি তুমি এই জন্য আমার স্ত্রী হতে চাও যে, আমি তোমার পছন্দের পুরুষ, তাহলে তুমি নিরাশ হবে। তোমার ভালোবাসা আর দোআ সেই তীরকে প্রতিহত করতে পারবে না, যেটি আমার বুকে বিদ্ধ হবে। তুমি তোমার মনোবা আমাকে বলে দাও।
