যুবক ইমাম আলী বিন সুফিয়ানকে চেনেন না। পরিচয় লাভ করার পর আমর দরবেশ কী কী ভেল্কি প্রদর্শন করেছেন এবং মুসলমান দর্শনার্থীরা কিভাবে প্রভাবিত হয়েছে, তিনি তার বিবরণ প্রদান করেন।
আমরা যদি এই ধারা বন্ধ না করি, তাহলে মুসলমান তাদের বোধ। বিশ্বাস থেকে সরে যাবে- ইমাম বললেন- তাদের আকীদা নষ্ট হয়ে যাবে। আমর দরবেশ নামক এই লোকটি আজ রাত সামনের গ্রামে যাবে এবং ভেল্কি দেখাবে।
তারা কিছুক্ষণ বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করেন। একজন আমর দরবেশকে হত্যা করার প্রস্তাব দেন। আলী বিন সুফিয়ান তাতে একমত হলেন না। তিনি আস্থা জ্ঞাপন করেন- আমর দরবেশকে হত্যা না করেই সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা যাবে এবং তারই মুখে বলানো যাবে, সে যে মোজেযা দেখিয়েছে, তা ছিলো ভেল্কিবাজি। যুক্তি উপস্থাপন করে তিনি বললেন–হত্যা করা হলে মানুষ তাকে আরো বেশি সত্যাশ্রয়ী ভাবতে শুরু করবে।
আলী বিন সুফিয়ানের সঙ্গে বণিকবেশে আরো যে তিন ব্যক্তি এসেছিলেন, তারা মিশরী ফৌজের অতিশয় বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞ লড়াকু গুপ্তচর। আলী বিন সুফিয়ান তাদেরকে বণিকের বেশে সঙ্গে নেন এবং নিজে মুখে লম্বা দাড়ি স্থাপন করেন ও এক চোখের উপর পট্টি বাঁধেন। নিজেরা ঘোড়ায় চড়ে আরো কয়েক ব্যক্তিকে উট-ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে পেছন পেছন আসার জন্য বললেন। সকলকে জরুরী নির্দেশনা প্রদান করে তিনি ইমামের সঙ্গে আমর দরবেশের আস্তানা অভিমুখে রওনা হন।
আমর দরবেশ ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে সকাল সকাল পরবর্তী আস্তানা অভিমুখে রওনা হয়ে গেছেন। তাঁর সঙ্গীরা স্থানীয় লোকদের পোশাকে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি অপর একটি গ্রামের সামান্য দূরে এক স্থানে যাত্রাবিরতি দেন এবং তবু স্থাপন করেন। অল্পক্ষণের মধ্যে তিনি ও আশি প্রস্তুত হয়ে যান। তাঁবুর সম্মুখে দুটি প্রদীপ জ্বালিয়ে গেড়ে দেয়া হলো। তার সঙ্গীরা গিয়ে এলাকাবাসীকে জানায়, তোমরা খোদার যে দূতের মোজেযার কথা শুনেছিলে, তিনি এখন তোমাদের মহল্লার অদূরে অবস্থান করছেন।
সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ছুটতে শুরু করে। একদিন আগে যারা আমর দরবেশকে দেখেছিলো, তারাও দূর-দূরান্ত থেকে এসে উপস্থিত হয়।
আমর দরবেশ প্রদীপ দুটোর মধ্যখানে ছোট্ট গালিচাটির উপর বসে পড়েন। আশি আগের দিনকার ন্যায় আকর্ষণীয় পোশাকে সজ্জিতা। আমর দরবেশের সম্মুখে একটি কাপড় ছড়িয়ে পড়ে আছে। তিনি সেইসব ভাবভঙ্গি ও আচার-আচরণ দেখাতে শুরু করেন, যা বিগত দিন দেখিয়েছিলেন। গতকাল তাকে যে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, এক ব্যক্তি এবারও সেই প্রশ্ন করেন। আমর দরবেশ একই ভঙ্গিতে একই জবাব প্রদান করেন। বললেন কারো কাছে পানি থাকলে এই কাপড়টির উপর ঢেলে দাও।
