আমি সর্বাবস্থায় তোমাকে সঙ্গ দেবো- আশি বললো- আমি প্রমাণ করবো, আমার শিরায় মুসলমানের রক্ত বিদ্যমান।
আমর দরবেশ ও আশি দুটি উটে চড়ে মুসলিম ভূখণ্ড অভিমুখে এগিয়ে চলছেন। তৃতীয় উটটিতে তাদের তাবু ও অন্যান্য মালপত্র বোঝাই করা। যে আশি এক সময় অর্ধনগ্ন চলাফেরা করতো, এখন সে আপাদমস্তক কালো বোরকায় আবৃত। মুখমণ্ডলও নেকাবে ঢাকা। দেখে বুঝবার কোনো উপায় নেই যে, মেয়েটি ক্রুসেডারদের একটি সুদর্শন তীর, যা পাথরসম শক্ত একজন মানুষের অন্তরে ঢুকে গেলে মানুষটি মোম হয়ে খৃস্টানদের ধাঁচে তৈরি হয়ে যায়।
আমর দরবেশ ও আশি যেদিকে যাচ্ছেন, দূরে এক অশ্বারোহীকে সেদিকেই যেতে দেখা গেলো। আমর দরবেশ ভাবলেন, এই লোকটিও সম্ভবত সেই সুদানী গুপ্তচরদের একজন, যারা তার সঙ্গে ছায়ার মতো লেপ্টে আছে। তার এই ধারণা যদি ভুল হয়, তাহলে নিশ্চয়ই সে মরুদস্যু। আশপাশে কোথাও তার সাঙ্গরা লুকিয়ে আছে। তাই যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে আমর কী করবেন?
আশি- সফর সঙ্গীকে উদ্দেশ করে আমর দরবেশ বললেন- তুমি কি ঐ অশ্বারোহীকে দেখতে পাচ্ছো?
অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি।
যদি দস্যু হয়ে থাকে, তাহলে কি আমরা তাদের মোকাবেলা করতে পারবো?
আমাদের সঙ্গে অস্ত্র আছে- আশি সাহসী জবাব দেয়- যদি রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় এসে আমাদের উপর আক্রমণ চালায়, তাহলে কী হবে বলতে পারবো না। দিনের বেলায় হলে মোকাবেলা করবো। তোমার সঙ্গে স্বয়ং আমি একটি সম্পদ। তারা আমাকে তোমার হাত থেকে কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, আমাকে তারা জীবন্ত নিতে পারবে না।
নানাবিধ শংকার মাঝে দোল খেতে খেতে এগিয়ে চলে আমর দরবেশ ও আশি। সূর্যটা পশ্চিম আকাশে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ধীরে ধীরে পর্বতমালা চোখে পড়তে শুরু করেছে তাদের। উঁচু পর্বতমালা এখনো বহুদূর হলেও অঞ্চলটা যেখান থেকে শুরু হয়েছে, সেই স্থান আর বেশী দূরে নয়। উটগুলো এগিয়ে চলছে।
যে অঞ্চল থেকে তার মিশন শুরু করবেন বলে কথা, সেখানে এসে পৌঁছে গেছেন আমর দরবেশ। মুসলমানদের প্রথম গ্রামটায় পৌঁছতে আর অল্প কিছু পথ বাকি। আমর দরবেশ স্বয়ং সেই গ্রামের বাসিন্দা। যে অশ্বারোহী লোকটি দূর পথে অগ্রসর হচ্ছিলো, গতি পরিবর্তন করে সে এদিকে এগিয়ে আসে এবং আমর দরবেশের সঙ্গে মিলিত হয়।
তোমাদের আস্তানা ঐখানে- অশ্বারোহী আমর দরবেশকে উদ্দেশ করে বললো- তোমরা আমাকে না চিনলেও আমি তোমাদেরকে চিনি।
লোকটিকে দেখে আশি মুখের নেকাব সরিয়ে হাসতে শুরু করে। অশ্বারোহী তাকে জিজ্ঞেস করে- সফর কেমন কাটলো?
