পর্দার আড়াল থেকে এক নারীকণ্ঠ ভেসে আসে- হ্যাঁ, আমরা প্রস্তুত।
সঙ্গে কোনো পুরুষ যেতে পারবে কি?- বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করেন- আমিও আমার পুত্রকে দেখতে চাই।
সফর অনেক দীর্ঘ- কমান্ডার বললো- আপনি এতো দীর্ঘ ঘোড়সাওয়ারী : বরদাশত করতে পারবেন না। আমি শুধু ইসহাকের স্ত্রী-কন্যাকেই নিয়ে যাওয়ার আদেশ পেয়েছি।
কয়েদখানার সিপাহী ডিউটি শেষ করে বাড়ি চলে যায়।-অদ্রুিত পোশাক পরিবর্তন করে সে। মাথাটা এমনভাবে ঢেকে নেয় যে, মুখমণ্ডলও আবৃত হয়ে গেছে। ঘোড়ার সঙ্গে খাদ্য-পানি বেঁধে নিয়ে কাউকে কিছু না বলেই রওনা দেয়। ইসহাকের বাড়ির পথ আগেই জেনে নিয়েছে সে। সালার যখন কমান্ডারকে ইসহাকের বাড়ির পথ নির্দেশ করেছিলো, এই সিপাহী তখন পার্শ্বে দণ্ডায়মান ছিলো। ইসহাকের প্রতি ভক্তিতে পরিপূর্ণ তার হৃদয়। লোকালয় থেকে বের হয়ে দ্রুত ঘোড়া হাঁকায় সিপাহ। কমান্ডার তো চলে গেছে তারও বহু আগে। কাজেই তার আগে ইসহাকের বাড়ি পৌঁছা সিপাহীর পক্ষে সম্ভব নয়।
***
ইসহাকের পিতার নিকট দুটি ঘোড়া ছিলো। তিনি ঘোড়াগুলোকে প্রস্তুত করে দেন। ইসহাকের কন্যা ও স্ত্রী ঝটপট প্রস্তুত হয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসে। এলাকার আরো কতিপয় লোক এসে জড়ো হয়। তারাও সুদানী কমান্ডারের বক্তব্যে বিশ্বাস স্থাপন করে ইসহারে কন্যা ও স্ত্রীকে কমান্ডারের সঙ্গে বিদায় করে দেয়।
রাতের সফর। পথে কোথাও যাত্রাবিরতি দেয়া যাবে নাঃ ইসহাকের ভাবনায় দুমহিলার চোখের নিদ্রা উড়ে গেছে। তাদের পক্ষে ঘোড়সওয়ারী নতুন কিংবা কঠিন বিষয় নয়। এখানকার মুসলমানরা তাদের সন্তানদের অশ্বারোহন ও তীরচালনা শৈশবেই শিক্ষা দিয়ে থাকে।
তিনটি ঘোড়া পাহাড়ী এলাকা থেকে বেরিয়ে গেছে। কমান্ডার এই ভেবে আনন্দিত যে, সে সাফল্যের সাথে ইসহাকের স্ত্রী-কন্যাকে জালে আটকাতে সক্ষম হয়েছে।
ইসহাক সেই প্রকোষ্ঠে বসে আছেন, যেখানে মিশরী সৈনিকের গলিত লাশ পড়ে ছিলো। এই লাশ সেখানে তাকে অস্থির করে তোলার জন্য রাখা হয়েছিলো। কিন্তু ইসহাক তো এখন দৈহিক অনুভূতি থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন। তিনি লাশটির সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছেন, যেনো লাশটি জীবিত। দুর্গন্ধের এক তিল অনুভূতিও তার নেই। তিনি যেন এখন আর দেহ নন- একটি আত্মা। সারাটা দিন তাকে কক্ষ থেকে বের করা হয়নি। সন্ধ্যার পরও কেউ তাকে বিরক্ত করেনি। তিনি এই ভেবে বিস্মিত যে, তাকে কেননা শান্তিতে থাকতে দেয়া হচ্ছে। সম্ভবত সুদানী সালার তার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে।
পাহাড়ী এলাকা থেকে বের হয়ে দুই মহিলাকে নিয়ে কমান্ডার মরু এলাকার দিকে যাচ্ছে। মহিলাদেরকে সে ইসহাক সম্পর্কে ভালো ভালো কথা শোনাচ্ছে। তারা মনোযোগ সহকারে তার বক্তব্য শুনছে।
সুদানী সালার তার সঙ্গীকে বলছে-কেউ কি আপন স্ত্রী ও কন্যার অপমান সহ্য করতে পারে? আমি আশাবাদী, কমান্ডার ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে আসবে। আমি ইসহাককে বলবো, যতোক্ষণ না তুমি মুসলিম গোত্রগুলোকে সুদানী ফৌজে শামিল করে সুদানের অফাদার না বানাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার স্ত্রী ও কন্যা আমাদের হাতে বন্দী থাকবে।
