শুনে সালার বললেন- সব জানা যাবে।
মুসলমানদের উক্ত অঞ্চলে সুদানীরা তাদের গুপ্তচর ছড়িয়ে রেখেছিলো, যারা ওখানকার মুসলমানদেরই একজন। ওখানে তাদের একমাত্র কাজ প্রবৃত্তি। তারাই ইসহাক সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলো, ঐ অঞ্চলে তিনি একজন এভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
সালারের ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। সন্ধ্যার পর দুজন গুপ্তচর সেখান থেকে এসে পৌঁছে। তারা সালারকে জানায়, কমান্ডার ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু আমাদের কয়েদখানার এক সিপাহী পথে কমান্ডারকে হত্যা করে মহিলা দুজনকে ফেরত নিয়ে গেছে। গোয়েন্দারা সিপাহীর নামও জানায়। সালার বিষয়টি সুদানের সম্রাটকে অবহিত করে। সম্রাট জানায় খৃস্টান উপদেষ্টাদের। খৃস্টান উপদেষ্টারা পরামর্শ দেয়, তোমরা চুপ থাকো। মুসলমানদের উপর হামলা করার মতো বোকামী করো না। তাদেরকে কৌশলে বন্ধুতে পরিণত করার চেষ্টা করো। বড়জোর এটুকু করতে পারো যে, উক্ত সিপাহীকে গোপনে হত্যা করাও, যাতে মুসলমানরা বুঝতে পারে, আমাদের হাত সর্বত্র পৌঁছতে পারে। ইসহাক যদি তোমাদের শর্ত মেনে না নেয়, তাহলে অন্য কোনো সুদানী মুসলমানকে টার্গেট করো এবং ইসহাকের নির্যাতন অব্যাহত রাখো।
ইসহাককে পুনায় নিপীড়নের যাঁতাকলে নিক্ষেপ করা হলো। এবার তার, থেকে কমান্ডার হত্যার প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে সালার। তাকে এমন পাশবিক নির্যাতনে নিষ্পিষ্ট করা হলো, যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। রাতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন ইসহাক। অচেতন অবস্থায়ই তাকে একটি কক্ষে নিক্ষেপ করা হলো। যখন তার জ্ঞান ফিরে আসে, তখন কক্ষে ঘোর অন্ধকার। বাইরে একটি প্রদীপ জ্বলছে। ইসহাক অন্ধকারে একদিকে হাত বাড়ালে হাত কারো গায়ের সঙ্গে লাগে। তার স্মরণে এসে যায়, এতো সেই লাশ, যেটি প্রথম দিন থেকে তার সঙ্গে পড়ে আছে। কিন্তু তার কাছে মনে হলো, লাশটা নিঃশ্বাস গ্রহণ করছে। তার শরীরের অবস্থা এতই শোচনীয় যে, উঠে বসার শক্তি নেই।
হঠাৎ লাশটা নড়ে ওঠে। ইসহাক চমকে ওঠে তাকায়। লাশের চেহারায় দৃষ্টিপাত করে। এ্যা, এতো সেই লাশ নয়, এতো অন্য কোনো জীবিত মানুষ এবং এটি অপর একটি কক্ষ। লোকটি সম্ভবত অচেতন। পরে ধীরে ধীরে তার চৈতন্য ফিরে আসে এবং চোখ খুলে। ইসহাক বড় কষ্টে উঠে বসে জিজ্ঞেস করে- তুমি কে?
আমর দরবেশ। অতিশয় ক্ষীণ কণ্ঠে লোকটি জবাব দেয়।
আহ! আমর দরবেশ- ইসহাক চমকে ওঠে বললেন- আমি ইসহাক।
ইসহাক ও আমর দরবেশ একে অপরকে ভালোভাবেই চেনে। আমর দরবেশও সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজের একটি ইউনিটের কমান্ডার ছিলেন। তিনি সেই মুসলমান কবিলার লোক, যারা সুদানী হওয়া সত্ত্বেও সুদানী ফৌজে ভর্তি হওয়া থেকে বিরত থাকছে। আমর দরবেশও এখন, যুদ্ধবন্দী। ইসহাকের নাম শুনে তিনি উঠে বসেন।
তারা তোমাকে কী বলছে? ইসহাক জিজ্ঞেস করেন।
তারা বলছে- আমর দরবেশ জবাব দেন- তুমি আলেমের বেশ ধারণ করে নিজ এলাকায় গিয়ে লোকদের অন্তরে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে শত্রুতা সৃষ্টি করে। আমরা তোমাকে কৌশল বলে দেবো, তোমাকে রাজপুত্রের ন্যায় রাখবে এবং যে মেয়েকে পছন্দ হয়, তোমার সঙ্গে দেবো। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছি, তোমাদের উদ্দেশ কি? তারা বলেছে, তুমি তোমার সবকটি গোত্রকে সুদানের অনুগত বানিয়ে দাও। বিনিময়ে তারা আমাকে মুসলিম অঞ্চলের আমীর নিযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এরা মুসলমানদের আলাদা বাহিনী গড়তে চায়।
আমি জানতে পেরেছি- আমর দরবেশ বললেন- তারা তোমাকে অনেক কষ্ট দিচ্ছে। বুঝতে পারছি না, আমাদের দুজনকে কেননা এক কক্ষে আবদ্ধ করলো। এর মধ্যে কল্যাণ থাকতে পারে। আমি তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছিলাম। আমি একটা পন্থা ভেবেছি। সে মতে কাজ করার আগে তোমার অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন ছিলো। ভালোই হলো, তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেছে।
কী পন্থা ভেবেছেন? ইসহাক জিজ্ঞেস করেন।
তুমি তো বুঝতে পারছে, এরা আমাদেরকে ছাড়বে না- আমর দরবেশ বললেন- আমরা কতকাল নিপীড়ন সহ্য করবো। আজ না হোক কাল তো আমাদের মরতেই হবে। এখানে আরো কয়েকজন সুদানী মুসলমান বন্দী আছে। কেউ না কেউ তাদের হাতে এসে যাবে। আমার আশংকা, এরা আমাদের কোনো না কোনো সহকর্মীকে ফাঁদে ফেলে আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করবে। একটা পন্থা এই হতে পারে যে, আমরা এদের শর্ত মেনে নিয়ে এখান থেকে মুক্তি লাভ করবো এবং এলাকায় গিয়ে কোনো কাজ করবো না। আমরা রাতের আঁধারে গোপনে মিশর চলে যাবো। আমাদের বেঁচে থাকা প্রয়োজন। দ্বিতীয় পন্থা হলো, আমি এদের সব প্রস্তাব মেনে নেবো। এরা আমাকে যা যা পাঠ শোনাবে, আমি সব পড়ে নেবো। তাদের নির্দেশিত বেশ ধারণ করবো এবং গোত্রের লোকদেরকে সাবধান করে দেবো, যেনো তারা সুদানীদের কারো খপ্পরে না পড়ে। বের হয়ে আমি তোমাদেরকে এখান থেকে বের করে নেয়ার চেষ্টা করবো।
এ-ও তো হতে পারে যে, তখন সুদানীরা আমাদের এলাকার উপর হামলা করে বসবে- ইসহাক বললেন- আমাদের জনগণ অতো তাড়াতাড়ি অস্ত্র সমর্পণ করার মতো লোক নয় বটে; কিন্তু সেনাবাহিনীর শক্তিও অতো দ্রুত নিঃশেষ হবে না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়ে সাধারণ জনতার পেরে ওঠা সহজ হবে না।