খুব ভালো- আশি হাসিমুখে জবাব দেয়।
তোমরা ভয় পাওনি তো- আরোহী জিজ্ঞেস করে- সফরকালে তোমাদের নিরাপত্তার এমন ব্যবস্থা ছিলো, যা তোমরা কল্পনা করতে পারবে না। অন্যথায় এমন একটি রূপসী মেয়ে নিয়ে এ পর্যন্ত পৌঁছতে পারতে না।
তুমি কে? আমর দরবেশ জিজ্ঞেস করেন।
সুদানী মুসলমান- আরোহী জবাব দেয়- এখন এ ভাবনা ভেবো না, তুমি কে আর আমি কে। তোমরাও আমার ন্যায় এ অঞ্চলেরই বাসিন্দা। তুমি ভালোভাবেই জানো, আমরা যদি সামান্যতম ভুলও করি, তাহলে এখানকার মুসলমানরা আমাদের চামড়া তুলে ফেলবে।
আরোহী আমর দরবেশের আরো কাছে এসে কানে কানে বললো- এ কথাও মনে রেখো,তুমি যদি দায়িত্ব পালনে সামান্যতম হেরফের করো, তাহলে বিনা নোটিশে খুন হয়ে যাবে। এখানে তোমার কাজ কী তা তোমার ভালোভাবেই জানা আছে। এই রাতটা বিশ্রাম করবে। আগামীকাল থেকে এখানে তোমার নিকট লোকজন আসতে শুরু করবে। আশির জানা আছে, তাকে কী করতে হবে।
আমর দরবেশের সবকিছু জানা আছে। তার দায়িত্ব এই এলাকার মুসলমানদের বিভ্রান্ত করা, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো এবং মুসলমানদেরকে সুদানের অফাদার বানিয়ে সুদানী বাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা।
সুলতান আইউবী মিশরে অনুপস্থিত। এ মুহূর্তে তিনি আরব ভূখণ্ডে শক্রর মোকাবিলায় যুদ্ধরত। ক্রুসেডারদের পরিকল্পনা হলো, সুদানী ফৌজকে প্রস্তুত করে মিশরের উপর আক্রমণ করাবে। কিন্তু সুদানী মুসলমানদের যুদ্ধবাজ গোত্রগুলো সুদানের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও সুলতান আইউবীর ভক্ত ও অনুসারী। আমর দরবেশ তাদের ভক্তি-বিশ্বাসকে তছনছ করে দিতে এসেছেন।
সূর্য ডুবে গেছে। আমর দরবেশ আগন্তুক অশ্বারোহীর সহায়তায় তাঁবু স্থাপন করেন। আরোহী বিদায় নেয়ার আগে বললো- আগামীকাল সম্ভবত তোমাদের সঙ্গে নিভৃতে কথা বলার সুযোগ হবে না। সকাল সকালই লোকজন এখানে আসতে শুরু করবে। সে একটি পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে বললো- সাঝের আলো আঁধারীতেও পাহাড়টা তোমাদের চোখে ছাতার ন্যায় বৃক্ষ মনে হবে। আগামী রাত ওখানে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখবে। কাল যে পোশাক পরিধান করবে, ভোরেই তা প্রস্তুত করে রাখবে। আমি যাচ্ছি। এখন থেকে প্রতি পদক্ষেপে সতর্কতা অবলম্বন করবে।
আরোহী মেয়েটিকে ইঙ্গিতে বাইরে নিয়ে বললো- তোমাকে বেশী সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এখানকার মুসলমানরা জংলী। তোমার হেফাজতের জন্য আমরা প্রস্তুতি আছি। কিন্তু তোমার হেফাজত নিজেকেই বেশী করতে হবে। এই লোকটাকে আয়ত্ত্বে রাখবে। সে মেয়েটির দুকাকের উপর ছড়িয়ে থাকা চুলে বিলি কেটে ঠোঁটে শয়তানী হাসি হেসে বললো- এই সুদর্শন শিকলগুলোয় তো তুমি সিংহকেও আটকে ফেলতে পারো।
