তখন আমার মনে পড়লো, আলোর মধ্যকার আওয়াজ আমাকে যা যা বলেছে, আমি সঁবই দেখেছি। আমার তরবারী কর্তন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলো। আমি দেখেছি; আমার ছোড় তীরটা বাতাসের মধ্যদিয়ে এমনভাবে যাচ্ছিলো, যেনো বাতাসের তোড়ে শুকনো খড় উড়ছে। আমার ঘোড়া গতি হারিয়ে ফেলেছিলো। বালুকাময় প্রান্তর যেনো সূর্যের সমস্ত উত্তাপ ধারণ করে আমাকে ও আমার সঙ্গীদেরকে ঝলসে দিয়েছিলো। আমি একটি ভস্মিত লাশে পরিণত হয়ে গিয়েছিলাম।
তারপর তারকার মধ্য হতে একটি স্ফুলিঙ্গ এসে আমার উভয় চোখে ঢুকে পড়ে। পরে সেটি আমার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে যায়। আওয়াজ এলো- আমি তোমাকে পুনর্জীবন দান করলাম। জিজ্ঞেস করো, আমি তোমাকে এই অনুগ্রহ কেননা করলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম। আওয়াজ উত্তর দিলো আমি মুসলমানদের ভালোবাসি। মুসলমান আমার রাসূলের কালেমা পাঠ করে। এই লাশগুলো যাদের, আমি তাদেরকে শিক্ষার উপকরণে পরিণত করেছি যে, এরা পথ হারিয়ে ফেলেছিলো। যারা এখনো পথ হারায়নি, বিপথগামী হওয়ার উপক্রম হয়েছে, আমি তাদেরকে সোজা পথ দেখাতে চাই। আমি তোমাকে বেছে নিয়েছি। কেননা, তুমি প্রতি সকালে কুরআন পাঠ করে থাকো। যাও, আমি তোমাকে আলো দান করলাম। এই আলো আমার মুসলমান বান্দাদের দেখাও।
কথাগুলো আমি ভালোভাবে বুঝতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম- হে আমার প্রভুর আলো! বিষয়টা আমাকে খুলে বলুন এবং বলে দিন, আমার কথা কে গ্রহণ করবে? কিভাবে করবে? বলুন- আমাদের তরবারীগুলো কেনো ভোতা হয়ে গিয়েছিলো? তীরগুলোর গতি কোথায় উঠে গিয়েছিলো? আলোর আওয়াজ বললো- সেই তরবারী ভোলা হয়ে যায়, যার আঘাত নিজ মায়ের উপর করা হয়। সেই তীর খেজুরের শুকনো ডালের ন্যায় হয়ে যায়, যেটি আপন মায়ের বুকের ছোঁড়া হয়। তুমি জানো না, মা কে? মা হলো সেই ভূখণ্ড, যে তোমাকে জন্ম দিয়েছে, যার মাটিতে খেলাধুলা করে তুমি যৌবন লাভ করেছো। তুমি সুদানের মুসলমানদেরও জানিয়ে দাও, সুদানের পবিত্র ভূখণ্ড তোমাদের মা। তাকে তোমরা ভালোবাসো। এরই মাটির ভেতর তোমাদের জান্নাত। বাইরে থেকে কোনো মুসলমান যদি এই জান্নাতকে জয় করতে আসে, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। তুমি তো জাহান্নাম দেখে নিয়েছে। যাও, তোমার কালেমাগো সুদানী ভাইদের বলল, তোমাদের মা, তোমাদের জান্নাত, তোমাদের কাবা হলো সুদান।
হযরত- এক ব্যক্তি বললো- তাহলে কি আপনি বলছেন, আমরা সুদানের রাজার অনুগত হয়ে যাবো, যিনি আমাদের রাসূলকে মান্য করে না?
