গোয়েন্দা মারফত প্রাপ্ত তথ্যাবলীতে সুলতান জানতে পারছেন মিশরে কখন কী ষড়যন্ত্র মাথা তুলছে। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে তিনি কখনো পেরেশান হতেন না। কিন্তু ইসলাম ও ইসলামী সাম্রাজ্য বিরোধী ষড়যন্ত্র তাকে বেচাইন করে তুললো। আর এই বাস্তবতা ছিলো তার জন্য বিষের ন্যায় তিক্ত যে, এসব ষড়যন্ত্রের হো হলো খৃষ্টানরা আর এর ক্রীড়নক মুসলমান। আলী বিন সুফিয়ান তার ডান হাত। বরং বলা যায় আলী তাঁর চোখ-কান। নিজের অবর্তমানে সুলতান তাকে মিশর রেখে এসেছেন এবং তার সহকারী হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে নিজের সঙ্গে নিয়ে আসেন। মিশরের শাসনক্ষমতা আইউবীর ভাই আল-আদিলের হাতে। নিজ ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে আল আদিল রাতে ঘুমান সামান্য। আলী বিন সুফিয়ানকে সব সময় সঙ্গে রাখেন। এভাবেই বর্তমানে মিশরের শান্তি, নিরাপত্তা ও এই ভূখণ্ডে ইসলামের মান অস্তিত্ব সুরক্ষার দায়িত্ব এই দুব্যক্তির হাতে ন্যাস্ত।
আল-আদিল ও আলী বিন সুফিয়ানের ভালোভাবেই জানা আছে, সুলতান আইউবীর অবর্তমানে মিশরে নাশকতা বেড়ে চলেছে। তাছাড়া সুদানের দিক থেকে আশংকা বিদ্যমান। মাস চারেক আগে আল-আদিল সুদানীদের ভয়ংকর এক ষড়যন্ত্রকে অবিশ্বাস্য সাফল্যের সাথে নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে সুদানীদের ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি। কারণ, তাদের যে হামলাটি ব্যর্থ হয়েছিলো, সেটি তাদের নিয়মিত ফৌজের হামলা ছিলো না। সেই হামলা ব্যর্থ হওয়ার পরও সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনী কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই প্রস্তুত ছিলো। এই বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলো খৃষ্টানরা। এমনকি কোনো কোনো ইউনিটের কমান্ডও ছিলো খৃস্টানদের হাতে।
তার প্রমাণ, সুদানের হামলার মোকাবেলায় সীমান্তে সীমান্ত বাহিনীর সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাছাড়া আলী বিন সুফিয়ান বিপুলসংখ্যক গোয়েন্দা সদস্যকে সীমান্ত এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। তারা মরু মুসাফির ও যাযাবরের বেশে সীমান্ত এলাকায় ঘোরাফেরা করছে। সীমান্ত চৌকিগুলোর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে। এসব চৌকিতে তাদের জন্য ঘোড়া প্রস্তুত থাকছে। সীমান্ত বাহিনীগুলোর টহলসেনারাও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। পাশাপাশি আছে আরো একটি আয়োজন। আলী বিন সুফিয়ানের কয়েকজন অভিজ্ঞ গোয়েন্দা বণিকের বেশে সুদানের সঙ্গে অবৈধ ব্যবসা করছে, যাকে চোরাচালানী বলা হয়। পণ্য দিয়ে তাদেরকে সীমান্ত পার করিয়ে দেয়া হতো। এরা সুদান গিয়ে বলতো, আমরা মিশরের সীমান্ত বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে এসেছি। সুদানে কিছু কিছু পণ্যের অভাব ছিলো। তন্মধ্যে সবজি উল্লেখযোগ্য। সুলতান আইউবীর পরামর্শে মিশরে অধিক হারে সবজি উৎপাদন করা হতো, যার একাংশ সুদান পাচারের মাধ্যমে সুদানের গোপন তথ্য সংগ্রহ করা হতো।
