সালারের অনুপস্থিতিতে যে দুজন সিপাহী ইসহাকের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিলো, তারা নিকটে দাঁড়িয়ে সালার ও অফিসারের কথোপকথন শ্রবণ করছিলো। সালার তাদের একজনকে পাঠিয়ে ফৌজের কমান্ডারকে ডেকে মানেন। তাকে ইসহাকের গ্রামের ঠিকানা ও দিক-নির্দেশনা দিয়ে ওখানে যেতে বলে এবং দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়। তাকে বিশেষভাবে বলে দেয়া হলো, মুসলমানদের সঙ্গে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে কথা বলবে এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রশংসা করবে। অন্যথায় মুসলমানরা তোমাকে জীবিত ফিরে আসতে দেবে না।
কমান্ডার তৎক্ষণাৎ রওনা হয়ে যায়।
ইসহাককে নিপীড়নযন্ত্র থেকে নামিয়ে সেই কক্ষে নিক্ষেপ করা হলো, যেখানে একজন মিশরীর গলিত লাশ পড়ে ছিলো। ইসহাক মহান আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন। এতো তীব্র যন্ত্রণা সত্ত্বেও তিনি নিজের মধ্যে শান্তি অনুভব করছিলেন। তার আত্মায় কোনো ব্যথা নেই। শারীরিক ব্যাথা-বেদনার প্রতি তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কিন্তু তার জানা নেই যে, তাকে এমন এক লাঞ্ছনায় নিক্ষেপ করার আয়োজন চলছে, যা তার আত্মাকে রক্তাক্ত করে দেবে। তিনি জানেন না, তার ষোড়শী কন্যা ও স্ত্রীকে কয়েদখানায় নিয়েআসার জন্য এক ব্যক্তি রওনা হয়ে গেছে।
এখান থেকে ইসহাকের গ্রাম ঘোড়ায় চড়ে ভ্রমণ করলে পুরো এক দিনের পথ। এখন ভোর বেলা। সুদানী সালার তার সঙ্গী অফিসারের সঙ্গে চলে গেছেন। কয়েদখানার সিপাহীদ্বয়ের ডিউটি শেষ হওয়ার পথে। দিনের ডিউটির জন্য অন্য সিপাহীরা আসছে। এই দুসিপাহী পরস্পর কথা বলে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা ইসহাককে একজন বুজুর্গ ব্যক্তি বলে বিশ্বাস করে। তারা মনে করে, সরাসরি কোনো এক অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ক। এমন একজন বুজুর্গ ব্যক্তির স্ত্রী-কন্যাকে কয়েদখানায় ডেকে এনে অপদস্ত করা হবে, তা তারা সহ্য করতে পারবে না। এক সিপাহী এই আশংকাও ব্যক্ত করে যে, এই লোকটির স্ত্রী-কন্যাকে অপমান করা হলে প্রত্যেকের উপর গজব আপতিত হবে। ইসহাক বের হতে পারলে তাদের ভাগ্য বদলে দেবেন, এমন আশাও তারা পোষণ করছে। এক সিপাহী বললো, সে ইসহাকের স্ত্রী ও কন্যাকে এই স্থান পর্যন্ত আসতে দেবে না।
***
বার্তাবাহী সুদানী কমান্ডার যখন মুসলমানদের পার্বত্য অঞ্চলে প্রবেশ করে, তখন সন্ধ্যা। এলাকায় প্রবেশ করে প্রথমে সে জিজ্ঞেস করে, মিশরী ফৌজের কর্মকর্তা, সুদানী মুসলমান, নাম ইসহাক; তার বাড়িটা কোন্ গ্রামে? এলাকায় ইসহাক একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। যে কেউ তাকে চেনে। কমান্ডার জানায়, লোকটি আহতাবস্থায় যুদ্ধবন্দী হয়ে আছে। অন্যান্য কয়েদীদের সঙ্গে তাকেও কয়েদখানায় নিক্ষেপ করা হয়েছে। তার অবস্থা খুবই শোচনীয়। তার একান্ত কামনা, জীবনের শেষ মুহূর্তে স্ত্রী ও কন্যাদের এক নজর দেখে যাবেন। আমি তাদেরকে নিতে এসেছি।
