***
একটি আশংকা আমাকে অস্থির করে রেখেছে যে, সুদানী মুসলমানরা স্পর্শকাতর, কুসংস্কারের সামনে অস্ত্র ত্যাগ করে বসবে। সুলতান আইউবী বললেন।
সুলতান এখন সুদান থেকে দূরে বহু দূরে ফিলিস্তিনের দোরগোড়ায় একটি পাহাড়ের পাদদেশে তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলী ও সালারদের মাঝে বসে আছেন। তিনি আল-আদিল-এর পত্রখানা পাঠ করছেন। মিশরের ইন্টেলিজেন্স সুদানী মুসলমানদের সম্পর্কে পুরো তথ্য মিশরের ভারপ্রাপ্ত গবর্নর আল-আদিলকে অবহিত করে। আল-আদিল পত্রে সেসব তথ্য সুলতান আইউবীর নিকট লিখে পাঠিয়েছেন। পত্রে তিনি এ-ও লিখেছেন যে, আলী বিন সুফিয়ান বণিকের বেশে সুদান রওনা হয়ে গেছেন। পত্রে আল আদিল জানতে চেয়েছেন, সুদানের মুসলমানদের পাহাড়ী এলাকায় কমান্ডো দল পাঠাবেন কিনা। তিনি এই আংশকাও ব্যক্ত করেছেন যে, আমরা যদিও বা গোপনে কমান্ডো দল প্রেরণ করি, তবু সুদান সরকার যদি জানতে পারে, তাহলে অভিযানটা প্রকাশ্য যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। অথচ এখন আমাদের অধিকাংশ ফৌজ আরবে যুদ্ধরত। বার্তায় উল্লেখ করা হয়, সুদানী সরকার মুসলমানদেরকে তাদের অনুগত বানানোর লক্ষ্যে আমাদের যুদ্ধবন্দীদের ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
সুলতান আইউবী তাঁর সালার ও উপদেষ্টামণ্ডলীকে পত্ৰখানা পাঠ করে শুনিয়ে বললেন- সুদানের এই মুসলমানগুলো সুদান সেনাবাহিনীর জন্য সাক্ষাৎ যম। তোমরা দেখে থাকবে, তাদের যে কজন লোক আমাদের বাহিনীতে আছে, তারা কিরূপ জযবা ও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করছে। কিন্তু দুশমন যখন তাদেরকে তেলেসমাতি ভাষায় উস্কে দেয় এবং মস্তিষ্ককে কল্পনা বিলাসের প্রতি আকৃষ্ট করে, তখন তারা বালির মূর্তিতে পরিণত হয়ে যায়। আল-আদিল একথা লিখেনি যে, খৃস্টানরা সুদানের মুসলিম অঞ্চলে চরিত্র ধ্বংস এবং নাশকতামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। কিন্তু তোমরা তো খৃস্টানদেরকে জানো। তারা এই বিদ্যায় পারদর্শী। আমি জানি, সুদানীদের নিকট খৃস্টান উপদেষ্টা রয়েছে। তারা মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা ধ্বংসে তৎপরতা চালাবে, তাতে সন্দেহ নেই।
সুলতান আইউবী আল-আদিলের দূতকে আহার ও বিশ্রামের জন্য পাঠিয়ে দেন এবং কাতেবকে ডেকে পত্রের জবাব লেখাতে শুরু করেন–
প্রিয় ভাই আল-আদিল!
আল্লাহ তাআলা তোমাকে সাহায্য করুন। তোমার পত্র আমার নিকট সুদানের মুসলমানদের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে। তুমি বিচলিত হয়ে না। তুমি তো জানো, কাফিররা ইসলামের ধ্বংস কামনা করে। উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তারা কোনো সুযোগই হাতছাড়া করছে না। আলী বিন সুফিয়ানের সুদান গমনকে আমি স্বাগত জানাই। তুমি তাকে অনুমতি দিয়ে ভালোই করেছে। আল্লাহ আলী বিন সুফিয়ানকে সাহায্য করুন। লোকটা অত্যন্ত সতর্ক ও যোগ্য গোয়েন্দা। পাথরে ভেতর থেকেও কথা বের করতে জানে। সে ফিরে এসে তোমাকে জানাবে, সেখানকার আসল পরিস্থিতিটা কী! তুমি তার দেয়া তথ্য মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
