তুমি কে?- ইসহাকের স্ত্রী জিজ্ঞেস করে- তুমি কি মুসলমান?
আমি কয়েদখানার সিপাহী- সিপাহী জবাব দেয়- আমি মুসলমান নই।
তাহলে আমাদের জন্য তোমার হৃদয়ে দয়া জাগলো কেন?
আমি শুনেছি, মুসলমানদের একজন পয়গম্বর আছেন- সিপাহী বললো তোমার স্বামীকে পয়গম্বর বলে মনে হচ্ছে।
ইসহাকের স্ত্রী জানতে চায়, তুমি কেন আমার স্বামীকে পয়গম্বর মনে করছে। সিপাহী আসল ঘটনা এড়িয়ে গিয়ে বললো- আমি তাকে সত্য পয়গম্বর মনে করি। তিনি মুসলমান এবং কয়েদখানায় বন্দী। আমি মুসলমান নই। তার স্ত্রী ও কন্যাকে লাঞ্ছিত করার যে আয়োজন চলছে, তা তিনি জানেন না। আমার অন্তরে ইচ্ছা জাগলো, তোমাদের দুজনের ইজ্জত রক্ষা করবো। আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি এমন কাজ করে ফেলেছি, যা আমার সামর্থের বাইরে ছিলো। এ তারই অদৃশ্য শক্তি। আমি তাকে পয়গম্বর মনে করি।
***
রাতের শেষ প্রহরে চারটি ঘোড়া ইসহাকের ঘরের সম্মুখে গিয়ে থেমে যায়। ঘরের দরজায় করাঘাত পড়ে। পুত্রবধূ ও নাতনীর সঙ্গে ভিন্ন এক পুরুষকে দেখে ইসহাকের পিতা বিস্মিত হন। ভেতরে প্রবেশ করে সিপাহী তাকে পুরো ঘটনা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে। কিন্তু কয়েদখানায় ইসহাকের সঙ্গে, কিরূপ আচরণ চলছে, তা গোপন রাখে। ইসহাকের পিতা তৎক্ষণাৎ গোত্রের লোকদেরকে বিষয়টি অবহিতু করে। মানুষ এসে ইসহাকের বাড়িতে ভিড় জমায়। সিপাহী তাদেরকে জানায়, ইসহাককে এই শর্তে মুক্তি দেয়ার কথা বলা হচ্ছে যে, তিনি আমাদের সব মুসলমানকে, সুদানী ফৌজে শামিল করে দেবেন এবং আপনারা সবাই সুদানের অনুগত হয়ে যাবেন। কিন্তু ইসহাকের বক্তব্য আমাকে জীবনে মেরে ফেলো, তবু আমি আমার স্বজাতির সঙ্গে গাদ্দারী করতে পারবো না।
শুনে সবাই আৎকে ওঠে এবং সুদানকে গালমন্দ করতে শুরু করে। একজন বললো- এখানে সালাহুদ্দীন আইউবীর আগমন ঘটবে। এটা আল্লাহর জমিন।
আমরা কয়েদখানা আক্রমণ করে ইসহাককে উদ্ধার করবো। এক ব্যক্তি বললো।
তোমাদের পক্ষে এ কাজ সহজ নয়- সিপাহী বললো- পাতাল কক্ষ থেকে কাউকে বের করে আনার সাধ্য তোমাদের নেই।
তুমি তো কয়েদখানার সিপাহী- ইসহাকের পিতা বললেন- তুমি সহযোগিতা করতে পারো।
আমি গরীব এবং সাধারণ একজন সৈনিক- সিপাহী বললো- আমি আপনার পুত্রকে পয়গম্বর মনে করি। আমি তাকে বলেছি, তুমি আমার ভাগ্য বদলে দাও। তিনি বলেছেন, এখান থেকে বের হয়ে আমি তোমার ভাগ্য বদলে দেবো। সময় যতো অতিক্রম করছে, তার প্রতি আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আপনারা সবাই তার জন্য জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত আছেন। আমার জীবনও কি তেমন হতে পারে না, যেমনটা আপনাদের?
