আমাদের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে- আমর দরবেশ বললেন- আমরা মিশর থেকে কমান্ডো বাহিনীর সাহায্য নিতে পারি। এক্ষুণি যা প্রয়োজন, তাহলো, আমাদের একজন বেরিয়ে যাবো। আমরা দুজনই যদি একসঙ্গে তাদের শর্ত মেনে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারি, তাহলে আরও ভালো হবে।
আমি এখানেই থাকবো- ইসহাক বললেন- তুমি তাদেরকে ধোঁকা দাও। আমরা দুজনই যদি একসঙ্গে তাদের দাবি মেনে নেই, তাহলে তারা বুঝে ফেলবে, এক কক্ষে অবস্থান করে আমরা পরামর্শের মাধ্যমে কোনো পরিকল্পনা ঠিক করেছি। আমি তাদের নিপীড়ন ভোগ করতে থাকবো। তুমি বেরিয়ে যাও।
***
রাত পোহাবা মাত্র কক্ষের দরজা খুলে যায়। এক সিপাহী বর্শার আগা দ্বারা খোঁচা দিয়ে জাগিয়ে তুলে ধাক্কাতে ধাক্কাতে সঙ্গে করে ইসহাককে নিয়ে যায়। কক্ষের দরজা পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর সুদানী ফৌজের এক কর্মকর্তা এসে হাজির হয়। সে দেয়ালের ফাঁক দিয়ে আমর দরবেশকে জিজ্ঞেস করে- আজও যদি তুমি অস্বীকার করো, তাহলে কল্পনা করতে পারবে না তোমার শরীরের দশা কী হবে। আমরা তোমাকে মরতে দেবো না। দুনিয়াতেই তুমি জাহান্নাম দেখতে পাবে। প্রতিদিনই মরবে, প্রতিদিনই জীবিত হরে।
আমাকে কোনো একটি ভালো জায়গায় নিয়ে যাও- আমর দূরবেশ বললেন আমার দেহটাকে একটু শান্তি দাও। এখানে আমি কিছুই ভাবতে পারি না।
আমি তোমাকে জান্নাতে নিয়ে বসাতে পারি- সুদানী কর্মকর্তা বললো আমি তোমাকে জান্নাতের হুরদের মাঝে বসাবো। কিন্তু সেখানেও যদি আমাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করো, তাহলে যততদিন বেঁচে থাকবে, আফসোস করবে। কেঁদে কেঁদে আমাদের বলবে, আমি তোমাদের প্রস্তাব মেনে নিয়েছি। কিন্তু তখন আর আমরা তোমাকে বিশ্বাস করবো না।
আমর দরবেশ কোকাচ্ছেন। চোখ দুটো পুরোপুরি খুলতে পারছেন না। তিনি কর্মকর্তার কানে ফিসফিসিয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন- এমনটা হবে না। আমাকে কোথাও নিয়ে চলে এবং বলল, আমাকে কী করতে হবে।
আমর দরবেশকে তখনই সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হলো এবং ইসহাককে যেরূপ বিলাসবহুল কক্ষে রাখা হয়েছিলো, তেমনি এক কক্ষে রাখা হলো। সামান্য পরে একজন ডাক্তার এসে উপস্থিত হন। তিনি তার দেহ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ওষুধ দিয়ে যান। তাকে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হতো। এ সময়ে ইসহাককে নিপড়িনকারী সেই সুদানী সালার আমর দরবেশকে জিজ্ঞেস করে- তুমি কি আমাদের সবগুলো প্রস্তাব মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছো? আমর দরবেশ মাথা নেড়ে সম্মতিসূচক জবাব দেন। তারপর আহার শেষ করেই শুয়ে পড়েন। আমর দরবেশ গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। হয়ে পড়েন।
