তুমিও তো এখানকার মুসলমান- আশি বললো- তুমি হিংস্র নও কি?
তোমার দর্শনে কে হিংস্র হয়ে ওঠে না? বলেই আরোহী ঘোড়ার পিঠে চড়ে সন্ধ্যার ঘনায়মান আঁধারে হারিয়ে যায়।
***
এই অশ্বারোহী ঈমান নীলামকারী মুসলমানদের একজন। সুদানের সহজ-সরল মুসলমানদের বিশ্বাসের উপর পরিচালিত যুদ্ধের সেনাপতি। এই এলাকারই বাসিন্দা। কিন্তু কেউ জানে না লোকটি জাতির আস্তিনের বিষাক্ত সাপ। এই মিশনে সে একা নয়। তারা আট-দশজন মুসলমানের একটি দল।
ঘোড়ায় চড়ে লোকটি একটি গ্রামের দিকে ছুটে চলে। পথে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে। তারই পথপানে তাকিয়ে ছিলো সে।
সব ঠিক তো? লোকটি আরোহীকে জিজ্ঞেস করে।
হা, সবই ঠিক আছে- আরোহী জবাব দেয়- তবে যে কোনো সময় পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। ক্রুসেডাররা যদি আমাকে পরিপক্ক পাঠ শিখিয়ে থাকে, তাহলে আমি বলবো, মেয়েটার চিন্তাধারা পাল্টে গেছে। তাকে কেমন যেনো আনমনা ও নীরব মনে হলো।
তা হয় না। আশি অনেক সতর্ক ও বিচক্ষণ মেয়ে।
তাহলে বোধ হয় দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে নির্জীব হয়ে পড়েছে- আরোহী বললো- তাছাড়া আমর দরবেশও তো কম হিংস্র নয়।
কথা বলতে বলতে তারা গ্রামে ঢুকে পড়ে। এক স্থানে দুজন লোক দাঁড়িয়ে কথা বলছে। অশ্বারোহী ও তার সঙ্গী তাদের নিকটে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো- আমরা ভ্রমণে বের হয়েছিলাম। এখন গ্রামে ফিরছি। তারপর বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বললো- এখান থেকে সামান্য দূরে এক বুযুর্গের আবির্ভাব ঘটেছে। লোকটি শুধু আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেন। দিনের বেলায়ও ডানে বায়ে দুটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন। তাকে দেখে আমরা তার কাছে বসে পড়েছিলাম। তিনি কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। মুখস্ত পড়েন। আমাদের প্রতি ক্ষেপও করলেন না। আমরা তাকে ডাকলাম। তিনি রা করলেন না। তার তাঁবুর নিকট হতে একটি ধোঁয়ার কুণ্ডলী উত্থিত হয়ে উপরে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো এবং তার মধ্য হতে একটি মেয়ে বেরিয়ে এলো। মেয়েটির রূপ আমরা তোমাকে বলে বুঝাতে পারবো না। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। কেননা, মানুষ নয়- মেয়েটিকে পরী বলে মনে হলো। মেয়েটি বুজুর্গের সম্মুখে গিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়লো। পরে সেজদা থেকে ওঠে বুজুর্গের মুখের সঙ্গে কান লাগালো। বুজুর্গের ওষ্ঠাধর নড়ে উঠলো। মেয়েটি আমাদের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে গেলো।
আমরা ভয়ে পালাতে উদ্যত হলাম। কিন্তু মাটি আমাদেরকে ধরে রাখে। সম্ভবত মেয়েটির চোখ আমাদেরকে আটকে রাখে। সে আমাদেরকে বললো- ইনি খোদার দূত। তোমাদের সকলের জন্য পয়গাম নিয়ে এসেছেন। তাকে বিরক্ত করো না। এ মুহূর্তে তিনি খোদার সঙ্গে কথা বলছেন। তোমরা আগামী দিন এসো। যদি তোমাদের প্রতি তার দয়া হয়, তাহলে তিনি তোমাদের প্রত্যেককে তুর পর্বতের দীপ্তি দেখাবেন। আমি এই মাত্র দূর পর্বত থেকে এসেছি। তিনি আমাকে তলব করেছিলেন। আমার কানে কানে তোমাদেরকে বলতে বলেছেন যে, তিনি তোমাদের ভাগ্য বদলে দেবেন। যদি তোমরা অধৈর্য হও, তাহলে তিনি অন্যত্র চলে যাবেন। আমরা মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। আমরা সম্পূর্ণরূপে তার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিলাম। আমরা কিছুই বলতে পারিনি। বুজুর্গের প্রতি তাকালাম, দেখতে পেলাম, তার মাথার উপর নূর চমকাচ্ছে। আমরা সেখান থেকে চলে এলাম।
লোকগুলোর কণ্ঠস্বর স্পর্শকাতর। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিলো, তারা বিস্মিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত। মানবীয় ফিতরাতের একটি দুর্বলতা হলো, বিস্ময়কর বক্তব্য চেতনাকে নাড়িয়ে তোলে। স্পর্শকাতরতা আনন্দ দান করে। কাহিনী শ্রবণে দুএলাকাবাসীর সে অবস্থা-ই সৃষ্টি হলো। তারা দুটি গৃহের দরজায় করাঘাত করে দুতিনজন লোককে ডেকে আনে এবং তারা যা শুনেছে, তাদেরকে শোনায়। অশ্বারোহী ও তার সঙ্গী কাহিনী বর্ণনায় একটি বিশেষ আকর্ষণ যুক্ত করে দেয়। তারা মেয়েটির রূপের বিবরণ এমন ভাষায় ও এমন শব্দে প্রদান করে যে, শ্রোতারা খোদা, কুরআন ও উক্ত বুযুর্গের পরিবর্তে মন-মস্তিষ্কে মেয়েটিকেই স্থান দিতে শুরু করে। তারা অশ্বারোহী ও তার সঙ্গীকে মেহমান হিসেবে বরণ করে নেয়। অন্যান্য ঘরের লোকজনও এসে ভিড় জমায়।
***
ভোর বেলা। সূর্য এখনো উদিত হয়নি। গ্রামের সব মানুষ অশ্বারোহী ও তার সঙ্গীর নেতৃত্বে আমর দরবেশের আস্তানা অভিমুখে ছুটে চলে। তাঁবুর সম্মুখে ছোট্ট একটি জাজিমের উপর আমর দরবেশ এলোপাতাড়ি বসে আছেন। চক্ষু বন্ধ করে বিড় বিড় করছেন। একটি লাঠি তার ডানে, একটি বাঁয়ে। মাটিতে পুঁতে দাঁড় করিয়ে রাখা আছে। লাঠি দুটোর মাথায় তেলে ভেজা কাপড় জ্বলছে। এগুলো প্রদীপ। আমর দরবেশের আট-দশ পা দূরে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামবাসীরা এসে তাদের কাছে দাঁড়িয়ে যায়।
তাদের একজন বললো- আমি এগিয়ে গিয়ে বুযুর্গের সঙ্গে কথা বলি। তিন-চার পা অগ্রসর হওয়ার পর লোকটি পেছন দিকে এমনভাবে চিৎ হয়ে পড়ে যায়, যেনো কেউ তাকে সামনের দিক থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে। দিয়েছে। ওঠে সে জনতার মাঝে গিয়ে দাঁড়ায়। ভয়ে থর থর করে কাঁপছে লোকটি। সে ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো- কেউ সম্মুখে যেও না। কে যেনো আমাকে সামনে থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। আমি কাউকে দেখতে পাইনি। বোধ হয় জিন হবে।
