সুদান সরকার তথাকার মুসলমানদের নানাভাবে বাধ্য করার চেষ্টা করছে বে, মিশরী ফৌজে ভর্তি হওয়ার পরিবর্তে সুদানী ফৌজে ভর্তি হবে। কায়রোর গোয়েন্দা বিভাগ এ বিষয়ে অবগত। সুদানীরা মুসলমানদের উপর নিপীড়ন গলিয়েও দেখেছে। এর ফলে সুদানের ঊর্ধ্বতন এক সামরিক অফিসার গুপ্তভাবে খুনও হয়েছে। সুদান সেই এলাকায় যথারীতি সামরিক অভিযানও রিচালনা করেছিলো। মুসলমানরা সুদানী বাহিনীকে পাহাড়-উপত্যকায় ভঙ্গ করে হত্যা করেছিলো ও তাড়িয়ে দিয়েছিলো। সেখানকার ভৌগোলিক ঠামো মুসলমানদের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে। পাহাড় না তাদের নিরাপত্তা বিধান করতো। এই মুসলমানরা যোদ্ধাও ছিলো বটে।
সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে রেখেছিলেন। মিশরী বণিক কাফেলার মাধ্যমে তাদেরকে এতো পরিমাণ অস্ত্র দিয়ে রেখেছিলেন, যার দ্বারা তারা সারাবছর অবরোধের মধ্যেও লড়াই করতে সক্ষম ছিলো। তাদেরকে ক্ষুদ্র মিনজানীক এবং দাহ্য পদার্থও সরবরাহ করা হয়েছিলো। সুদানী মুসলমানরা সেগুলো ঘরে ঘরে লুকিয়ে রেখেছিলো। সুলতান আইউবীর পরিকল্পনা ছিলো, সামরিক অভিযান কিংবা অন্য কোনো উপায়ে উক্ত অঞ্চলকে মিশরের অন্তর্ভুক্ত করে নেবেন, যাতে সেখানকার মুসলমানরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে। এই অবস্থান সীমান্ত থেকে আধা দিনের পথ। আলী বিন সুফিয়ান সেখানে তার গোয়েন্দা পাঠিয়ে রেখেছিলেন, যারা শুধু সংবাদদাতাই নয় অভিজ্ঞ কমান্ডো যোদ্ধাও ছিলো।
এই মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো পাঁচ হাজার। সংখ্যায় কম হলেও তার বিরাট এক সামরিক শক্তি। এদের বাদ দিলে সুদানের হাতে থাকে শুধু কতিপয় হাবশী, যাদের কোনো সামরিক ঐতিহ্য নেই। তারা লড়াই করতে বেতনভোগী কর্মচারী হিসেবে। যুদ্ধের ময়দানে তাদের অবস্থা এই দাঁড়াতে যে, যদি তাতে দুশমনের পা উপড়ে যাওয়ার উপক্রম হতো, তাহলে তারা সিংহে পরিণত হতো। পক্ষান্তরে সামান্য বেকায়দায় পড়ে গেলে তারা পিছু হটতে শুরু করতো।
ইতিমধ্যে তাদের প্রশিক্ষণের জন্য খৃষ্টান বিশেষজ্ঞরা এসে গেছে এবং মিশরী ফৌজের দুতিনজন গাদ্দার সালার সোনা-দানার লোভে সুদান চলে এসেছে। খৃস্টান বিশেষজ্ঞ দল ও মিশরী সালারদের বদৌলতে সুদানী ফৌজে কিছুটা যোগ্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণেই সুদান সরকার মিশরের উপর প্রকাশ্য হামলা করতে ভয় পেতো এবং এ কারণেই সুদান মুসলমানদেরকে অদের ফৌজে শামিল করার চেষ্টা করছিলো। খ্রস্টান উপদেষ্টারা জানতো, পঞ্চাশ হাজার হাশীর মোকাবেলায় পাঁচ হাজার মুসলমানই যথেষ্ট।
***
আলী বিন সুফিয়ান সংবাদ পেয়ে গেছেন যে, সুদানের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় সে দেশেরই কয়েদখানার এক সিপাহী সুদানী ফৌজের এক কমান্ডারকে হত্যা করে মুসলমানদের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। সংবাদদাতা গুপ্তচর আলীকে পুরো ঘটনা শোনায়। এ গুপ্তচর ঘটনাটা সরাসরি সিপাহীর মুখ থেকে শুনে এসেছে এবং এ তথ্যও জেনে এসেছে যে, ইসহাক নামক এক মিশরী কমান্ডার সুদানের কয়েদখানায় বন্দী আছেন এবং এ উদ্দেশ্যে তার উপর নিপীড়ন চালানো হচ্ছে, যেনো তিনি তার এলাকার মুসলমানদের সুদানের অনুগত বানিয়ে দেন। গোয়েন্দা আলী বিন সুফিয়ানকে এ তথ্যও প্রদান করেন যে, উক্ত কমান্ডারের নিজ এলাকায় বেশ প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে।