এই লোকটিও সেই তিন ব্যক্তির একজন, যারা সম্মুখে অগ্রসর হতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলো।
খোদার আওয়াজ বলেছেন, সুদানের এই কাফির বাদশাহ মুসলমান হয়ে যাবেন- আমর দরবেশ পরম গাম্ভীর্যের সাথে বললেন- তিনি মুসলমানদের পথপানে চেয়ে আছেন। তার ফৌজ কাফিরদের ফৌজ। সে কারণে তিনি আল্লাহ ও রাসূলের নাম উচ্চারণ করেন না। তোমরা চলে যাও তরবারী, বর্শা ও তীর-ধনুক নিয়ে যাও। উট-ঘোড়ায় সাওয়ার হয়ে যাও। তাকে গিয়ে বলো, আমরা আপনার মোহাফেজ। আমরা সুদানের সন্তান।– আমি খোদাকে বললাম, আমি বললে এসব কথা কেউ গ্রহণ করবে না। আমার মুসলমান ভাইয়েরা আমাকে হত্যা করে ফেলবে। উত্তরে খোদার আওয়াজ বললো- আমি ব্যতীত আর কে পানিতে আগুন লাগাতে পারে? তুমি যাও, আমি তোমাকে এই শক্তি দিয়ে দিলাম, যাতে মানুষ তোমাকে বিশ্বাস করতে পারে, তোমার কণ্ঠকে আমার কণ্ঠ মনে করে। কোনো মানুষ তো আর পানিতে আগুন ধরাতে পারে না। তারপর আলোর মধ্য হতে আওয়াজ আসলো- তারপরও যদি মানুষ তোমাকে মিথ্যা মনে করে, তাহলে তুমি তাদেরকে রাতে আসতে বলে। আমি তাদেরকে সেই জালওয়া দেখিয়ে দেবো, যা মূসাকে তূর পর্বতে দেখিয়েছিলাম।
আচ্ছা তোমরা কি তুর পর্বতের জ্যোতি দেখে সত্যের আওয়াজকে মেনে নেবে? আমর দরবেশ জিজ্ঞেস করেন।
হ্যাঁ, হে খোদার দূত!- সেই তিন ব্যক্তির একজন বললো- আপনি যদি আমাদেরকে তুর পর্বতের জ্যোতি দেখাতে পারেন, তাহলে আমরা আপনার কণ্ঠকে খোদার কণ্ঠ বলে মেনে নেবো।
যাও- আমর দরবেশ ক্ষোভের সাথে মাটিতে হাত ছুঁড়ে বললেন- চলে যাও। যখন সূর্যের কিরণমালা পাহাড়ের পেছনে চলে যাবে এবং আকাশে তারকারাজির প্রদীপমালা জ্বলে উঠবে, তখন আবার আসবে।
জনতা আমর দরবেশের আস্তানা ত্যাগ করে ফিরে যায়। তাদের অন্তরে কোনো সন্দেহ নেই। তারা চার-পাঁচজন করে দল বেঁধে হাঁটছে আর মন্তব্য মূল্যায়ন করছে। মানবীয় ফিতরাতের দুর্বলতাগুলো ভেসে ওঠেছে। বিশ্বাস চাপা পড়ে গেছে। জযবা শীতল হয়ে গেছে। সহজ-সরল পশ্চাৎপদ মানুষ এরা। একটি স্পর্শকাতর নাটক তাদের বিবেকের গতি ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমর দরবেশের কণ্ঠ ও বাচনভঙ্গী তাদের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করে ফেলে। কেউ সন্দেহ প্রকাশ করলে অপর কেউ না কেউ বলছে- তুমি কি পানিতে আগুন ধরাতে পারো?
এখনো রাতে তূর পর্বতের জ্যোতি দেখার কাজ বাকি আছে। এরা আশিকে জিন মনে করছে। স্পষ্ট ভাষায় তা ব্যক্ত করছে।
এরা সেইসব মুসলমান, যারা সুদানের অমুসলিম বাদশাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রেখেছিলো। তারা সুদানী বাহিনীকে এই পার্বত্য অঞ্চলে পরাস্ত করে পিছু হটিয়ে দিয়েছিলো। তারা ছিলো আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুসারী এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ভক্ত-সমর্থক। সুদানী নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তারা তাদের পার্বত্য অঞ্চলকে স্বাধীন ইসলামী রাজ্য মনে করতো। কিন্তু আমর দরবেশের স্পর্শকাতর ও জাদুময় বক্তব্য তাদের সব চিন্তাধারা পাল্টে দিলো। তারা বিপথগামী হয়ে উঠলো। একটি দেশের সেনাবাহিনী যাদের কাছে হার মানতে বাধ্য হলো, একজন মানুষের একটি চিত্তাকর্ষী আক্রমণে তাদের সব অস্ত্র হাত থেকে পড়ে গেলো। এখন এরা যে যেখানে যাকে পাচ্ছে, গুজব ছড়াচ্ছে। তারা যা দেখলো, যা শুনলো, তাকে আরো আকর্ষণীয় করে প্রচার করতে লাগলো।
