এখানকার পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে। দুশমনরা পরাজিত হয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। আমি তাদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগই দেবো না। আল্লাহর সাহায্য অব্যাহত থাকলে আমি হাব দখল করে ফেলবো। মোকাবেলা সম্ভবত এখনো কঠিন হবে। কিন্তু আমি ব্যবস্থা করে রেখেছি। খৃস্টানরা এখনো মুখোমুখি আসেনি। বোধ হয় আসবেও না। তারা ভাইয়ে–ভাইয়ে সংঘাতে লিপ্ত করে তামাশা দেখছে। তাদের শত্রুরা যদি আপসে লড়াই করেই যদি নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে তাদের সামনে আসবার প্রয়োজন কী। আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করুন। তুমি ভীত হয়ো না। আল্লাহ হাফেজ।
***
আমর দরবেশের আস্তানায় যে তিন ব্যক্তি জনতার ভিড়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে গিয়ে চিৎ হয়ে পেছন দিকে পড়ে গিয়েছিলো, তারা এখন আমর দরবেশের তাঁবুতে উপবিষ্ট। জনতা চলে যাওয়ার সময় তারা কিছুদূর পর্যন্ত তাদের সঙ্গে গিয়ে মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে এক একজন করে আস্তানায় ফিরে এসে আমর দরবেশের তাঁবুতে ঢুকে পড়ে। এরা আমরের দলেরই লোক এবং অত্র এলাকার বাসিন্দা। সুদানী সরকারের নিকট থেকে অনেক সুযোগ-সুবিধা লাভ করছে।
আমার ধারণা ছিলো, কাপড় জ্বলবে না- আমর দরবেশ বলছেন- কাপড়টার নীচে দাহ্য পদার্থ কম রাখা হয়েছিলো এবং পানি বেশি ঢালা হয়েছিলো।
আপনি জানেন না, এই তেল যদি পানিতেও ঢেলে দেয়া হয়, তাতেও আগুন ধরে যায়- যে লোকটি কাপড়ের উপর মশক থেকে পানি ঢেলে দিয়েছিলো, সে বললো- আমরা আগেই পরীক্ষা করে দেখেছি।
মানুষের উপর এর কিরূপ প্রভাব পড়লো? আমর দরবেশ জিজ্ঞেস করেন।
আমরা কিছুদূর পর্যন্ত তাদের সঙ্গে গিয়েছিলাম- একজন জবাব দেয় তারা পানিতে আগুন ধরে যাওয়াকে আপনার মোজেযা মনে করে। তারা কেউই বিশ্বাস করছে না, দুনিয়ার কোনো মানুষ পানিতে আগুন প্রজ্বলিত করতে পারে। আপনি যে ভঙ্গিতে কথা বলেছেন, তাতে আপনার সব কথা তাদের হৃদয়ে গেঁথে গেছে, খোদার কসম।
না দোস্ত- আমর দরবেশ তাকে বাধা দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন খোদার নামে কসম করো না। আমরা যে খোদার বিরুদ্ধাচরণে নেমেছি, তার কসম খাওয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলেছি।
মনে হচ্ছে, আপনার অন্তরে এখনো আসল খোদা বিদ্যমান- একজন বললো- আমর দরবেশ! আপনি কিন্তু আপনার আসল খোদা ও ঈমানকে বিক্রি করে এসেছেন।
অপর একজন পার্শ্বে উপবিষ্ট আশির উরুতে হাত বুলিয়ে বললো- আর এই মূল্যবান সম্পদটা কিভাবে পেয়েছেন, তাও স্মরণ করুন। মেয়েটি খৃস্টান রাজাদের মানিক্য, যাকে সুদানের শাসকমণ্ডলী আপনাকে দান করেছেন।
আমর দরবেশ আশির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। আশি তার প্রতি একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। তাকে বিচলিত মনে হলো আমর দরবেশের কাছে। আমর দরবেশ তার ইঙ্গিত বুঝে ফেললেন। বললেন– নতুন বিদ্যা কিনা; তাই ভুলে গেছি। আসলেই আমি এতো মূল্যবান সম্পদের উপযুক্ত ছিলাম না। যাক গে এসব। আগামী রাতের কথা বলো।
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন- এক ব্যক্তি বললো- আপনি তো আমাদের যোগ্যতা দেখেছেন। দেখলেন না, আমরা কীভাবে পেছন দিকে পড়ে গেলাম?