তুমি জানতে চেয়েছো, সুদানের মুসলমানদের সাহায্যে কমান্ডো প্রেরণ করবে কিনা? এই আশংকাও ব্যক্ত করেছে, কমান্ডো প্রেরণ করলে সুদানীরা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। যা প্রকাশ্য যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। তুমি ভালোই করেছে যে, আমার অনুমতি নেয়া আবশ্যক মনে করেছে। কিন্তু সাবধান! কখনো যদি পরিস্থিতি গুরুতর রূপ ধারণ করে, তাহলে আমার অনুমতির অপেক্ষায় সময় নষ্ট করবে না। তুমি নিশ্চয়ই জেনেছো, সুদানের কয়েদখানার একজন সিপাহী সুদানী ফৌজের একজন কমান্ডারকে হত্যা করে মুসলমানদের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছে এবং ইসলাম গ্রহণ করেছে। তুমি এ-ও জানো যে, সুদানীরা আমাদের কয়েদীদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং আমাদের ইসহাক নামক এক কমান্ডারের স্ত্রী ও কন্যাকে পর্যন্ত প্রতারণার মাধ্যমে অপহরণ করার চেষ্টা করেছে। এতেই প্রমাণিত হচ্ছে, সুদানী মুসলমানদের মাঝে কিছু গাদ্দারও আছে। এমতাবস্থায় তুমি যত দ্রুত সম্ভব কিছু কমান্ডো সেনাকে ব্যবসায়ী ও পর্যটকের বেশে সুদানী সীমান্তে পাঠিয়ে দাও।
আমার প্রিয় ভাই! এটা সত্য যে, আমাদের সেনাসংখ্যা কম এবং আমরা আরেকটি রণাঙ্গন চালু করতে অক্ষম। কিন্তু আমরা কুরআনের সেই নির্দেশনা কিভাবে উপেক্ষা করতে পারি যে, পৃথিবীর কোনো একটি ভূখণ্ডে যদি কাফেররা মুসলমানদের উপর জুলুম করে কিংবা প্রলোভন বা প্রতারণার মাধ্যমে তাদেরকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে, তাদের জাতীয় মর্যাদা ও দ্বীন-ঈমানকে সংকটাপন্ন করে তোলে; তাহলে পৃথিবীর সকল মুসলমানের উপর জিহাদ ফরজ হয়ে যায়? আমি বহুবার বলেছি, সালতানাতে ইসলামিয়ার কোনো সরহদ-সীমানা নেই। ইসলামের সুরক্ষার জন্য আমরা যে কোনো দেশের সীমানা অতিক্রম করতে পারি। তুমি জানো, আমরা সুদানী মুসলমানদেরকে কমান্ডো দিয়ে রেখেছি, যারা কৃষকের বেশে তাদের সঙ্গে অবস্থান করছে। সুদানী মুসলমানদেরকে আমরা সামরিক সরঞ্জামও দিয়েছি। তুমি যদি প্রয়োজন মনে করো, তাহলে আদেরকে আরো সাহায্য দাও।
সুদানীরা যদি তাদের সীমান্ত নিরাপদ করার জন্য মিশরে সেনা অভিযান চালায়, তাহলে ভয় পেয়ো না। তোমরা স্বল্পসংখ্যক ফৌজ দ্বারা কয়েকগুণ বেশি ফৌজের মোকাবেলা করতে পারবে। তোমরা তাদের এক আক্রমণ নস্যাৎ করেছে, দ্বিতীয়টিও নস্যাৎ করতে পারবে ইনশাআল্লাহ। তবে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি নেবে না। দুশমনকে এমন জায়গায় ঠেলে নিয়ে আসবে, যেখানে তোমরা অল্পসংখ্যক লোকে অধিক ধ্বংসসাধন করতে পারবে। কমান্ডোদের বেশি ব্যবহার করবে এবং দুশমনের রসদ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করবে। তোমাদের অর্ধেক যুদ্ধ আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দারা জয় করে ফেলবে। তবে আমার মনে আশা জাগছে না, সুদানীরা আক্রমণ করার মতো বোকামী করবে। তাদের খৃস্টান উপদেষ্টারা যদি জ্ঞানের পরিচয় দিয়ে থাকে, তাহলে তারা আক্রমণের পরিবর্তে তাদের পাহাড়ী এলাকায় মুসলমানদেরকে দলে ভোড়াবারই চেষ্টা করবে। মুসলমানরা যদি তাদের অফাদার হয়ে যায় এবং তাদের ফৌজে শামিল হয়ে যায়, তাহলে তারা যে কোনো ঝুঁকি মাথায় নিতে পারবে। তাই তোমাকে চেষ্টা করতে হবে, যেনো মুসলমানরা তাদের বিভ্রান্তির শিকারে পরিণত না হয়। আমি শতবার যে কথাটা বলেছি, এখনও তারই পুনারাবৃত্তি করবো। মুসলমান যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত করে পরাজিত হয় না। কিন্তু যখন তাদের মধ্যে পাশবিকতা জাগিয়ে দেয়া হয়, তখন তারা তরবারী ছুঁড়ে ফেলে। মুসলিম জাতির যখনই পতন এসেছে, এ কারণেই এসেছে। আমাদের শত্রুরা আমাদের জাতির মাঝে এই আগুনই প্রজ্বলিত করছে। এইভাবে আমরা এক সঙ্গে দুটি রণাঙ্গনে লড়াই করছি। একটি মাটির উপরে, অপরটি নীচে। আমাদের শত্রুরা আমাদেরকে বিষমাখা তীর দ্বারা হত্যা করতে পারেনি। এখন তারা মিষ্টিমধুর ভাষার জাদুতে আমাদেরকে অকর্মন্য ও পঙ্গু করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটি বড়ই ভয়াবহ যুদ্ধ। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
