ইমাম আক্রমণকারীদের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার শেষ চেষ্টা চালান। শরীরের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করেন। সম্মুখের ব্যক্তি ইমামের লাথি খেয়ে পেছনে গিয়ে ছিটকে পড়ে এবং ইমামের গলায় তার বাহুর বন্ধন শ্লথ হয়ে আসে। ইমাম আরেকটি ঝটকা মেরে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে যান। এবার তিনি রক্তক্ষয়ী লড়াই করার প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে যান। কিন্তু ইতিমধ্যে আক্রমণকারী দুজন পালিয়ে গেছে। ইমাম তাদেরকে হাঁক দেন। কিন্তু তারা দষ্টির আড়ালে চলে গেছে। ইমাম আর সম্মুখে অগ্রসর হওয়া সমীচীন মনে করলেন না এবং সেখান থেকেই ফিরে আসেন।
আমর দরবেশের তাবুতে সেই তিন ব্যক্তি উপবিষ্ট, যারা দিনের বেলায়ও এসেছিলো। তারা আমর দরবেশকে বললো- আমাদের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। আমরা যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলাম, মানুষ সেই প্রতিক্রিয়া নিয়েই ফিরে গেছে। তারা আমর দরবেশকে এ-ও বললো যে, আগামী রাত আপনাকে সম্মুখে অপর একটি গ্রামের নিকটে যেতে হবে এবং অন্য এক পাহাড়ের উপর তুর পর্বতের জালওয়া দেখাতে হবে।
লোক তিনজন চলে গেছে। এখন তাঁবুতে আছে আশি আর আমর দরবেশ।
আপনি কি আপনার সাফল্যে আনন্দিত? আশি জিজ্ঞেস করে।
আশি? আমর দরবেশ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- আমি তোমাকে এ জাতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় পাচ্ছি।
আচ্ছা, আপনি কী চাচ্ছেন? আমি খৃস্টান ও সুদানীদের হাতে খেলনা হয়েই থাকবো? আশি বললো- আপনি আমার অভ্যন্তরে ঈমান জাগ্রত করে দিয়েছেন। আর এখন কিনা আমাকে বিশ্বাস করছেন না।
আমি তোমাকে বিশ্বাস করবো তোমার কাজের উপর ভিত্তি করে আমর দরবেশ বললেন- তোমার কথার উপর ভিত্তি করে নয়।
বলুন, আমি কী করবো? আশি জিজ্ঞাসা করে- আপনি যা বলবেন, তা-ই করবো।
এখনো সে কাজই করতে থাকো, যা করছো- আমর দরবেশ বললেন সময় এলেই বলবো তোমাকে কী করতে হবে।
হতে পারে সে সময়টা আপনি পাবেন না- আশি বললো- আপনি তো দেখেছেন, আপনার চারপাশে কিভাবে গোয়েন্দার জাল ছড়িয়ে আছে। যখনই আপনার থেকে সামান্যতম সন্দেহজনক আচরণ প্রকাশ পাবে, তখন এই গোয়েন্দারা আপনাকে গুম কিংবা খুন করে ফেলবে। আর আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। আপনি যদি আগেই বলে রাখেন আপনার উদ্দেশ্যে কী, তাহলে আমি যথাসময়ে সাবধান হতে পারবো। তারা তো আমাকে সন্দেহাতীতরূপে তাদেরই দলের সদস্য মনে করে।
আশি এমন সহজ-সরল ও নিষ্ঠাপূর্ণ কথাটা বললো যে, আমর দরবেশ নিশ্চিত হয়ে গেলেন মেয়েটি তাকে ধোকা দেবে না। তিনি বললেন তোমার যোগ্যতা দেখলে মনে হয়, তুমি আমাকে ধোকা দেবে।
দক্ষতায় আপনিও কম নন- আশি বললো- তাই তো আমার মনে হচ্ছে, আপনি নিজ জাতিকে ধোকা দেয়ার পাক্কা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।
