এখন তো সেখানকার রাজা সালাহুদ্দীন আইউবী- এক উদ্যারোহী বললো- তিনি তো খাঁটি মুসলমান।
সালাহুদ্দীন আইউবী নামের মুসলমান- আমর দরবেশ এমন ভঙ্গীতে বললেন, যেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন- সে-ই তো তোমাদের ধ্বংস ডেকে আনছে। তোমরা যে মাটির তৈরি, সেই মাটির মর্যাদার জন্য রক্ত ঝরাও। তোমরা সুদানের সন্তান।
কিন্তু সুদানের রাজা তো কাফির। উল্লারোহী বললো।
তিনি মুসলমান হয়ে যাবেন- আমর দরবেশ বললেন- তিনি। মুসলমানদের পথে অগ্রসর হচ্ছেন। তার ফৌজ কাফিরদের ফৌজ। তাই তিনি ইসলামের নাম মুখে আনেন না। তোমরা চলে যাও। তরবারী, বর্শা, তীর ধনুক নিয়ে যাও। উট-ঘোড়র উপর সওয়ার হয়ে যাও। তাকে বলল, তোমরা তার মোহাফেজঁ। তোমরা সুদানের মোহাফেজ।
তারপর আমর দরবেশ হঠাৎ উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন- যাও, ওঠো, এখান থেকে চলে যাও।
আগন্তুক দুজন উটের পিঠে চড়ে বসে এবং চলে যায়। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর একজন অপরজনকে বললো- ধোকা দেবে না।
আমার ধারণাও তাই- অপরজন বললো- পাক্কা মনে হচ্ছে, পাঠ ভুলেনি।
আশির মতো রূপসী মেয়ে যদি উপহার হিসেবে পেয়ে যাই, তাহলে পিতা মাতার বিরুদ্ধে চলে যেতেও কুণ্ঠিত হবো না। উষ্ট্রারোহী বললো।
চলো, আমরা ফিরে যাই- অপরজন বললো- গিয়ে বলবো, সব ঠিক আছে…। আচ্ছা, মেয়েটি বোধ হয় তাঁবুতে আছে।
লোকটা সতর্ক মনে হচ্ছে। মেয়েটাকে লুকিয়ে রেখেছে- একজন বললো- আমাদেরকে তাদের হেফাজত করার প্রয়োজন নেই।
প্রয়োজন নেই- অপরজন বললো- সৈনিক মানুষ। সঙ্গে অস্ত্র আছে। তীর-ধনুকও আছে। আশিও সতর্ক মেয়ে।
এরা দুজন, সুদানী গুপ্তচর। আমর দরবেশ পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করছে কিনা জানবার জন্য তাদেরকে পেছনে প্রেরণ করা হয়েছে। আমর দরবেশও বিচক্ষণতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে দিয়েছেন, যার ফলে তারা নিশ্চিত হয়ে ফিরে গেছে।
ওরা ডাকাত নয়- তাঁবুতে প্রবেশ করে আমর দরবেশ আশিকে বললেন চলে গেছে।
এরা দস্যু অপেক্ষাও ভয়ংকর- আশি বললো- তুমি তাদেরকে যথার্থই উত্তর দিয়েছে। যারা তোমাকে এদিকে প্রেরণ করেছে, এরা তাদের গুপ্তচর। এরা খোঁজ নিতে এসেছে, তুমি তাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে কিনা।
তুমি কি এদেরকে চেনো।
আমি এদের গাছের ডাল- আশি বললো- যদি তাদের থেকে কেটে পড়ে যাই, তাহলে শুকিয়ে যাবো।
তাহলে তো আমাকে তোমার থেকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
মেয়েটি হেসে ওঠলো এবং বললো- তুমি তো নিজেই আমাকে পুরস্কার স্বরূপ চেয়ে এনেছে।
***
তাঁবুতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আহমদ দরবেশ। আশিও ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ আশির চোখ খুলে যায়। বাইরে কতগুলো চিতা হুংকার দিয়ে বেড়াচ্ছে। উটগুলো ভয়ে দাঁড়িয়ে গেছে এবং ভয়ার্ত চিৎকার করছে। আশি আমর দরবেশকে জাগিয়ে তুলে বললো- আমি ভয়ে মরে যাচ্ছি। আমর দরবেশ বাইরের হুংকার-চিৎকার শুনতে পান। আশি বললো- এগুলো ব্যাঘ্ৰ। নিকটে আসবে না। উটগুলো দাঁড়িয়ে গেছে। কোনো ভয় নেই। উটের ভয়ে ব্যারা পালিয়ে যাবে।
