হে খোদার প্রিয়পাত্র, যাকে শ্রদ্ধা করা আমাদের সকলের উপর ফরয, : আমরা আপনার সমীপে উপস্থিত হয়েছি- সেই তিন ব্যক্তির একজন বললো- আপনার দিনের বক্তব্য আমাদের হৃদয়ে গেঁথে গেছে। এবার আমাদেরকে তূর পর্বতের জ্যোতি দেখান, আপনি যার ওয়াদা দিয়েছিলেন।
মিশর ফেরাউনদের রাষ্ট্র- আমর দরবেশ উচ্চস্বরে বললেন- ফেরাউন মারা গেছে। কিন্তু খোদা মিশরের রাজত্ব যাকেই দান করেছেন, সে-ই ফেরাউন হয়ে গেছে। এটা মিশরের মাটি, পানি ও বাতাসের ক্রিয়া। যে ব্যক্তি এক সময় রাসূলের বন্দনা করতো, ক্ষমতার মসনদে আসীন হওয়ায় সেও ফেরাউন হয়ে গেছে। হযরত মূসা (আঃ) ফেরাউনের মোকাবেলা করেছেন এবং নীল নদের রাস্তা তৈরি করে দেখিয়েছেন। বর্তমানে মিশর পুনরায় ফেরাউনের দখলে চলে গেছে। সেখানে এখন মদের নদী প্রবাহিত হচ্ছে এবং পর্দানশীল, সম্ভ্রান্ত মহিলাদের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। তোমরা মিশরকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করার সৌভাগ্য অর্জন করো। মহান আল্লাহ তোমাদেরকে তুর পর্বতের জ্যোতি দর্শন লাভের সৌভাগ্য দান করেছেন।
আমর দরবেশ দুবাহু সম্প্রসারণ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে জ্বালাময়ী কণ্ঠে বললেন- হে আল্লাহ! তুমি তোমার পথহারা বান্দাদের সেই নূর দেখাও, যে নূর তুমি মূসাকে দেখিয়েছিলে।
হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে আমর দরবেশ হাতের আঘাতে একটি প্রদীপ মাটিতে ফেলে দেন। অন্ধকার রাত। ঘোর অন্ধকারে পাহাড়-টিলা বৃক্ষরাজি কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আলো বলতে আছে শুধু সেই প্রদীপ দুটির কিরণমালা, যাতে শুধু আমর দরবেশ আর আশিকে দেখা যাচ্ছে। আমর দরবেশ প্রদীপটি উপরে তুলে ধরে একদিকে ইশারা করে বললেন ঐদিকে দেখ। ওদিকে একটি পাহাড় আছে। তোমরা পাহাড়টাকে দেখতে পাচ্ছে না। তার জ্যোতি দেখ।
আমর প্রদীপটা আরো উর্ধ্বে তুলে ডানে-বাঁয়ে নাড়ান। সঙ্গে সঙ্গে সম্মুখের পাহাড় থেকে একটি শিখা ভেসে ওঠে এবং অল্প পরেই তা নিঃশেষ হয়ে যায়। জনতা সেই যে বিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে ছিলো, এখন হা করেই আছে। বিস্ময় তাদের বাশক্তি কেড়ে নিয়ে গেছে।
তোমরা যদি খোদার এই জ্যোতিকে হৃদয়ে প্রোথিত করে না নাও, তাহলে এই শিখা তোমাদের এই সবুজ-শ্যামল ভূখণ্ডকে মরুভূমিতে পরিণত করে দেবেন- আমর দরবেশ বললেন- আমি তাকে প্রতিহত করতে পারবো না। সেই জোতিকে তোমরাই তো ডেকে এনেছে।
আমর দরবেশ তাঁর তাঁবুতে চলে যান। আশি জনতাকে ইঙ্গিত করে, তোমরা চলে যাও। জনতা স্থান ত্যাগ করে ফিরে যেতে শুরু করে। এখন তারা পরস্পর কথা বলতেও ভয় পাচ্ছে। এখন আর তাদের অন্তরে কোন শোবা-সন্দেহ নেই।
তারা যখন তাঁবু থেকে বেশ দূরে চলে যায়, তখন তাদের মধ্যে থেকে এক যুবক দ্রুত হেঁটে সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে সকলের প্রতি মুখ করে দাঁড়িয়ে যায়। যুবক পাশ্ববর্তী এক গ্রামের মসজিদের ইমাম।
