আমর দরবেশের ঘুম ভেঙ্গে যায়। তাকিয়ে দেখে, আশি তার পাশে বসা। মুখে কথা নেই, হাসিও নেই। এ কথাও বললো না, মেঝেতে ঘুমানো তোমার পক্ষে ঠিক হয়নি। সে নীরবে বাইরে চলে যায়। পানি নিয়ে ফিরে আসে। আমর দরবেশ এই পানি দ্বারা ওজু করে নামাযে দাঁড়িয়ে যান। আশি কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
***
নাস্তার পর দুজন খৃস্টানের সুদানী সালার এসে উপস্থিত হয়।
আমার একটি কথা মনোযোগ সহকারে শুনে নাও- আমর দরবেশ সালারকে বললেন- যে কোনো সময় আমার ইসহাককে প্রয়োজন হতে পারে। তাকে অস্থির না করে খোলামেলা আরামদায়ক কক্ষে থাকতে দিন। পাতাল কক্ষ থেকে সরিয়ে তাকে উপরে নিয়ে আসা হোক। তিনি আমার বন্ধু। আমি যখন তার প্রয়োজন অনুভব করবে, তখন আমিই তাকে বুঝিয়ে নেবো। প্রয়োজন হলে ধোঁকা দিয়ে হলেও তার থেকে কাজ নেবো। তখন যদি তিনি মতে না আসেন, তখন তার সঙ্গে যা খুশি আচরণ করুন।
সুদানী সালার বললো- তাই হবে।
খৃস্টান উপদেষ্টাগণ আমর দরবেশকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে। তিনি ভালোভাবেই প্রশিক্ষণ রপ্ত করেন। তারা তাকে যা যা বলেছে, তাও তিনি মুখে আওড়াতে থাকে। চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত তার প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। দিনে তার সঙ্গে থাকে খৃষ্টান উপদেষ্টারা, আর রাতে আশি। এই মেয়েটি তার ভক্তে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু দুএকদিন আমর দরবেশের সাহচর্যে থাকার পর এখন তার নিজেকে পবিত্র বলে মনে হচ্ছে।
একটানা ছয় দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর আমর দরবেশ সপ্তম দিন একজন দরবেশের বেশে নিজ এলাকায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। তাকে দরবেশ ও দেওয়ানা আলেমের পোশাক পরিধান করানো হলো। আশি তাকে বলেছিলো, আপনি যখন মিশন নিয়ে রওনা হবেন, আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবেন। তার আবার রক্ষার্থে আমর দরবেশ সুদানী সালারকে বললেন, পুরস্কার স্বরূপ মেয়েটিকে আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই। আমি তাকে সঙ্গে রাখতে চাই। সালার তার আবেদন মেনে নেয়। আশিকে তার সঙ্গে দেয়া হলো। প্রদান করা হলো তিনটি উট। একটিতে আমর দরবেশ আক্লোন করেন। একটিতে আরোহন করে আশি। অপরটিতে বোঝাই করা হলো তাঁর ও রসদ-সামন।
রওনা হওয়ার প্রাক্কালে সুদানী সালর আমর দরবেশকে অবহিত করে, ইসহাককে পাতাল কক্ষ থেকে বের করে উপরে আরামদায়ক উন্মুক্ত কক্ষে নিয়ে আসা হয়েছে। তাকে আরো জানানো হয়, মুসলমানদের এলাকায় আমাদের লোক আছে। তারা নিজ থেকে আপনার সঙ্গে মিলিত হবে এবং আপনাকে সাহায্য করবে।
আমর দরবেশ আশিকে সঙ্গে নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এক মিশনে রওনা হয়ে যান। আমর দরবেশকে রওনা করিয়েই সুদানী সালার নিজ কক্ষে চলে যায়। স্নেখানে ছয়জন লোক উপবিষ্ট। তারা সবাই সুদানী মুসলমান এবং পার্বত্য এলাকার বাসিন্দা। সুদান সরকার থেকে বহু সুযোগ-সুবিধা ও মান-মর্যাদা পাচ্ছে। নিজ এলাকায় খাঁটি মুসলমানরূপে জীবন-যাপন করে তারা।
সে রওনা হয়ে গেছে- সালার বললো- তোমরা অন্য পথে রওনা হও। একজন একজন করে যাবে। নিজ এলাকায় চলে যাও এবং তার উপর দৃষ্টি রাখো। যদি কখনো সন্দেহ হয় যে, সে ধোঁকা দিচ্ছে, তাহলে তাকে এমনভাবে খুন করে ফেলবে, যেনো কেউ টের না পায়। আমি আরো লোক পাঠাচ্ছি। তাদেরকে তোমাদের ঘরে থাকতে দেবে।
এরা একজন একজন করে রওনা হয়ে যায়। সুদানী সালার অপর দুজন লোককে ডেকে আনে। তারা সুদানী হলেও মুসলমান নয়। সালার তাদেরকে বললো- এই মুসলমানদের উপর ভরসা রাখা যায় না। নিজ এলাকায় গিয়ে কী করে বলা যায় না। এই যে ছয়জন লোক রওনা হয়ে গেলো, ওরা। আমাদেরই লোক। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, ওরা মুসলমান। ওখানে গিয়ে তাদের নিয়ত পাল্টে যেতে পারে। আমর দরবেশ যদি ঠিক থাকে, তাহলে তোমাদের দাহ্য পদার্থের প্রয়োজন হতে পারে। সেগুলো এদের ঘরে লুকিয়ে রাখা আছে। এগুলো কখন কোথায় ব্যবহার করতে হবে, তা তোমাদের জানা আছে।
এই দুজনও রওনা হয়ে যায়।
যে সিপাহী সুদানী কমান্ডারকে হত্যা করে ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যাকে রক্ষা করেছিলো, এখন সে ইসহাকের ঘরে অবস্থান করছে। আমর দরবেশ যেদিন রওনা হলো, সেদিন বাইরে এক স্থানে ঘোরাফেরা করছিলো। হঠাৎ একদিক থেকে একটি তীর এসে তার গা-ঘেঁষে একটি গাছে গিয়ে বিদ্ধ হয়। সিপাহী দৌড়ে ইসহাকের ঘরে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। ইসহাকের পিতাকে ঘটনাটি অবহিত করে। কিন্তু তীর কে ছুঁড়তে পারে, কেউই বুঝে উঠতে পারলো না। এটা যে তাকে হত্যা করার সুদানীদের প্রথম প্রচেষ্টা, তা কেউ জানে না।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান আলী বিন সুফিয়ান কায়রোতে অবস্থান করছেন। অপরদিকে সুলতান আইউবী, ক্রুসেডারদের সুহৃদ মুসলিম শাসক সাইফুদ্দীন, গোমস্তগীন ও আল-মালিকুস সালিহ-এর বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের কেন্দ্রীয় শহর হালবের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। সুলতান আইউবীর এই মুসলিম বিরুদ্ধবাদীরা এমন বিশৃঙ্খল অবস্থায় পলায়ন করেছিলো যে, পথে কোথাও দাঁড়াতে পারেনি। পথে এমন তিন-চারটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিলো, যেখানে তারা যাত্রাবিরতি দিয়ে বিক্ষিপ্ত সৈনিকদেরকে গুছিয়ে নিয়ে সুলতান আইউবীর মোকাবেলা করতে পারতো। কিন্তু সেসব পথে না গিয়ে তারা পিছু হটার জন্য এমন পথ অবলম্বন করে, যেটি সামরিক দিক থেকে তাদের জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। সুলতান আইউবী অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখেন এবং ঐসব গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো দখল করে নেন। তার গন্তব্য হাল।