আচ্ছা শোন, আমি তোমাকে আমার পরিকল্পনা বলে দিচ্ছি- আমর দরবেশ বললেন- আর এ কথাও বলে রাখছি, তুমি যদি তোমার প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা এবং আমার সঙ্গে প্রতারণা করো, তাহলে তুমি জীবিত থাকতে পারবে না। আমি খুন হওয়াকে যেমন ভয় করি না, তেমনি খুন করাকেও না। আসার পথে তোমাকে বলেছিলাম, আমি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যাচ্ছি। আমার আশা ছিলো, এখানে নিজ এলাকায় এসে নিজের গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহজে কামিয়াব হবো। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম, সুদানীরা আমাকে গুপ্তচরদের বেঈমানীতে আবদ্ধ করে রেখেছে। আমার আরেকটি উৎকণ্ঠা হলো, আমি আমার জাতির পিঠে খঞ্জর বিদ্ধ করে ফেলেছি। মূল লক্ষ্য অর্জনের খাতিরে আমি নিজেকে গোপন রাখছি বটে; কিন্তু আমার যে কর্মকাণ্ডকে তুমি আমার দক্ষতা বলছো, তা আমার জাতির ধর্মীয় বোধ-বিশ্বাসকে বিষের ন্যায় খুন করে ফেলছে। আমি যদি আমার এই মিশন অব্যাহত রাখি, তাহলে তা সুদানী মুসলমানদেরকে আজীবনের জন্য গোলামীর শিকলে আবদ্ধ করে ফেলবে এবং তাদের জাতীয় মর্যাদা চিরদিনের জন্য নিঃশেষ হয়ে যাবে।
তুমি কী করতে চাও? আশি জিজ্ঞেস করে।
আমি ইসহাকের গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছতে চাই- আমর দরবেশ বললেন ইসহাককে চেনো তো! সেই কমান্ডার, যে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কয়েদখানায় পড়ে আছে। তাকে ঘায়েল করার জন্য তোমাকেও এক রাতের জন্য তার নিকট প্রেরণ করা হয়েছিলো।
উহ! ঐ লোকটাকে আমি জীবনেও ভুলবো না- আশি বললো- আমি তারও ততোটুকু ভক্ত, যতটুকু ভক্ত তোমার।
আমি তার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে চাই- আমর দরবেশ বললেন- তারপর নিজ গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছা রাখি। আমি ভেবে এসেছিলাম, এখানে এসে অদৃশ্য হয়ে যাবো এবং এখানকার লোকদেরকে বলবো, তারা যেন সুদানীদের ক্রীড়নকে পরিণত না হয়।
আমি কয়েদখানায় নির্মম নির্যাতনের পর বের হয়েছি- আমর দরবেশ বললেন- জ্ঞান বলতে এতোটুকুই ছিলো যে, কয়েদখানা থেকে বের হওয়ার এই পন্থাটা ভাবতে পেরেছি। কিন্তু এখানে এসে এখন মনে হচ্ছে, সফল হওয়া সম্ভব নয়।
আপনি আমাকেও ভাবতে দিন- আশি বললো- আমরা যদি আল্লাহর পথে দৃঢ়পদ থাকি, তাহলে উদ্দেশ্য সফল হবে। আগামী দিন আমরা সম্মুখে যাবো। পন্থা একটা বেরিয়ে আসবে। আপাতত এখানকার কোন একজন বিজ্ঞ লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া প্রয়োজন।
***
এ অঞ্চলেই আমর দরবেশের তাবু থেকে দু-আড়াই মাইল দূরে মিশর ব্যবসায়ীদের একটি কাফেলা এসে অবস্থান নিয়েছে। কাফেলায় চারজন পুরুষ এবং ছয়টি উট। দলনেতা লম্বা শশ্রুমণ্ডিত বুযুর্গ ধরনের ব্যক্তি। তার একটি চোখের উপর সবুজ বর্ণের একখণ্ড কাপড় ঝুলানো, যেনো চোখটি নষ্ট। কাফেলা দু-রাত আগে সুদানের সীমান্তে প্রবেশ করেছিলো। সীমান্ত অতিক্রমে তাদেরকে কোন বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। রাতের অন্ধকারে সুদানের সীমান্ত রক্ষীরা টের পায়নি যে, চার ব্যবসায়ী এবং ছয় উটের এই কাফেলাটি কোনো শহরের দিকে না গিয়ে সেই পার্বত্য অঞ্চলের কোনো এলাকার দিকে চলে যায়, যেখানকার বাসিন্দারা মুসলিম। অথচ ওদিকে কোনো বণিক কাফেলার যাওয়ার অনুমতি ছিলো না। কারণ, সুদান সরকার মুসলমানদেরকে তরিতরকারী ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে বঞ্চিত রাখতে চাইতো।