রাতে আপনি তূর পর্বতের জালওয়া দেখাবেন- অন্য একজন বললো–কী করতে হবে, বুঝে নিন। আমাদের লোকজন সব প্রস্তুত।
আমাদের চলে যাওয়া উচিত- তৃতীয় ব্যক্তি বললো- এখন আর আপনি তাঁবু থেকে বের হবেন না।
তারা চলে যায়।
***
সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন আসতে শুরু করে। দিনের বেলা যেসব লোক আমর দরবেশের বক্তব্য শুনে গেছে এবং পানিতে আগুন লাগানোর মোজেযা দেখেছে, তারা সর্বত্র প্রচার করে দিয়েছে যে, আমর দরবেশ নামক খোদার এক দূত আজ রাতে তূর পর্বতের সেই জালওয়া দেখাবেন, যা আল্লাহ হযরত মূসাকে (আ.) দেখিয়েছিলেন। আমর দরবেশের আস্তানায় সুদানের গোয়েন্দারাও উপস্থিত। তারা অত্যন্ত দক্ষতা ও গুরুত্বের সাথে গুজব ছড়ানোর দায়িত্ব পালন করেছে। তারই ফলে সন্ধ্যার পর আমর দরবেশের তাবুর সম্মুখে জনতার ভিড় দিনের তুলনায় বেশি। তাবুর পেছনে ও ডানে-বাঁয়ে কারো দাঁড়াবার অনুমতি নেই।
আমর দরবেশ এখনো তাঁবুতে অবস্থান করছেন। বাইরে দুটি প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপগুলো মাটিতে গেড়ে রাখা লাঠির মাথায় বাঁধা। জনতা খোদার দূতকে দেখার জন্য উদগ্রীব।
তাবুর পর্দা নড়ে ওঠে। আশি সম্মুখে এগিয়ে আসে। তার পোশাক কালো। কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত লম্বিত ফ্রক। ফ্রকটি অভ্রখচিত যা প্রদীপের। আলোতে তারকার ন্যায় মিট মিট করে জ্বলছে। আশির মাথার উপর রেশমের পাতলা রুমাল। মাথার চুলগুলোও সেই রেশমের ন্যায় সরু ও কোমল, যেগুলো তার উভয় স্কন্ধের উপর এমনভাবে পড়ে আছে যে, তার মাঝে তার উদোম স্কন্ধের শুভ্রতা তারার ন্যায় জ্বল জ্বল করছে। মেয়েটি এমনিতেই রূপসী, তদুপরি তার এই সাজ-সজ্জা, রং-ঢং তাকে এমন মোহময় করে তুলেছে যে, একজন পুরুষের পশুবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য।
পাহাড়-জঙ্গলে বসবাসকারী এই লোকগুলোর নিকট এই মেয়েটি, তার চাল-চলন ও পোশাক একটি বিরল দৃশ্য। তাদের চক্ষু আটকে গেছে। মেয়েটির রূপের জাদুক্রিয়ায় তারা মোহাচ্ছন্ন।
আশির হাতে এক-দেড় গজ লম্বা এবং আধা গজের মতো চওড়া গালিচা। সেটি সে উভয় প্রদীপের মধ্যখানে বিছিয়ে দেয়। মেয়েটি উভয় বাহু বিস্তার করে আকাশের দিকে তাকায়। তাবুর পর্দা সরে যায় এবং আমর দরবেশ মাদকাসক্তের ন্যায় হেলে-দুলে হেঁটে এসে গালিচার উপর দাঁড়ায়। তিনিও আশির ন্যায় ডানে-বায়ে বাহু ছড়িয়ে দিয়ে আকাশপানে দৃষ্টিপাত করে বিড় বিড় করতে শুরু করে।
