আমি পরাজিত সৈনিক- আমর দরবেশ বললেন- আমার আত্মা মরে গেছে। নিজ দেহের প্রতি আমার ঘৃণা জন্মে গেছে। কোনো প্রয়োজনের অনুভূতি আমার নেই। কয়েদখানায় সিদ্ধ পাতা খেয়েও আমি আনন্দ পেয়েছি। এখানে এতো সুস্বাদু রাজকীয় খাবার খেয়েও তৃপ্ত। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে আমি আনন্দিত নই। আমি পরাজিত।
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে ওঠে। যেনো কোনো রসিক বন্ধু তার গায়ে পানি ছিটিয়ে দিয়েছে।
দু-চার ডোক মদ আপনাকে আনন্দে উদ্বেলিত করে তুলবে- মেয়েটি বললো- কয়েক ঢোক লাল পানি কণ্ঠনালী অতিক্রম করার পর আমার প্রতি তাকাবেন। তখন আমার মধ্যে ফুলের সৌন্দর্য দেখতে পাবেন।
আমার সমস্যাটা হলো, আমি মুসলমান- আমর দরবেশ বললেন আমরা সম্ভ্রম নিয়ে খেলা করি না, বরং আমরা সন্ধ্রমের সুরক্ষা করে থাকি।
সে তো মুসলমান মেয়েদের সম- মেয়েটি বললো- আমি মুসলমান নই। তোমার সম্ভ্রমের প্রতি লক্ষ্য রাখবো। নারী মুসলমান হোক কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন জাতির; মুসলমান যদি পাক্কা ঈমানদার হয়, তার সম্প্রমের হেফাজত করবেই। তুমি সারা রাত আমার কাছে বসে থাকে। সকালে সকলের নিকট বলে বেড়াবে, গত রাতটা আমি একটা পার্থরের কাছে অতিবাহিত করেছি।
আমি কি রূপসী নই? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
যেমনই হয়ে থাকো, তুমি আমার কোনো কাজের নও- আমর দরবেশ বললেন- আমি বরং তোমার কাজে আসতে পারি। তুমি যদি এই লাঞ্ছনাময় জীবন থেকে মুক্তি পেতে চাও, তাহলে জীবন বাজি রেখে হলেও আমি তোমাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাবে এবং কোনো ভদ্র ঘরে পুনর্বাসন করে দেবো।
আপনার আগেও এক ব্যক্তি এখানে এসেছিলেন- আশি বললো- তিনিও আপনার ন্যায় কথা বলতেন। তিনিও সুদানী মুসলমান ছিলেন। মুসলমান বিধায় নারীর প্রতি আপনার কোনো আকর্ষণ নেই, আপনার এ দাবি আমি মানতে পারছি না। আমি মিশরের এমন অনেক মুসলমানকে দেখেছি, যারা নারী পেলে ক্ষুধার্ত জন্তুতে পরিণত হয়। আমি এমন তিনজন মিশরী মুসলমানের নাম বলতে পারবো, যাদেরকে আমি এবং সোরাহী বিশ্বাসঘাতকে পরিণত করেছে। তারা কিরূপ মুসলমান?
তারা ঈমান বিক্রেতা- আমর দরবেশ বললেন- তুমি যখন কথা বললো, তখন আমি তোমার চেহারা ও চোখে তোমার মাতা-পিতার ঝলক দেখার চেষ্টা করছি। তারা কোথায়? বেঁচে আছেন কি?