ইসহাককে কয়েদখানা থেকে মুক্ত করা জরুরী মনে হচ্ছে- রিপোর্টটা মিশরের ভারপ্রাপ্ত গবর্নর আল-আদিলকে অবহিত করে আলী বিন সুফিয়ান বললেন- আপনি তো জানেন, কয়েদখানায় কিরূপ নিপীড়ন চলে। সেখানে শথিরও কথা বলতে বাধ্য হয়। নির্যাতনে বাধ্য হয়ে ইসহাক সুদানীদের অনুগত হয়ে যেতে পারে। আমি এ তথ্যও পেয়েছি, আমাদের আরো দুতিনজন মুসলমান কমান্ডার সুদানের কয়েদখানায় বন্দী আছে। তাদের এত্যেকেরই উপর নিপীড়ন চলছে। আমি তো আপনাকে এ পরামর্শ দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবো না, আমাদের কয়েকজন কমান্ডো সেনাকে সুদানের মুসলিম এলাকায় প্রেরণ করুন। আমার আশংকা হচ্ছে, কমান্ডার হত্যার প্রতিশোধ রূপ সুদানী বাহিনী মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে বসবে।
অন্য দেশে কমান্ডো প্রেরণ করার আগে আমাদেরকে সবদিক ভালোভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে- আল-আদিল বললেন- এর পরিণতিতে প্রকাশ্য যুদ্ধও বেঁধে যেতে পারে।
আমাদের হাতে ভাববার মতো সময় নেই- আলী বিন সুফিয়ান বললেন এক্ষুণি আমাদেরকে দুটি অভিযান পরিচালনা করা আবশ্যক। প্রথমত, একজন বিচক্ষণ দূতকে পয়গাম দিয়ে মোহতারাম সুলতানের নিকট প্রেরণ করতে হবে এবং তার সিদ্ধান্ত জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমি স্বয়ং সুদানে প্রবেশ করে মুসলমানদের এলাকায় চলে যাবো। ওখানকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। পরিস্থিতির সঠিক চিত্র শুধু আমার চোখই দেখতে পারে। হতে পারে, ওখানে ফৌজ হামলা করবে না। ওখানে খৃষ্টানও আছে। তারা মুসলমানদেরকে কুসংস্কারে লিপ্ত করে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী ও বিশ্বাসের ভিত টলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে পারে। মসজিদে মসজিদে তাদের প্রশিক্ষিত মাওলানা প্রেরণ করে মুসমানদের বিভ্রান্ত করতে পারে। তারা মিশরে অনুপ্রবেশ করেও এমন চাল চেলেছে। আমার প্রবল আশংকা, তারা মুসলমানদের বিশ্বাস ও জাতীয় চেতনার উপর হামলা চালাবে। আপনার তো জানা আছে, আমাদের মুসলিম সম্প্রদায় দুশমনের আবেগময় ও উত্তেজনাকর বক্তব্যে দ্রুত বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। আমাদের শত্রুরা বুঝে ফেলেছে, মুসলমানকে যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত করা সহজ নয়। বিকল্প হিসেবে তারা বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার যুদ্ধে এমন অস্ত্র ব্যবহার করে, মুসলমান তাতে কাবু হয়ে যায়। আপনার অনুমতি পেলে আমি ওখানে চলে যাচ্ছি। আপনি সুলতান আইউবীর নিকট একজন দূত পাঠিয়ে দিন।