তুমি মুসলমান হয়ে যাও এবং এখানেই থাকো- ইসহাকের পিতা বললেন- আমরা সবাই জান্নাতে বাস করি। এখানকার জমি এতো অধিক ফসল উৎপন্ন করে যে, যারা কৃষি কাজ করে না, তাদেরও না খেয়ে থাকতে হয় না। এটা আমাদের আল্লাহর অনুগ্রহ। তুমি আমাদের নিকট এসে পড়ো এবং ভাগ্য পরিবর্তন করো। আমরা স্বাধীন। এখানকার পর্বতমালা আমাদের দুর্গ। এই দুর্গ আল্লাহ আমাদের জন্য বানিয়ে দিয়েছেন।
সিপাহী ইসহাকের এলাকায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইসহাকের পিতার হাতে কালেমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে সেখানেই বসবাস করতে শুরু করে।
এখন ভোর বেলা। সুদানী সালার অস্থিরচিত্তে কমান্ডারের আগমনের অপেক্ষা করছে। কিন্তু তার কোনো খোঁজ নেই। সূর্য মাথার উপর ওঠে আসছে আর সালারের অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার ধারণা, কমান্ডার পথ ভুলে গেছে। সে অপর এক কমান্ডারকে ডেকে দায়িত্ব বুঝিয়ে পথের নির্দেশনা দিয়ে রওনা করিয়ে দেয়। ইসহাক কক্ষে আবদ্ধ। সারাটা দিন তার এই অবরুদ্ধ অবস্থায় কেটেছে। তার কক্ষে পড়ে থাকা লাশটি গলতে শুরু করেছে। কয়েদখানার যে সান্ত্রী মানুষের হাড় ভাঙ্গা এবং পাতাল প্রকোষ্ঠের দুর্গন্ধ সহ্য করতে অভ্যস্ত, সেও ইসহাকের কক্ষের নিকটে যেতে আপত্তি করছে। এক সান্ত্রী নাকে হাত রেখে ইসহাককে জিজ্ঞেস করলো- হতভাগা! এতো দুর্গন্ধ তুমি কিভাবে সহ্য করছো? এরা তোমার নিকট যা যা দাবি করছে, তুমি মেনে নাও এবং এখান। বেকে মুক্তি গ্রহণ করো। তুমি তো এই মুদারের গন্ধে পাগল হয়ে যাবে।
আমার কোনো দুর্গন্ধ অনুভব হচ্ছে না- ইসহাক বললেন- এটা মুর্দার নয়, ইনি শহীদ। আমি রাতে তার গা ঘেঁষে ঘুমাই।
তুমি পাগল হয়ে গেছো- সান্ত্রী বললো- লাশের দুর্গন্ধের ক্রিয়া এমনই হয়ে থাকে।
ইসহাকের মুখে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। তিনি লাশটির সন্নিকটে বসে রআন তিলাওয়াত করতে শুরু করেন।
কেটে গেছে এ রাতটিও। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে সালার পরবর্তী যে কমান্ডারকে প্রেরণ করেছিলেন, সে ফিরে আসে। লাগাতার দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত কমান্ডার যা কিছু দৈখে এসেছে, তা বিবৃত করতে তার ঠোঁট কাঁপছে। সে সালারকে জানায়, পথে কিছু এলাকা বালির টিলা ও পর্বতময়। দেখলাম, এক স্থানে অনেকগুলো শকুন একটি মুর্দা খাচ্ছে। পার্শ্বেই এক স্থানে পড়ে আছে একটি তরবারী, এক জোড়া জুতা ও কিছু কাপড়-চোপড়। শকুনগুলোকে তাড়িয়ে দেয়ার পর বুঝতে পারলাম, ওরা যা খাচ্ছিলো ওটি একটি মানুষের লাশ। লাশের মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেছে। পার্শ্বে পরিত্যক্ত যার ও চামড়ার বেল্ট ইত্যাদি দেখে আমি নিশ্চিত হই যে, এটি আমাদের সুদানী কমান্ডারের লাশ। আমি কিছুদূর সম্মুখে এগিয়ে মাটি পরখ করে ঘোড়ার পদচিহ্ন দেখতে পাই। তাতে বুঝা গেলো, এই কমান্ডার পাহাড়ী এলাকায় প্রবেশ করছিলো। তবে সে মহিলা দুজনকে নিয়ে এসেছিলো কিনা এবং তাকে কে খুন করলো, বুঝা গেলো না।