হঠাৎ ব্যাঘ্রগুলো পরস্পর হামলে পড়ে। সবগুলো ব্যাঘ্র একসঙ্গে হুংকার ছাড়ে। আশি চিৎকার করে উঠে আমর দরবেশের গায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আমর বসা ছিলেন। তিনি মেয়েটিকে এমনভাবে কোলে ও বাহুবন্ধনে নিয়ে নেন, যেমনিভাবে মা তার ভয়পাওয়া শিশুকে লুকিয়ে ফেলেন। মেয়েটির সারা শরীর কাঁপছে। তার মুখ থেকে কথা বেরুচ্ছে না। ব্যাঘ্রগুলো পরস্পর লড়াই করতে করতে দূরে চলে যায়।
আমর দরবেশ মেয়েটিকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে বললেন- ওরা চলে গেছে। তুমি শুয়ে পড়ো।
না- আশি তার কোল থেকে মাথা সরালো না। ক্ষীণ কণ্ঠে বললো- তুমি আমাকে কিছুক্ষণ এভাবে থাকতে দাও।
এ দৃশ্য আমর দরবেশের পছন্দ নয়। তাঁর মনে ধারণা জন্মালো, মেয়েটি তাঁকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে। তিনি আরো শক্ত পাথর হয়ে যান। এমন রূপসী মেয়ে ইতিপূর্বে তিনি কখনো ছুঁয়ে দেখেননি। এখন তার মনে হতে লাগলো, মেয়েটি এভাবে পড়ে থাকলে তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন না। যতো পাথরই হোন, তিনি মানুষ তো বটে। তদুপরি সুদেহী সুপুরুষ। আমর দরবেশ নিজের নফসের মোকাবেলা করতে শুরু করলেন।
কিছুক্ষণ পর মেয়েটি মাথা উঠায়। অন্ধকারে তার চেহারার প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। সে আমার দরবেশের মুখমণ্ডলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো- তুমি এক রাতে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে, আমার পিতা-মাতা কারা এবং কোথায়? তোমার যে সঙ্গী তোমার আগে উক্ত কক্ষে এসেছিলো, সেও আমাকে একই প্রশ্ন করেছিলো। তখন আমার এর উত্তর জানা ছিলো না। কিন্তু প্রশ্নটা আমাকে অস্থির করে তুলেছিলো এবং বহু অতীতের স্মৃতিমালা জাগিয়ে তুলেছিলো। কিছু স্মৃতি আমার স্মরণ আসছিলোও। কিন্তু পরক্ষণেই তা স্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিলো। আজ তা স্মরণে এসে গেছে। তুমি যখন বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে আমাকে কোলে তুলে লুকিয়ে ফেলেছিলে, তখন আমার স্মৃতিতে আলোর মতো চমকে উঠেছিলো। তার আলোকে আমি আমার বহু পুরনো স্মৃতি দেখতে পাই। আমি তখন বেশ ছোট ছিলাম। বাবা আমাকে ঠিক এমনি তার বুকে জড়িয়ে নিয়ে নিজ বাহুতে লুকিয়ে ফেলেছিলেন।
মেয়েটি নীরব হয়ে যায়। চুপচাপ স্মৃতির পাতা উল্টাতে থাকে সে। হঠাৎ শিশুর ন্যায় লাফিয়ে উঠে বললো- হ্যাঁ, আমার পিতা ছিলেন। এমনই মরু এলাকা ছিলো। রাত ছিলো না দিন ছিলো মনে পড়ছে না। আমরা একটি কাফেলার সঙ্গে যাচ্ছিলাম। অনেকগুলো অশ্বারোহী ধেয়ে এসে কাফেলার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের কাছে তরবারী ছিলো, বর্শা ছিলো। ভয়ানক এক দৃশ্য ছিলো, যা আজ তোমার কোল ও বাহুর উত্তাপে স্মৃতিতে জেগে উঠেছে। আব্বাজান আমাকে তোমারই ন্যায় আশ্রয়ে নিয়ে নিয়েছিলেন। হ্যাঁ, মায়ের কথাও মনে পড়ছে। মা আমার গায়ের উপর পড়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত, তিনি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। তারপর মনে পড়ছে, তিনি একদিকে পড়ে গিয়েছিলেন। আমার রক্তের কথাও মনে পড়ছে। এক ব্যক্তি আমাকে আমার বাহুতে ধরে তুলে নিয়েছিলো। একজন বলেছিলো- খাঁটি হিরা। জোয়ান হলে দেখবে। আমার সে সময়কার চিৎকারের কথাও মনে পড়ছে। সেদিন আমি আজ রাতের ন্যায় চিৎকার করছিলাম।