জানি না- আশি বললো- আপনার পূর্বে যিনি এখানে এসেছিলেন, তিনিও জিজ্ঞেস করেছেন, আমার বাবা-মা বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন।
আশি ইসহাকের প্রসঙ্গ টেনে আনে। ইসহাককে যখন এই কক্ষে রাখা। হয়েছিলো, তখনও এই মেয়েটিকেই তার কাছে এখানে পাঠানো হয়েছিলো। মেয়েটি আমর দরবেশকে বললো- ঐ সুদানী মুসলমান আমার পিতা-মাতা সম্পর্কে প্রশ্ন করে আমাকে অস্থির করে তুলেছিলো। ইতিপূর্বে তিনি ব্যতীত আর কেউ আমাকে আমার পিতা-মাতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেনি। তাই অপ্রীতিকর প্রশ্নের ফলে আমি রাত ভাবতে থাকি, আমার পিতামাতা কারা এবং কিরূপ ছিলেন ছিলো তো অবশ্যই। কিছু কিছু স্মৃতি মনে আসে আবার অন্ধকারে হারিয়ে যায়। এখন আমি নিজেকে তাদের স্বরণ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু সফল হইনি। আজ আপনি পুনরায় নতুন করে তাদের কথা মনে করিয়ে দিলেন। আমার পিতা-মাতা থাকতে পারে- এমন ভাবনা যখন আমার থাকে না, তখন আমি ভালো থাকি।
তোমার কোনো ভাই ছিলো?
স্মরণ নেই- আশি বললো- রক্ত সম্পর্ক কী জিনিস, আমি জানি না।
তোমার ঘুম আসছে, শুয়ে পড়ে। আমর দরবেশ বললেন।
আমার মন চায় বসে বসে আপনার কথা শুনি- আশি বললো- আপনার। মতো মানুষগুলোকে আমার খুব ভালো লাগে। আমি যারই সঙ্গে কিছু সময় অতিবাহিত করি, তার প্রতি আমার ঘৃণা জন্মে যায়। আপনার পূর্বে যে সুদানী মুসলমান এখানে এসেছিলো, তাকে আমার সারাজীবন স্মরণ থাকবে। আর আপনি দ্বিতীয় ব্যক্তি, যাকে আমি আজীবন শ্রদ্ধা করবো। আপনি আমার মধ্যে আত্মা ও চেতনাকে জাগ্রত করে দিয়েছেন। আপনি সম্ভবত আমাকে হৃদয়ের চোখে দেখছেন। অন্যরা আমাকে দেখে ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে।
আমি তোমাকে সম্ভ্রমহারা নারী মনে করতাম- আমর দরবেশ বললেন কিন্তু এখন দেখছি তুমি বুদ্ধির কথা বলছে।
আমি প্রিয়দর্শিনী ও মধুর বিষ- আশি বললো- আমাকে পাথরকে মোমে পরিণত করার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আমি কোনো সহজ-সরল মেয়ে নই। আমি প্রতাপান্বিত শাসকের তরবারী আমার পায়ের উপর রাখাতে জানি। আমি আলেমদের আদর্শ পরিবর্তন করে দিতে পারি। কিন্তু এখন নিজেকে এমন এক মোম বলে মনে হচ্ছে, যা সামান্য তাপেই গলে যাবে, যা কোনো পাথরকে, গলাতে সক্ষম নয়।
এটা আমার বক্তব্যের ক্রিয়া নয়- আমর দরবেশ বললেন- এটা আমার ঈমানের উত্তাপ, যা তোমাকে বিগলিত করে ফেলেছে। আমি তোমার মাঝে রক্ত সম্পর্ক জাগিয়ে দিয়েছি। তুমি মানুষ। তুমি কারো কন্যা, তুমি কারো। বোন। তুমি কোনো একটি জাতির স্ট্রম।
রাত কেটে যাচ্ছে। একদিকে ঘুমের আবেশ, অপরদিকে আমর দরবেরি বক্তব্য আশির উপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। মেয়েটি পালংকের কোণে বসা ছিলো। সেখানেই এলিয়ে পড়ে সে।
ঘুম ভাঙ্গার পর আশি দেখতে পেলো, সে পালংকে শায়িত আর আমর দরবেশ মেঝেতে। ঘুমন্ত আমরের প্রতি এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আশি। বুকের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য জেগে ওঠে। নিজের গওদেশে অশ্রুর উপস্থিতি অনুভব করে সে। বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবে, আরে আমার অশ্রুও তে আছে তাহলে। ইতিপূর্বে আশির চোখ থেকে কখনো অশ্রু বের হয়নি। ধীরে ধীরে আমর দরবেশের নিকটে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বলে তার ডান হাতটা উপরে তুলে এনে নিজের চোখের সঙ্গে লাগায়।
