মস্তিষ্কের উপর বেশী চাপ সৃষ্টি করো না- আমর দরবেশ মেয়েটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন- আমি তোমার পুরো কাহিনী বুঝে ফেলেছি। তুমি মুসলমানের সন্তান। তুমি আরব কিংবা ফিলিস্তিনের বাসিন্দা। খৃস্টানরা মুসলমানদের কাফেলা লুণ্ঠন করতো। এখনো যেসব অঞ্চল খৃস্টানদের দখলে, সেখানে তারা মুসলমানদের কাফেলা লুট করে থাকে। তারা সোনা-চাদি এবং তোমার ন্যায় রূপসী মেয়েদেরকে নিয়ে যায়। আমি বুঝে ফেলেছি, তুমি এ পর্যন্ত কিভাবে পৌঁছেছে।
আমি যখন সবকিছু বুঝতে শুরু করেছি, তখন আমি এমন বহু মেয়েকে দেখেছি- আশি বললো- আমাদেরকে উন্নতমানের খাবার ও দামী দামী পোশাক দেয়া হতো। গৌর বর্ণের পুরুষ-মহিলারা আমাদেরকে আদর করতো। তারা আমার মস্তিষ্ক থেকে সব স্মৃতি মুছে দিয়েছে। আমি ওখানেই বড় হয়েছি। জায়গাটি ছিলো জেরুজালেম। শৈশব থেকেই আমাদেরকে অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার প্রশিক্ষণ শুরু হয়। মদও পান করানো হতো। আমাকে প্রথমে আরবী এবং পরে সুদানী ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়। তারপর যখন আমি যৌবনে পা রাখি, তখন আমাকে এই কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়, যে কাজে তুমি আমাকে দেখেছো। তীর-তরবারী চালনার তো আমাদেরকে বহু অনুশীলন করা হয়। আজ যখন তুমি আমাকে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় নিজ আশ্রয়ে নিয়ে নিয়েছে, তখন হঠাৎ আমার পিতার কথা মনে পড়ে যায়। আমার ব্যাপারে তাঁর আবেগ ছিলো পবিত্র। আর তোমার আবেগও পবিত্র। এ কারণেই আমি তোমাকে বলেছিলাম, আরো কিছু সময় আমাকে তোমার কোলে পড়ে থাকতে দাও। তোমার কোলে মাথা রেখে আমি পিতার মমতা অনুভব করছিলাম। আজ আমি শপথ নিলাম, আমি যতোদিন বেঁচে থাকবো, তোমার গোলাম হয়ে থাকবো। এখন আমি সুদানীদের কোনো কাজে আসবো না। এটা তোমারই স্বচ্চরিত্রতা ও সৎ নিয়তের সুফল। আমি মুসলমান। তুমি আমার শিরায় মুসলমান পিতার রক্ত ছড়িয়ে দিয়েছে। এখন আর আমি তোমাকে সেই কাজ করতে দেবো না, যে কাজের জন্য তুমে এসেছো। তুমি আমার ভেতরটায় ঈমানের প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে।
কয়েকদিন তোমাকে এ কাজ করতে হবে- আমর দরবেশ বললেন আমি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।
৫.৩ তুরের জ্যোতি
তুরের জ্যোতি
তাবু গুটিয়ে সুদানী মুসলমানদের পার্বত্য অঞ্চলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আমর দরবেশ। কিন্তু সফরসঙ্গী রূপসী মেয়েটি নিয়ে তার অন্তহীন ভাবনা। মেয়েটি মুসলমান। এ কারণে আমর দরবেশ তাকে ক্রুসেডারদের হাত থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছেন। মেয়েটি চার-পাঁচ বছর বয়সে ক্রুসেডারদের হাতে চলে গিয়েছিলো। তারপর বিশ বিশটি বছর ব্যয় করে তারা তার গায়ে যে রঙের প্রলেপ মাখিয়েছে, তা অপসারণ করা সহজ নয়। ভালো হলো, মেয়েটি নিজেই বুঝে ফেলেছে যে, সে মুসলমান ঘরের সন্তান। এখন তার হৃদয়ে ক্রুসেডারদের প্রতি প্রবল ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সে আমর দরবেশকে বলে দিয়েছে, আমি তোমাকে সাহায্য করবো। কিন্তু আমর দরবেশ ভাবছেন, মেয়েটির উপর আস্থা স্থাপন করা যায় কিনা।
একই তাঁবুতে রাত কাটিয়ে ভোরে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে মেয়েটি আমর দরবেশকে বললো- আমার সন্দেহ হচ্ছে, তুমি এখনো আমাকে তোমার শত্রু মনে করছে।
নারীর ফাঁদে পড়ে মুসলিম জাতি বহু ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে আশি! আমর দরবেশ উত্তর দেন- তুমি অত্যন্ত রূপসী মেয়ে। তোমার চলন-বলন ও ভাবভঙ্গী মানুষের মধ্যে পশুত্বকে জাগিয়ে তোলে। আমি এক যুবক। আমি কয়েক বছর যাবত যুদ্ধের ময়দানে আছি। কিছুদিন সুদানের কয়েদখানায় যুদ্ধবন্দী হিসেবে সময় কাটিয়েছি। এই দীর্ঘ সময়টায় আমি আপনজনদের চেহারা পর্যন্ত দেখিনি। রাতে তাঁবুতে তুমি আমার সঙ্গে একাকী ছিলে। আমি রাতভর মহান আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছি, যেনো আমি পশুত্বের মোকাবেলায় জয়ী হতে পারি। আমি সফল হয়েছি। আল্লাহ আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। তারপর ভাবতে শুরু করি, আমি তোমাকে শত্রু ভাববো, না বন্ধু। সেই ভাবনা এখনো ভাবছি। এখনো আমি তোমার এই সন্দেহ দূর করতে পারছি না যে, আমি তোমাকে শত্রু ভাবছি। শেষ পর্যন্ত তোমাকেই প্রমাণ করতে হবে, তুমি বিশ্বাসযোগ্য।
আমি আবারও বলছি, তুমি আমার বুকে ঈমানের প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছো- আশি বললো- আর আমি তোমাকে এ কথাও বলে রাখছি, সুদানীরা তোমাকে যে মিশন নিয়ে প্রেরণ করেছে, তুমি যদি তাতে তাদেরকে ধোকা দিতে চাও, আমি তোমাকে সঙ্গ দেবো। জীবন বিপন্ন হলেও আমি পিছপা হবো না। আমিই তো তোমাকে বলেছিলাম, যে দুজন লোক এসে তোমার ভক্ত হয়ে চলে গেলো, তারা মূলত সুদানীদের গুপ্তচর।
আমাকে ভাবতে দাও আশি- আমর দরবেশ বললেন- আমি বুঝে ফেলেছি, আমার চার পাশে গোয়েন্দা জাল বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। তোমাকে আমি সেই জালের একটি অংশ মনে করি। এখনো তুমি তা-ই করো, যা তোমাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমিও সেই পাঠ ও নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করবে, যা আমাকে শেখানো হয়েছে। আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমি অন্য কোনো উদ্দেশে যাচ্ছি। কিন্তু এই মিশন থেকে মুখ ফেরানো সম্ভব নয়। আমি এর পরিণাম জানি। দুতিনটি তীরের গতি সবসময় আমার দিকে থাকে। আমি তাদেরকে তখনই দেখতে পাবো, যখন তীর আমার বুকে এসে বিদ্ধ হবে।