গোটা রাত এবং পরবর্তী দিনের অর্ধেক অতিবাহিত হওয়ার পর আমর দরবেশের ঘুম ভাঙ্গে। তিনি কয়েদখানায় বহুদিন যাবত নিপীড়ন ভোগ করে আসছেন। শরীর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। হাড়-চামড়ার মাঝে গোশত নেই। শুলে হাড়ে ব্যথা পান। কিন্তু এখন সুদর্শন কক্ষে মনোরম গালিচায় কয়েক ঘন্টা ঘুমাবার পর তার দেহে সুস্থতা ও সজীবতার ভাব ফুটে উঠেছে। তাকে ওষুধ সেবন করানো হয়েছে। খাওয়ানো হয়েছে রাজকীয় খাবার।
চোখ খুলে দেখতে পান এক যুবতী তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে হাসছে। অত্যন্ত রূপসী। মাথাটা উন্মুক্ত। ঝলমলে রেশমী চুল। কাঁধ, বাহু ও বুকের অনেকখানি উদোম।
আমর দরবেশ সৈনিক মানুষ। জন্মেছেন জঙ্গলে। যৌবনে কেটেছে যুদ্ধের ময়দানে। মেয়েটিকে তার কাছে স্বপ্ন মনে হলো। কিন্তু মেয়েটি এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলালে তিনি নিশ্চিত হন এটা স্বপ্ন নয়, বাস্তব।
মেয়েটি কক্ষ থেকে বের হয়ে ডাক্তারকে ডেকে আনে। ডাক্তার তার স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নিয়ে ওষুধ খাইয়ে চলে যান।
খানিক পর এসে উপস্থিত হয় দুজন খৃস্টান। তারা অনর্গল সুদানী ভাষায় কথা বলছে। নাশকতায় অভিজ্ঞ। তারা আমর দরবেশকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে যে, নিজ এলাকায় গিয়ে বলবে না, তুমি আমাদের হাতে বন্দী ছিলে। বরং বলবে, যুদ্ধের ময়দানে এক বুযুর্গের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো, যিনি বলেছেন মিশরী বাহিনীর সুদান আক্রমণ ভুল প্রমাণিত হবে। মুসলমানদের জন্য উত্তম হলো, তারা সুদানের সঙ্গে যোগ দেবে। অন্যথায় তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। তুমি, একজন দেওয়ানা আলেমের বেশে মুসলমানদের অন্তরে সালাহুদ্দীন আইউবী ও মিশর সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করবে।
আমর দরবেশ হাসিমুখে সম্মতি প্রকাশ করেন। তৎক্ষণাৎ তার প্রশিক্ষণ ও রিহার্সেল শুরু হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর কয়েকটি মেয়ে তার জন্য খাবার নিয়ে আসে। এনে হাজির করে মদও। আমর মদ পান করতে অস্বীকার করেন। আহার শেষে এই মেয়েরা চলে যায়। রাতের পোশাকে এসে উপস্থিত হয় অপর এক মেয়ে। দেহটা অর্ধনগ্ন। চাল-চলন, ভাবভঙ্গী উত্তেজনাকর।
তুমি কেন এসেছ? আমর দরবেশ মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করেন।
আপনার জন্য মেয়েটি জবাব দেয়- আমি আপনার কাছে থাকবো।
তোমার নাম কি?
আশি। নামটা বলেই মেয়েটি আমর দরবেশের পালংকের উপর বসে পড়ে।
আমি আদেশ পেয়ে এসেছি, আমাকে আপনার সঙ্গে থাকতে হবে।
এরা আমার থেকে যা আদায় করতে চাচ্ছে, আমি তা মেনে নিয়েছি- আমর দরবেশ বললেন- তোমার ন্যায় সুদর্শন ফাঁদের কোনো প্রয়োজন নেই।
আমি জানি- আশি বললো- আমাকে আপনার সম্পর্কে সবকিছু বলা হয়েছে। আমি পুরস্কার হিসেবে এসেছি। আমি জানি আমাকে আপনার প্রয়োজন রয়েছে। সৈনিক যখন রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসে, তখন তার আত্মা, নারীর প্রয়োজন অনুভব করে থাকে।
