মাথায় খুন চেপে যায় মিসরীর। দাঁত কড়মড় করে বলে ওঠে, এ্যা, আমাদের শোনান হয়, সালাহুদ্দীন একজন পাক্কা ঈমানদার, এক্কেবারে ফেরেশতা। মদ-নারীর প্রতি নাকি তাঁর প্রচণ্ড ঘৃণা। আর তলে তলে করে বেড়াচ্ছেন এসব, না?”
এখন তোমরা আমাকে তার-ই কাছে নিয়ে যাচ্ছে। আমি যা বললাম, যদি তোমার বিশ্বাস না হয়ে থাকে, তাহলে রাতে দেখো, আমাকে কোথায় থাকতে হয়। তোমাদের সুলতান আমাকে কয়েদখানায় না রেখে রাখবেন তাঁর হেরেমে, সে কথা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। লোকটার কথা মনে পড়লে আমার গা শিউরে ওঠে। বললো মেয়েটি।
এ জাতীয় আরো অনেক কথা বলে মিসরী কমাণ্ডারের মনে সুলতান আইউবীর প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা সৃষ্টি করে মেয়েটি। মিসরী এখন সম্পূর্ণরূপে মেয়েটির হাতের মুঠোয়। সে তার মাথা কজা করে নিয়েছে। কিন্তু কমাণ্ডার জানেনা, এসব হলো গোয়েন্দা মেয়েদের অস্ত্র। সব শেষে মেয়েটি বললো–তুমি যদি আমাকে এ লাঞ্ছনার জীবন থেকে উদ্ধার করতে পারো, তাহলে আমি আজীবনের জন্য তোমার হয়ে যাবো এবং আমার পিতা বিপুল স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে তোমাকে পুরস্কৃত করবেন।
তার পন্থাও জানিয়ে দেয় মেয়েটি। বলে, তুমি আমার সঙ্গে সমুদ্র পার হয়ে পালিয়ে যাবে। নৌকার অভাব হবে না। আমার পিতা বড় ধনাঢ্য ব্যক্তি। আমি তোমাকে বিয়ে করে নেবো আর আমার পিতা তোমাকে উন্নত একটি বাড়ি ও বিপুল ধন-সম্পদ প্রদান করবেন। নির্বিঘ্নে ব্যবসা করে আমাকে নিয়ে সুখে জীবন কাটাতে পারবে।
মিসরীর মনে পড়ে যায়, সে মুসলমান। বললো, কিন্তু আমি তো আমার ধর্ম ত্যাগ করতে পারবো না। মেয়েটি কিছুক্ষণ মৌন থেকে ভেবে বললো ঠিক আছে, তোমার জন্য আমিই আমার ধর্ম বিসর্জন দেবো।
পলায়ন ও বিয়ের পরিকল্পনা তৈরী করে দুজনে। মেয়েটি বললো, তোমার উপর আমি কোন চাপ দিতে চাই না। ভালভাবে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নাও। আমি শুধু জানতে চাই, আমার মনে তোমার প্রতি যতটুকু ভালোবাসা সৃষ্টি হয়েছে, ততটুকু হৃদ্যতা আমার প্রতিও তোমার অন্তরে জেগেছে কি না। আমাকে বরণ করতে যদি তুমি প্রস্তুত হয়েই থাকো, তাহলে চেষ্টা করো, যেন কায়রো পৌঁছুতে আমাদের সফর দীর্ঘ হয়। ওখানে পৌঁছে গেলে তুমি আমার গন্ধও পাবে না।
মেয়েটির উদ্দেশ্য, সফর দীর্ঘ হোক এবং তিন দিনের স্থলে ছয়দিন পথেই কেটে যাক। তার কারণ, রবিন ও তার সঙ্গীরা পালাবার চেষ্টা করছে। রাতে ঘুমন্ত রক্ষীদেরকে তাদের-ই অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে তাদের-ই ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে পালাবার পরিকল্পনা নিয়ে সুযোগের সন্ধান করছে তারা। এতো মাত্র প্রথম মযিল, প্রথম অবস্থান। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সফর, যাতে ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে-চিন্তে কাজ করা যায়।