এক ব্যক্তি কমান্ডারের সঙ্গ নেয়। উপত্যকার পর উপত্যকা অতিক্রম করে দুজন ইসহাকের গ্রামে প্রবেশ করে। তারপর তার বাড়ি গিয়ে পৌঁছে।
ইসহাকের বৃদ্ধ পিতার সঙ্গে কমান্ডারের সাক্ষাৎ হয়। সুদানী কমান্ডার মাথানত করে তার সঙ্গে করমর্দন করে এবং নেহায়েত আদবের সঙ্গে বলে আপনার পুত্র এতোই বীর পুরুষ যে, আমাদের সালারও তাকে সালাম করেন। তিনি বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছেন বটে; কিন্তু মরুভূমি তাকে পিপাসায় কাতর করে বেহাল করে তোলে। তিনি আহতাবস্থায় আমাদের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। আমরা সুদানী সালার ও শাসকদের যেভাবে চিকিৎসা-সেবা দিয়ে কি, তারও ঠিক তেমনি সেবা-চিকিৎসা চলছে। তথাপি তিনি সুস্থ হচ্ছেন না। তার অবস্থা উত্তরোত্তর খারাপই হচ্ছে। তারপরও তাকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তিনি আকাঙ্খ ব্যক্ত করেছেন যে, তার কন্যা ও স্ত্রীকে শেষবারের মতো এক নজর দেখবেন।
তোমরা যদি তাকে এতোই ইজ্জত করে থাকে, তো তাকে আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছো না কেন?- ইসহাকের পিতা বললেন- হয়তোবা সে আমাদের ডাক্তারদের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে যাবে।
সুদানের সেনা প্রধান বলেছেন, তিনি আমাদের মেহমান- কমান্ডার জবাব দেয়- মেহমানকে অসুস্থাবস্থায় বিদায় দেয়া মেজবানের জন্য অপমান। সুস্থ হলেই তাকে স্বসম্মানে আপনাদের হাতে তুলে দেয়া হবে।
আচ্ছা, এটা কি সম্ভব নয় যে, তার স্ত্রী ও কন্যা তার কাছে থেকে তার সেবা করবে বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করেন।
এরা যদি ওখানে থাকতে চায়, তাহলে সম্মানের সঙ্গে রাখা হবে- কমান্ডার বললো- আমাদের দেশে বীর-বাহাদুরের সম্মান করা হয়। আমাদের ধর্ম আপনাদের থেকে ভিন্ন। কিন্তু আমরাও সুদানী, আপনারাও সুদানী। দেশ আমাদের এক। আর আমরা দেশকে শ্রদ্ধা করি। ইসহাক যদিও সালাহুদ্দীন আইউবীর সৈনিক, কিন্তু তাতে কিছু যায়-আসে না। আমরা ভাই ভাই। সালাহুদ্দীন আইউবীকে আমরা বড় যোদ্ধা বলে বিশ্বাস করি। তিনি খৃস্টানদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছেন।
তাহলে তোমরা তাকে শত্রু ভাবছো কেন?- বৃদ্ধ বললেন- তোমরা কেননা খৃস্টানদেরকে বন্ধু মনে করছো?
মুহতারাম!- কমান্ডার বললো- আমরা যদি কথার পাকে জড়িয়ে পড়ি, তাহলে দায়িত্ব পালনে ত্রুটি হয়ে যাবে। আপনার পুত্রবধূ ও নাতনীকে রাত পোহাবার আগেই আপনার পুত্রের নিকট পৌঁছাতে হবে। আপনার পুত্রের আকাঙ্খ পূরণ করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। তারা এখনই আমার সঙ্গে রওনা হতে প্রস্তুত আছে কি?