সুদানের যেসব ব্যবসায়ী মিশরী বণিকদের সঙ্গে কারবার করতো, তাদেরও অধিকাংশ গুপ্তচর, যারা মিশরের পক্ষে কাজ করতো। মিশরী গোয়েন্দারাই তাদেরকে তৈরি করে নিয়েছে। গুপ্তচরবৃত্তির এই পদ্ধতি সফল হলে সুলতান আইউবী নির্দেশ প্রদান করেন, সুদানের জন্য পণ্যের দাম সস্তা করে দাও, যাতে আমাদের এই কর্মপদ্ধতি সমগ্র সুদানে জালের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। সুলতানের নির্দেশ মোতাবেক জাল ছড়িয়ে দেয়া হলো এবং সুদানী ফৌজ ও সরকারের প্রতিটি গতিবিধি কায়রোতে গোচরীভূত হতে লাগলো। আলী বিন সুফিয়ান সীমান্তের কাছাকাছি দুতিনটি জরুরী কেন্দ্র স্থাপন করে দেন। যখনই ওদিক থেকে কোনো সংবাদ আসতো, সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তের কোনো না কোনো কেন্দ্র হয়ে সেই সংবাদ বিদ্যুাতিসম্পন্ন ঘোড়ায় চড়ে কায়রো পৌঁছে যেতো। এ কাজের জন্য যেসব বাহন রাখা হয়েছিলো, তারা দিন-রাত অবিরাম ছুটে চলার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিলো।
সুদানে একটি বিস্তৃত পাহাড়ী এলাকা আছে। সেখানকার অধিবাসীরা সবাই মুসলমান। তাদের অধিকাংশ মিশরী ফৌজের সৈনিক। বিষয়টি সুলতান আইউবী জানেন। তাঁর এ-ও জানা আছে, এ লোকগুলো সুদানী ফৌজে ভর্তি হতে চায় না। সুলতান আইউবীর শাসন ক্ষমতায় আসীন হওয়ার আগে মিশরী ফৌজে সুদানী হাবশী ও সুদানী মুসলমান সবাই ভর্তি হতো। তাদের কমান্ডারও ছিলো এক সুদানী। প্রিয় পাঠকদের হয়েতো মনে আছে, সেই কমান্ডারের নাম নাজি। সুলতান আইউবীর আগে নাজিই ছিলো মিশরের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। অথচ, দেশে খেলাফতের মসনদও ছিলো নিয়মতান্ত্রিক। এমারতও ছিলো। খলীফা বলুন কিংবা আমীর, তারা প্রকৃত অর্থে রাজা ছিলেন। খৃস্টানরা মিশরকে সালতানাতে ইসলামিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করার পক্ষে এখানে নাশকতা ও ষড়যন্ত্রের আখড়া প্রতিষ্ঠিত করে। নাজি তাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সে মিশরের সুদানী ফৌজকে নিজের মুঠোয় নিয়ে নেয়। এই বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিলো পঞ্চাশ হাজার।
মিশরের শাসনক্ষমতা হাতে নেয়ার পর সুলতান আইউবীর সঙ্গে প্রথম সংঘাতটা হয় নাজির সঙ্গে। তিনি নূরুদ্দীন জঙ্গীর নিকট থেকে বাছাইকৃত জানবাজ সৈন্য এনে মিশরের পঞ্চাশ হাজার সুদানী ফৌজকে ভেঙ্গে দেন। তার কতিপয় সালারকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন এবং নতুন বাহিনী গঠন করে নেন। তার অল্প কদিন পরই তিনি আদেশ জারি করেন যে, সুদানের অপসারিত সৈন্যদের যারা আনুগত্যের শপথ নিয়ে নিষ্ঠার সাথে মিশরী ফৌজে শামিল হতে আগ্রহী, তাদেরকে ভর্তি করে নেয়া হোক। ফলে যেসব সুদানী মুসলমান মিশরী ফৌজে ছিলো, তারা সকলে ফিরে আসে। তারা বুঝতে সক্ষম হয়, তাদেরকে অমুসলিম ষড়যন্ত্রের ক্রীড়নকে পরিণত করা হয়েছিলো। সুলতান আইউবীর ফৌজে শামিল হয়ে যখন তারা খৃস্টানদের বিরুদ্ধে দুতিনটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং সুলতানকে কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করে, তখন তাদের ঈমান তাজা হয়ে যায়। সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদেরকে দ্বীন, ঈমান ও জাতীয় মর্যাদার উপদেশও প্রদান করা হতো। তাদেরকে বুঝানো হতো, যারা তাদের ধর্মের শক্ত, তারা তাদেরও শক্ত, যাদের চাখে মুসলিম মা-বোনদের কোনো মর্যাদা নেই। সুলতান আইউবীর যে বাহিনীটি আরবে লড়াই করেছে, তাদের বেশীরভাগ সৈন্যই সুদানী মুসলমান।