আলী বিন সুফিয়ান তাঁর দলবলসহ পৌঁছে গেছেন। তিনি আমর দরবেশকে চিনে ফেলেছেন। তার ভালভাবেই জানা আছে, এই লোকটি মিশরী ফৌজের এক ইউনিটের কমান্ডার ছিলো।
আলী বিন সুফিয়ানকে অবহিত করা হয়েছিলো, আমর দরবেশ পানিতে আগুন লাগাতে পারেন। কিন্তু পানিতে আগুন জ্বলে কিভাবে বিষয়টির রহস্য উদঘাটনের জন্য তিনি ক্ষুদ্র একটি মশকে করে কতটুকু পানি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। আমর দরবেশ যেই মাত্র বললেন, কারো নিকট পানি থাকলে এনে এই কাপড়টির উপর ঢেলে দাও, অমনি এক ব্যক্তি দ্রুতবেগে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। তার কাছে মশক ছিলো। সে কিছু পানি কাপড়টির উপর ঢেলে দেয়।
আলী বিন সুফিয়ান সামনে এগিয়ে যান। তিনি প্রদীপটি মাটি থেকে তুলে হাতে নিয়ে জনতাকে উদ্দেশ করে বললেন- তোমাদের মধ্য থেকে একজন এগিয়ে আসো। আলীর সঙ্গে আসা এক ব্যক্তি এগিয়ে আসে। আলী প্রদীপটি তার হাতে দিয়ে বললেন- এই কাপড়টায় আগুন ধরাও। লোকটি ইতস্তত করে। আলী বিন সুফিয়ান জনতার উদ্দেশে বললেন- তোমাদের যে কেউ পানিতে আগুন ধরাতে পারবে।
এগিয়ে আসা লোকটি প্রদীপটা কাপড়ের কাছে ধরামাত্রই কাপড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। এক ব্যক্তি- যে মূলত আমর দরবেশের সঙ্গী বলে উঠলো- নিশ্চয় তুমি জাদু জানো। সরে যাও এখান থেকে। অন্যথায় এই বুযুর্গের অভিশাপে শেষ হয়ে যাবে।
আমর দরবেশ বিস্মিত নয়নে চুপচাপ আলী বিন সুফিয়ানের প্রতি তাকিয়ে আছেন। আলী বিন সুফিয়ান নিজের কোমরবন্ধটা খুলে আমর দরবেশের সামনে রেখে তার উপর পানি ঢেলে দিয়ে বললেন- তুমি যদি খোদার দূতই হয়ে থাকো, এতে আগুন লাগাও দেখি। বলেই তিনি প্রদীপটা আমর দরবেশের দিকে এগিয়ে দেন। কিন্তু আমর দরবেশ তার মুখপানে তাকিয়েই আছেন।
জনতার মাঝে কানা-ঘুষা শুরু হয়ে গেছে। তারা আমর দরবেশের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করে। সবচেয়ে উঁচু ইমামের কণ্ঠ। আমর দরবেশের লোকেরা তার পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করে। উভয় পক্ষেরই বক্তারা গোয়েন্দা। সাধারণ মানুষ নির্বাক কিংবর্তব্যবিমূঢ়। এটিও একটি যুদ্ধ। হক-বাতিলের লড়াই। আলী বিন সুফিয়ান জনতাকে ওদিকে ব্যস্ত দেখে আমর দরবেশের সম্মুখে বসে পড়েন।
আমর দরবেশ! আলী ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন- ঈমান বিক্রি করে কতো মূল্য পেয়েছো?
তুমি কে? আমর দরবেশ জিজ্ঞেস করেন।
বহুদূর থেকে এসেছি- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- তোমার সুখ্যাতি শুনে সীমান্তের ওপার থেকে এসেছি।