একটু দাঁড়ান- ইমাম হাত দুটো উঁচু করে বললেন- আপনারা আপনাদের ঈমানকে সংযত রাখুন। দরবেশ আপনাদের যা দেখিয়েছে, সবই ভেল্কি। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর পর না আর কোনো নবী এসেছেন, না আসবেন। আল্লাহ সেই পাপিষ্ঠকে তার জ্যোতি দেখান না, যে একটি বেহায়া মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
এটি মেয়ে নয়- জিন। এক ব্যক্তি বললল।
জিন মানুষের আকৃতিতে আসতে পারে না- ইমাম বললেন- জিন মানুষের আনুগত্য করে না। মুসলমানগণ! আপনারা আপনাদের বিশ্বাসকে হেফাজত করুন। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ফেরাউন নন। তিনি আল্লাহর সাচ্চা বান্দা। তিনি নবী হওয়ার দাবি করেননি। তিনি ধর্মের প্রহরী এবং খৃস্টানদের দুশমন।
সম্মানিত ইমাম!- এক ব্যক্তি বললো- আপনি কি পানিতে আগুন লাগাতে পারবেন?
আরে বাদ দাও ওর কথা- অপর একজন বললো- ইমামতি ঠিক রাখার জন্য এসব বলছে।
আমরা যা যা দেখেছি, পারলে আপনি সেসব দেখান- আরেকজন বললো- তবেই আমরা আপনার কথা মেনে নেবো।
আপনারা আমার সঙ্গে সেই পাহাড়ে চলুন, যেখান থেকে শিখাটা জ্বলে উঠেছিলো- ইমাম বললেন- আমি আপনাদের প্রমাণ করে দেবো, এসবই ভেল্কিবাজি। আপনারা চলুন। যদি আমার দাবি ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে আমাকে সেখানেই খুন করে ফেলুন।
আমরা খোদার কাজে হস্তক্ষেপ করার দুঃসাহস দেখাবো না। এক ব্যক্তি বললো।
দু-তিনজন লোক এক সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। তারাও ইমামের মতের বিপক্ষে। তারা জনতাকে এমনভাবে উত্তেজিত করে তোলে যে, সব মানুষ হাঁটতে শুরু করে এবং ইমামকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ইমাম একাকী দাঁড়িয়ে থাকেন।
কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে যুবক ইমাম সেই পাহাড়টির দিকে হাঁটা দেন, যার উপর শিখা জ্বলে ওঠেছিলো। খুব দ্রুতপদে হাঁটছেন তিনি। একটি পাথুরে বিরান ভূমি অতিক্রম করে পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছলে তিনি টের পেলেন, দুজন লোক তার থেকে খানিক দূরে তার পেছন দিয়ে একদিকে চলে গেলো। ইমাম পাহাড়ের কোল ঘেঁষে হাঁটছেন। পেছন দিয়ে চলে যাওয়া ব্যক্তিদ্বয় চলার গতি আরো বাড়িয়ে দেয়। তাদের পায়ের শব্দ শুনে ইমাম দাঁড়িয়ে যান। লোক দুজন আকস্মাৎ তার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে যায়। তাদের মুখমন্ডল কাপড়ে আবৃত। ইমাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আপনারা কারা? তারা কোন জবাব দেয় না। একজন ইমামের পেছনে চলে যায়। ইমাম তার দিকে মোড় ঘুরে দাঁড়ালে অপরজন ইমামকে ঝাঁপটে ধরে। ইমাম কোমরবন্ধ থেকে খঞ্জর বের করেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে খঞ্জরধারী হাতটা অপর ব্যক্তির মুঠোয় চলে যায়। গলায় ঝাঁপটে ধরার কারণে ইমামের শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
