কাফেলা রাতভর চলতে থাকে। রাত পোহালে তারা উটগুলোকে পার্বত্য এলাকায় লুকিয়ে ফেলে। সীমান্ত এখন তাদের থেকে অনেক দূরে- পেছনে। সারাদিন তারা সেখানে লুকিয়ে অতিবাহিত করে।
রাতের অন্ধকার নেমে এলে কাফেলা পুনরায় চলতে শুরু করে এবং মধ্যরাত নাগাদ পার্বত্য এলাকায় ঢুকে পড়ে। এই এলাকাই কাফেলার গন্তব্য।
রাতের শেষ প্রহরে কাফেলা একটি গ্রামে প্রবেশ করে। দলনেতা একটি ঘরের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে দরজায় করাঘাত করেন। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে যায়। এক ব্যক্তি প্রদীপ হাতে বেরিয়ে আসে। দলনেতা তাকে কানে কানে কিছু বললেন। গৃহকর্তা খোশ আমদেদ বলে বললেন- আপনারা সবাই ভেতরে আসুন। উটগুলোকে আমরা সামলাবো।
চার ব্যবসায়ী ভেতরে ঢুকে পড়ে। মেজবান তার ঘরের লোকদেরকে এবং আরো দু-তিনজন প্রতিবেশীকে জাগিয়ে তোলেন। তারা ব্যবসায়ীদের উটগুলোকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তাদের উটপালের সঙ্গে বেঁধে রাখে। মালামাল নামিয়ে মেজবানের ঘরে রাখা হলো। কাফেলা প্রধান বললেন- মালগুলো লুকিয়ে ফেলো।
সবাই ধরাধরি করে মালগুলো খুললো। তার মধ্যে তরিতরকারীর স্থলে বেরিয়ে এলো তীর-তরবারী, খঞ্জর এবং তিন-চারটি চাটাইয়ে মোড়ানো দাহ্য পদার্থ ভর্তি অনেকগুলো পাতিল। মালগুলো লুকিয়ে ফেলা হলো।
এবার আসলরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারি? দলনেতা বললেন- অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি।
কোন সমস্যা নেই- মেজবান বললেন- সবাই নিজস্ব লোক।
দলনেতা মুখের লম্বা দাড়িগুচ্ছ টান দিয়ে খুলে ফেলেন এবং চোখের সবুজ কাপড়ও সরিয়ে ফেলেন। তার আসল দাড়ি ছোট এবং পরিপাটি করে ছাটা। দৃশ্যমান দাড়ি তার কৃত্রিম ছিলো। মালপত্র এখানে-সেখানে লুকিয়ে রেখে লোকজন মেহমানদের নিকট এলে এক ব্যক্তি কাফেলার নেতাকে দেখে চমকে ওঠে। দলনেতা মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন–আমাকে চেনেননি বুঝি?
ও, আলী বিন সুফিয়ান- লোকটি বললো- আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে প্রথমে চিনতে পারিনি। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- আমাদের সৌভাগ্য যে, আপনি নিজে এসেছেন। এখানকার পরিস্থিতি ভালো নয়।
আমি সংবাদ পেয়েছি যে, সুদানের কয়েদখানার এক সিপাহী সুদানী ফৌজের দুজন কমান্ডারকে হত্যা করে ফেলেছে- আলী বিন সুফিয়ান, বললেন- আর আমি এও জানতে পেরেছি, সুদানীরা আমাদের যুদ্ধবন্দীদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
লম্বা দাড়িওয়ালা, চোখে পট্টিবাধা, চোগা পরিহত লোকটি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর অভিজ্ঞ গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য এখানে এসেছেন। কায়রোতে বসে গোয়েন্দা মারফত যেসব তথ্য পেয়েছিলেন, তারই আলোকে এখন কথা বলছেন। যে ঘরটিতে। এখন তিনি বসা আছেন, সেটিই তাঁর প্রেরিত গোয়েন্দাদের কেন্দ্র। গৃহকর্তা সুদানী নাগরিক। এরা সবাই সুলতান আইউবীর অনুগত। আলী বিন সুফিয়ানকে তারা একটি নতুন সংবাদ শোনালো
গুজব প্রচারিত হচ্ছে যে, আল্লাহর এক দূত এসেছেন, যিনি পানিতে আগুন লাগাতে পারেন- মেজবান আলী বিন সুফিয়ানকে বললেন- তিনি বলছেন, আল্লাহ আমাকে মৃতদের মধ্য থেকে তুলে এনে বলেছেন, তুমি মুসলমানদেরকে বলল, তোমরা সুদানের অনুগত হয়ে যাও। কারণ, এই মাটি তোমাদের মা।
মেজবান আলী বিন সুফিয়ানকে আমর দরবেশ সম্পর্কিত সব কাহিনী শোনন। কিন্তু তার জানা ছিলো না যে, রাতে আমর দরবেশ তূর পর্বতের জালওয়া দেখিয়ে মানুষের অন্তরে অত্যন্ত ভয়ানক সন্দেহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
আমি এ আশংকাই করছিলাম যে, দুমশন আমাদের বোধ-বিশ্বাসের উপর আক্রমণ করবে- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- সে জন্য আমি নিজেই এসেছি। খৃস্টানরা নাশকতায় ওস্তাদ। আর আমাদের জনগণ হলো আবেগপ্রবণ। খৃস্টানরা হৃদয়গ্রাহী ভাষার ধুম্রজাল ছড়িয়ে দেয় আর আমাদের আবেগপ্রবণ আনাড়ী ভাইয়েরা তার সূক্ষ্ম সুতোয় আটকে পড়ে। যা হোক, কাল বিলম্ব না করে এক্ষুণি আমাকে এই ফেতনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। আমার মনে হয় আমর দরবেশকে আমি চিনি। আমাদের ফৌজের এক ইউনিটের কমান্ডার ছিলো। অত্র এলাকায় মিশরী গোয়েন্দা কমান্ডোও ছিলো।
আলী বিন সুফিয়ান মেজবানকে বললেন- আপনি আমাদের কয়েকজন গোয়েন্দাকে ডেকে আনার ব্যবস্থা করুন। এর বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
***
সকাল বেলা। এখানে সূর্য উদয় হয়নি। গোয়েন্দাদের ডেকে আনার জন্য লোক পাঠানো হয়েছে। তাদের রওনা হওয়ার পরক্ষণেই একটি ঘোড়া দ্রুতবেগে ছুটে এসে ঘরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে যায়। আরোহী ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এলে সকলে তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যান।
ইনি ইমাম। সেই ইমাম, যিনি আমর দরবেশের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। কিন্তু জনতা তার কথা না শুনে তাকে ধাক্কা মেরে চলে গিয়েছিলো। পরে রাতে দুজন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর উপর আক্রমণ করেছিলো। তিনি সেখান থেকেই ফিরে এসেছিলেন। তিনি জানতেন, এই গৃহটি মুসলমানদের গুপ্তচরবৃত্তি ও অন্যান্য তৎপরতার কেন্দ্র। পাবর্ত্য এলাকা থেকে ফিরে এসে ঘরে গিয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে তিনি এই গৃহের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যুবক ইমাম নিশ্চিত, আমর দরবেশ একজন জাদুকর ও ভেল্কিবাজ। তিনি এখানে রিপোর্ট প্রদান এবং ভণ্ডামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সহযোগিতা নিতে এসেছেন।
