তার অপর দুসঙ্গী বললো- আমরা যাবো। তুমি ভীত হয়ে পড়েছে। তারা দুজন একসঙ্গে এগিয়ে যায়। তিন-চার পা অগ্রসর হওয়ার পর তারাও প্রথমজনের ন্যায় পেছন দিকে চিৎ হয়ে পড়ে যায়। তারা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। জনতা ভয় পেয়ে যায়। সকলের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, বুজুর্গ তার প্রহরায় জিন দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, যে কাউকে সম্মুখে অগ্রসর হতে দিচ্ছে না।
তাঁবু থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে আসে। মেয়েটি আশি। তার পরনে। কালো রেশমী পোশাক। চিবুক ও মুখমণ্ডল হাল্কা নেকাবে আবৃত। চোখ দুটো খোলা। মাথাটা কালো কাপড়ে ঢাকা। মাথার রেশমকোমল চুলগুলো দুকাঁধের উপর দিয়ে ভাগ হয়ে বুকের উপর এসে ঝুলছে। মেয়েটি আবৃতা বটে; কিন্তু পোশাকটা এমন যে, তাকে অর্ধনগ্ন বলেই মনে হচ্ছে। এই পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ এমন রূপসী মেয়ে আর কখনো দেখেনি। মেয়েটিকে তারা পরী মনে করছে। তার চাল-চলন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। যেমন চিত্তাকর্ষক, তেমনি মায়াময়।
আশি আমর দরবেশের সম্মুখে এসে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। সেজদা থেকে উঠে নিজের একটি কান তার মুখের সঙ্গে লাগায়। আমর দরবেশের ঠোঁট নড়ে ওঠে। আশি উঠে দাঁড়িয়ে যায়।
তোমরা ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো- আশি জনতাকে উদ্দেশ করে বললো- কেউ সামনে অগ্রসর হওয়ার দুঃসাহস দেখাবেন না। খোদার দূত জিজ্ঞেস করেছেন, তোমরা এখানে কেননা এসেছো? তোমরা ওখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারো।
যে তিন ব্যক্তি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে পড়ে গিয়েছিলো, তাদের একজন উচ্চ কণ্ঠে বললো- হে আল্লাহর দূত! তুমি কি অনাগত ভবিষ্যতের সংবাদ বলতে পারো?
জিজ্ঞেস করো কী জানতে চাও? আমর দরবেশের গুরুগম্ভীর মুখে ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন।
সুদানের অনুগত না হয়ে কি আমরা এই ভূখণ্ডকে ইসলামী রাজ্যে পরিণত করতে পারবো? লোকটি জিজ্ঞেস করে।
হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আমর দরবেশ। দুহাত মাটিতে ছুঁড়ে মারেন। আশি ছুটে এসে তার কাছে বসে পড়ে এবং তার মুখের সঙ্গে কান লাগিয়ে রাখে। আমর দরবেশের ঠোঁট নড়ে ওঠে। আশি উঠে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশে বললো- খোদার দূত বলেছেন, পানিতে যদি আগুন ধরে যায়, তাহলে তোমরা এই ভূখণ্ডকে ইসলামী রাজ্যে পরিণত করতে পারবে। কারো কাছে পানি থাকলে এই কাপড়টির উপর ঢেলে দাও।