আমাদের কমান্ডারকে ভোর নাগাদ এসে পৌঁছা উচিত। সালারের সঙ্গী বললো।
তার আগেও এসে পড়তে পারে- সালার বললো- লোকটা বড় চতুর।
কমান্ডারের পেছনে পেছনে রওনা হওয়া সিপাহী পার্বত্য এলাকার মধ্যদিয়ে অতিক্রম করছে। অর্ধেকেরও বেশী পথ অতিক্রম করে ফেলেছে সে। আকাশে চাঁদ নেই। তবু মরু এলাকা বলে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। তারকার আলোয় চলার মতো পথ দেখা যায়।
রাতের নীরবতার মধ্যে সিপাহী কারো কথা বলার শব্দ শুনতে পায়। বক্তা তারই দিকে এগিয়ে আসছে। সিপাহী একটি টিলার আড়ালে গিয়ে থেমে যায়। কথা বলার শব্দ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। এবার একাধিক ঘোড়ার পায়ের আওয়াজও শোনা যাচ্ছে। পরক্ষণেই সিপাহী টিলার আড়াল থেকে তিনটি ঘোড়া অতিক্রম করতে দেখে। সে তরবারী হাতে নেয়। কমান্ডার এখনো ইসহাকের কথা বলে যাচ্ছে। সিপাহী নিশ্চিত হয়, লোকটি তাদের সেই কমান্ডার এবং তার সঙ্গে ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যা।
সিপাহী ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ে এবং কমান্ডারের পিছু নেয়। তার ঘোড়ার পদশব্দে কমান্ডার চমকে ওঠে। সে তরবারী উঁচু করে পেছন দিকে ঘুরে যায়। কিন্তু সিপাহী ধাবমান ঘোড়ার পিঠ থেকে কমান্ডারের উপর এমন এক আঘাত হানে যে, কমান্ডারের একটি বাহু কেটে যায়। পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে কমান্ডার। সিপাহী তার ঘাড়ে আঘাত হেনে তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে ফেলে দেয়।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ভ হয়ে যায় মহিলাদ্বয়। ইসহাকের স্ত্রী তার মেয়েকে বললো- পালাও, ডাকাত মনে হচ্ছে। তারা ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সিপাহী তাদের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো- এখানে কোনো ডাকাত নেই। আমাকে ভয় করো না। আমি তোমাদেরকে একজন দস্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছি। আমার সঙ্গে নিজ বাড়িতে চলো। আমি তোমাদের সঙ্গে যাবো। আমার সঙ্গে আর কোনো মানুষ নেই।
ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যা অস্থির-পেরেশান যে, এসব কী ঘটছে। সিপাহী কমান্ডারের ঘোড়ার লাগাম তার ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বেঁধে রওনা হয়। পথে সে ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যাকে জানায়, ইসহাক কয়েদখানায় বন্দী। মুসলমান গোত্রগুলোকে সুদানী ফৌজে শামিল করে দেয়ার জন্য তার উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। কিন্তু তিনি তা মেনে নিতে নারাজ। ইসহাকের সঙ্গে কিরূপ আচরণ চলছে, সিপাহী তাদের তা জানতে দেয়নি। সে বললো, তোমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে পরিকল্পনা হলো, তোমাদেরকে ইসহাকের সামনে উলঙ্গ দাঁড় করিয়ে লাঞ্ছিত করে ইসহাককে বাধ্য করা। এই যে লোকটিকে আমি খুন করেছি, সে এ লক্ষ্যেই তোমাদেরকে নিতে এসেছিলো। আমি তোমাদেরকে এই ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তার পেছনে পেছনে আসি। আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি।