এ উদ্দেশ্য সাধনে-ই মেয়েটিকে ব্যবহার করছে তারা। মিসরী কমাণ্ডারকে হাত করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে তার উপর। মেয়েটি প্রথম সাক্ষাতেই ধরাশয়ী করে ফেলে মিসরী কমাণ্ডারকে।
মিসরী কমাণ্ডার তেমন ব্যক্তিত্ববান লোক নয়; একজন প্লাটুন কমাণ্ডার মাত্র। এমন সুন্দরী নারী স্বপ্নেও দেখেনি সে কখনো। অথচ এখন কিনা অনুপম এক অনিন্দ্যসুন্দরী যুবতী তার হাতের মুঠোয়। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় তার হাতে নিজেকে তুলে দিয়ে বসেছে মেয়েটি। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে কমাণ্ডার। ভুলে গেছে নিজের ধর্ম ও কর্তব্যের কথা। এখন সে ক্ষণিকের জন্যও মেয়েটি থেকে আলাদা হতে চাইছে না।
এ উন্মাদনার মধ্যে পরদিন ভোরবেলা কমাণ্ডার প্রথম আদেশ জারী করে, উট-ঘোড়াগুলো বেশ ক্লান্ত; কাজেই আজ আর সফর হবে না। রক্ষী ও উষ্ট্ৰচালকগণ এ ঘোষণায় বেশ আনন্দিত হয়। কারণ, রণক্ষেত্রে সীমাহীন পরিশ্রমে তাদেরও দেহ অবসন্ন। কায়রো পৌঁছবার কোন তাড়াও নেই তাদের।
বিশ্রাম ও গল্প-গুজবে কেটে যায় দিন। কমাণ্ডারও মেয়েটিকে নিয়ে উন্মাতাল। দিন গিয়ে রাত এলো। ঘুমিয়ে পড়লো সকলে। কমাণ্ডার মেয়েটিকে নিয়ে চলে গেল খানিকটা দূরে। সকলের দৃষ্টির আড়ালে মেয়েটি রঙ্গিন স্বপ্নের নীলাভ আকাশে পৌঁছিয়ে দিলো তাকে।
পরদিন তাঁবু তুলে যাত্রা করে কাফেলা। কিন্তু কমাণ্ডার সোজা রাস্তা ছেড়ে ধরে অন্য পথ। সঙ্গীদের বললো, এ পথে সামনে ছাউনি ফেলার জন্য বেশ মনোরম জায়গা আছে। একটি বসতিও আছে কাছে। ডিম-মুরগী পাওয়া যাবে। শুনে সঙ্গীদের আনন্দ আরো বেড়ে যায় যে, কমাণ্ডার আমাদের আয়েশের চিন্তা করছেন।
কিন্তু প্লাটুনের দুজন সৈনিক কমাণ্ডারের এসব আচরণের আপত্তি তোলে। তারা বলে, আমাদের সঙ্গে ভয়ঙ্কর কয়েদী। লোকগুলো শত্রুবাহিনীর গুপ্তচর। যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছিয়ে দেয়া প্রয়োজন। অযথা সফর দীর্ঘ করা ঠিক হচ্ছে না। কমাণ্ডার তাদের এই বলে থামিয়ে দিলো যে, সে দায়িত্ব আমার। গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছবো না বিলম্বে, সে তোমাদের ভাবতে হবে না। জবাবদিহি করতে হলে আমাকেই করতে হবে; তোমাদের এত মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। তারা কমাণ্ডারের জবাবে চুপসে যায়।
এগিয়ে চলছে কাফেলা। দুপুরের পর কাফেলা যেখানে পৌঁছে, সেখানে আশপাশে অসংখ্য শকুন উড়তে ও মাটিতে নামতে-উঠতে দেখে তারা। বুঝা গেলো, মৃত মানুষের লাশ আছে এখানে। চারদিকে মাটি ও বালির টিলা, বড় বড় বৃক্ষও আছে। টিলার ভেতরে ঢুকে পড়ে কাফেলা। ধীরে ধীরে উপর দিকে উঠে গেছে পথ। একটি উঁচু স্থান থেকে বিশাল এক ময়দান চোখে পড়ে তাদের। তার এক স্থানে বৃত্তাকারে উঠানামা করছে অনেকগুলো শকুন। শোরগোল করে কিসে যেন মেতে আছে শকুনগুলো । কিছুদূর অগ্রসর হলে চোখে পড়ে, সেখানে কতগুলো লাশ। পচা লাশের দুর্গন্ধে বিষিয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ।