আমর দরবেশের সামান্য দূরে একটি কাপড় এমনভাবে পড়ে আছে, যেনো কেউ দেহ থেকে খুলে দলা করে রেখে দিয়েছে। যে তিন ব্যক্তি সম্মুখে অগ্রসর হতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলো, তাদের একজন এগিয়ে আসে। তার হাতে চামড়ার ছোট্ট একটি মক। সে বললো আমার কাছে পানি আছে। আমি সফরে আছি বিধায় সঙ্গে পানি রেখেছি। এগিয়ে নিয়ে সে মশকটির মুখ খুলে কাপড়ের উপর পানি ঢেলে দেয়।
আশি মাটি থেকে প্রদীপটি আমর দরবেশের হাতে তুলে দেয়। আমর দরবেশ আকাশের দিকে মুখ করে ঠোঁট নাড়ান, যেনো তিনি কারো সঙ্গে কানে কানে কথা বলছেন। তারপর প্রদীপের শিখা কাপড়ের সঙ্গে লাগান। কারো কল্পনা ছিলো না, পানিভেজা কাপড়ে আগুন ধরে যাবে। কিন্তু তা-ই হলো। আমর দরবেশ যেইমাত্র প্রদীপের শিখা কাপড়ের নিকট নিয়ে যান, অমনি কাপড়টি জ্বলে উঠে এবং পুরো বস্ত্রটি একটি অগ্নিশিখায় পরিণত হয়। জনতার ভিড়ের মধ্য থেকে কয়েক ব্যক্তি বিস্মিত কণ্ঠে আল্লাহু আকবার ধ্বনি তোলে। তারা চাক্ষুষ দেখতে পাচ্ছে, তাদের সম্মুখে পানি জ্বলছে।
খোদার ইশারা বুঝে নাও- আমর দরবেশ বললেন- আর ভালো ভাবে চিনে নাও আমি কে। আমি তোমাদেরই একজন।
তিনি নিজ গ্রামের নাম উল্লেখ করে বললেন- আমি ঐ এলাকার বাসিন্দা। আমি হাশেম দরবেশের পুত্র আমর দরবেশ। আমি নবী-রাসূল নই। খোদা তার শেষ নবীকে প্রেরণ করে ফেলেছেন।
তিনি নিজের আঙ্গুলে চুমো খেয়ে চোখে লাগিয়ে বললেন- আমিও তোমাদেরই ন্যায় আখেরী নবীর একজন উম্মত। খোদা আমাকে আলো দেখিয়েছেন এবং আদেশ করেছেন, যেনো এই আলোকে আমি সেই লোকদের কাছে পৌঁছিয়ে দেই, যারা অন্ধকারে নিমজ্জিত।
আমর দরবেশ এমন ভঙ্গীতে কথা বলছেন, যেনো তার উপর উন্মত্ততা চেপে আছে। তিনি বললেন
আমার গ্রামে গিয়ে জিজ্ঞেস করো, আমি সালাহউদ্দীন আইউবীর কমান্ডার। আমি সেই বাহিনীর সঙ্গে ছিলাম, যারা সুদান আক্রমণ করেছিলো। যাদের আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছে। আমরা সবাই অনুতপ্ত হলাম। কিন্তু মহান আল্লাহ আমাকে মিশরী ফৌজের লাশের মধ্য থেকে তুলে এনেছেন এবং আমাকে ইঙ্গিত দিয়েছেন সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ কেনো পরাজিত হলো। আমার অনুতাপ আনন্দে রূপান্তরিত হলো। আমি একটি বৃক্ষের ডালে খোদার নূর দেখতে পেলাম। এমন এক আলো, যেনো একটি তারকা আকাশ থেকে নেমে এসে গাছের ডালে আটকে গেছে। সেই তারকার ভেতর থেকে আওয়াজ এলো- সামনে দেখো, পেছনে দেখো, ডানে দেখো, বামে দেখো…।
আমি সব দিক তাকালাম। আওয়াজ এলো- তুমি কি কোনো জীবিত মানুষ দেখতে পাচ্ছো? আমি চতুর্দিকে শুধু লাশ আর লাশ দেখতে পেলাম। সকলের শোচনীয় অবস্থা। আহতদের সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ সৈনিক পিপাসায় মারা গেছে। এরা সকলে লড়াই করছিলো। তারকার আলোর মধ্য হতে আওয়াজ এলো- তুমি কি দেখোনি, তোমাদের তরবারী ভোলা হয়ে গিয়েছিলো? তুমি কি দেখোনি, তোমাদের তীরগুলোর কোনো গতিই ছিলো না? তুমি দেখোনি, তোমাদের ঘোড়াগুলোর পা মাটিতে বসে গিয়েছিলো?
